- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

খসরু ভাইকে নিয়ে দুয়েক কথা

ইকবাল কাগজী
চার ॥ বিচ্ছিন্নতার অভিশাপমুক্ত এক মানুষ
সম্প্রতি খসরু ভাইকে নিয়ে এখানে সেখানে কথা চালাচালি হচ্ছে বিভিন্নজনের মধ্যে। এই শহরের বিভিন্ন আড্ডা-চাড্ডায় তাঁর স্মৃতিচারণ চলছে। ভিন্নজনের পক্ষ থেকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে তোলে ধরা হচ্ছে, তিনি বিবেচিত হচ্ছেন এবং সমাজের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করা তাঁর কাজের মূল্যায়ন চলছে, বিভিন্ন প্রকরণে। সকলের জন্যে এমন হয় না, খসরু ভাইর জন্যে হচ্ছে, মহৎ মানুষের জন্যে যেমন হয়ে থাকে। মানুষের এইসব কর্মকাণ্ডের সুবাদে প্রকারান্তরে এই জনপদে তাঁর জনপ্রিয়তার তুঙ্গতা যেমন প্রদর্শিত হচ্ছে এবং তেমনি লোকে তাঁর এই চলে যাওয়াকে সহজে মেনে নিতে পারছে না’র অন্তরালে তাঁর প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম ভালবাসা প্রকাশিত হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বেশ কীছু শোকসভা হয়ে গেছে। আমি সব ক’টিতে যেতে পারি নি, দু’টিতে উপস্থিত ছিলাম। অনেকেই তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করলেন। তাতে অতিরঞ্জন আছে কি না সেটা খতিয়ে দেখার যোগ্যতা আমার নেই। সেজন্য তাঁর আরও কাছের কেউ হওয়া চাই, নতুবা নয়। প্রতিটি মানুষের সামাজিক জীবনের বৃহৎ গণ্ডির ভেতরে ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ একটি প্রাতিস্বিক জীবন থাকে। বৃত্তের ভেতরে সেই প্রাতিস্বিকতার বৃত্তে বন্দি জীবনকে জানতে হলে ব্যক্তিসত্তার ঘনিষ্ট হতে হয়, হতে হয় অকৃত্রিম বন্ধু। এই বন্ধু বা বন্ধুত্বের স্বরূপটি কেমন তার একটি বিবরণ বাংলা ভাষার বিখ্যাত কবি উৎপলকুমার বসুর এক কবিতায় মেলে। তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধু, তোমার হাতের উপর হাত রাখলেই আমি টের পাই তোমার বাজারে অনেক দেনা, ছেলেটা উচ্ছন্নে গেছে, মেয়ে রাত করে বাড়ি ফেরে, আজ যা-বলার আছে তুমি আমাকেই বলো, স্ত্রীর মুখরতার কথা বলো, সহকর্মীদের শঠতার কথা বলো, রাতে ঘুম হয় না সেই কথা বলো, আর যদি কাঁদতেই হয় তবে এই কাঁধে মাথা রেখে কাঁদো, বন্ধু।’ খসরু ভাইর পাশে এরকম বন্ধু কেউ আমি ছিলাম না, তবে কেউ কেউ যে তেমন না হলেও সে-বন্ধুতার কাছাকাছি ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অন্তত তাঁরা কেউ কেউ খণ্ডিত সময়ের জন্যে হলেও সে অন্তরঙ্গতার অন্দর মহলে পা রাখতে পেরেছিলেন। তাঁদের স্মৃতিচারণের কীছু কীছু ঘটনাবর্ণনা তাই প্রমাণ করে।
খসরু ভাই ‘সোনলী সকাল’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য ছিলেন। প্রতি সকালে যারা হাঁটতে বেরুতেন। এটি এই শহরের চিৎপ্রাকর্ষিক কিংবা সুসংস্কৃত প্রবীণদের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের উদ্যোগে স্মরণসভা হয়ে গেলো গত ৪ মার্চ সন্ধ্যায়, শহীদ জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির দোতলার মিলনায়তনে। কেউ কেউ সন্ধ্যাটিকে ‘বিষণ্ন সন্ধ্যায় বেদনার্তজন’-এর সমাবেশ বলে বিবৃত করেছেন। কিন্তু আমি তাদের দলের কেউ নই, আমি বেদনার্ত ছিলাম না, তাঁর মৃত্যু আমাকে আলোড়িত করে নি এমনও নয়, কিন্তু আমি এই সমাবেশে এসে বসেছিলাম তাঁকে মনে মনে অভিবাদন জানাতে। কারণ খসরু ভাই আমার কাছে সব সময়ই বীর এবং একজন বীরের প্রাপ্য কেবল অভিবাদনই হতে পারে, অন্য কীছু নয়।
চুপ করে বসে শুনছিলাম, তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণের ভাষ্যবয়ান। দুয়েকজনের বয়ার্ণনার আলো আমার চোখে একটি অন্ধকারের আড়ালে চুপটি করে বসে থাকা একটি বিষয়প্রপঞ্চকে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করে তুললো। আমি চমকিত হলাম, রোমাঞ্চিত হলাম এবং জানলাম উৎপলকুমার বসুর বয়ার্ণনায় সংজ্ঞায়িত বন্ধুতা থেকে বঞ্চিত ছিলেন না খসরু ভাই। তাঁর কাছের মানুষ মাসুক আলম অ্যাডভোকেট বলেছেন, যার মর্মভাবানুবাদ হতে পারে এরকম : বছর কয়েকের কনিষ্টাতার ফাঁরাক ডিঙিয়ে খসরু ভাই তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মতো হয়ে উঠেছিলেন, ৮৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অনেকটা সময়ের অন্তরঙ্গতার তরঙ্গে স্পন্দিত ঘনিষ্ট জীবন কেটেছে দু’জনের। এ দিক থেকে বলাই যায়, বন্ধুভাগ্যে খসরু ভাই সত্যিকার অর্থেই সৌভাগ্যবান ছিলেন। আরও দুয়েকজন হয় তো থাকতে পারেন, যাঁরা জীবেনের প্রাতিস্বিকতার একান্ত নির্জনতার অন্যরকম পরিসরে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বসে থেকেছন কীছু কীছু দুর্লভ মুহূর্তে। স্মৃতিচারণাগুলো শুনতে শুনতে তাই মনে হলো। এই বন্ধু পাওয়ার পরম ভাগ্য সমাজবদ্ধ মানুষের সকলের হয় না, তাঁরা জীবনভর একা থেকে যান। হাজার মানুষের ভিড়ে একা এক দুর্ভাগা মানুষ। খসরু ভাই এমন দুর্ভাগা মানুষ ছিলেন না। মানুষে মানুষে এই বিচ্ছিন্নতা সভ্যতার সবচেয়ে বড় অবদান, সবচেয়ে বড় অভিশাপ। এটিকে অতিক্রম করতে পারে খুব কম মানুষ। আর যারা পারে তারই মানুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ। খসরু ভাই বোধ করি এই বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন তা-ই প্রতিপন্ন করে যে, তিনি ছিলেন বিচ্ছিন্নতার অভিশাপমুক্ত এক মানুষ এবং আমি এই জেনে আনন্দিত যে, কবি উৎপলকুমার বসুর বর্ণনায় বন্ধুর যে-পরিচয় কুসুমিত হয়েছে, তিনি তার অমৃতস্বাদ চেখে গেছেন।

  • [১]