দ্বিপক্ষীয় টি—২০ ক্রিকেট সিরিজের খেলায় মাঠে কিছু দর্শকের অতিরিক্ত পাকিস্তানপ্রীতি নিয়ে অল্পবিস্তর লিখালিখি ও আলোচনা—সমালোচনার একটি মৃদু ঢেউ দেখা যাচ্ছে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি পতাকা হাতে, পাকিস্তানি জার্সি গায়ে পড়ে এইসব দর্শক পাকিস্তানের চার ছক্কা মারা কিংবা উইকেট পাওয়ার পর গ্যালারিজোড়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে, জয়ধ্বনি করে পাকিস্তানের নাম করে। কোনো দর্শক যেকোনো দেশের সমর্থক হতেই পারে, সে তার প্রিয় দলের অর্জনগুলোও উদযাপন করতে পারে; কিন্তু প্রতিপক্ষ দল যখন নিজের দেশ- বাংলাদেশ, তখন বিষয়টি হয়ে উঠে ভিন্ন মাত্রার। কেন নিজের দেশের বিপক্ষে গিয়ে অন্য একটি দেশকে সমর্থন জানাতে হবে, আর সে দেশটি যদি হয় পাকিস্তান- যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধের পর অভ্যূদয় ঘটেছে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের ? পাকিস্তানকে সমর্থনকারী ওই দর্শকরা নিজের দেশের পরাজয়ে উল্লসিত হয়ে উঠেছে কেন? এরও উত্তর পাওয়া যায় টেলিভিশনে প্রচারিত পাকিস্তান সমর্থনকারীদের প্রতিক্রিয়ায়। এক দর্শক বলছিলেন, আমরা তো আগে পাকিস্তানই ছিলাম, দুর্ভাগ্যবশত এখন আলাদা হয়ে গেছি। বাংলাদেশের আলাদা হয়ে যাওয়াটা ওই দর্শকের কাছে দুর্ভাগ্যজনক। হঁ্যা, এই স্বীকারোক্তির মাঝেই লুকিয়ে আছে বিপুল সংখ্যক দর্শকের পাকিস্তান প্রীতির মানসিকতা। এরা এখনও বাংলাদেশকে নিজের দেশ মনে করতে শিখেনি। তাই নিজের পরিচয় ভুলে গিয়ে নিজের আত্মমর্যাদা বিস্মৃত হয়ে এরা প্রভুত্বকারী পাকিস্তানকেই নিজের দেশ মনে করে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এরকম দৃশ্য দেখা যাবে কেউ ভাবেনি।
এই যে দর্শকরা- যারা মাঠে পাকিস্তানকে গলা ফাটিয়ে সমর্থন করলো আর নিজের দেশের পরাজয়ে খুশিতে বাকবাকুম হলো; এদের সকলেরই বয়স গড়পড়তা ত্রিশের নীচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারও বিশ বছর পর এদের জন্ম। এরা পাকিস্তান দেখেনি, পাকিস্তানের শাসন—শোষণ দেখেনি, বাঙালিদের আন্দোলন—সংগ্রাম দেখেনি, দেখেনি মুক্তিযুদ্ধ। তারপরেও কেন এরা নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানকেই সমর্থন করল, এই শিক্ষা এরা কোথায় পেল? নিশ্চয়ই এরা নিজের পরিবার, পরিপাশ^র্, সমাজ থেকে এই শিক্ষা পেয়েছে। এরা জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নিশ্চয়ই শিখেছে, বাংলাদেশ নয় বরং পাকিস্তানই ছিলো ভালো। এদের মানসিকতায় সুচতুরভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানপ্রীতির বীজ। সেই বীজ আজ চারাগাছ থেকে মহীরুহে পরিণত হয়ে মীরপুর কাঁপিয়েছে, সারা দেশ কাঁপাচ্ছে। এরা কি অচিরেই মাঠের বদলে পুরো দেশ কাঁপানোর কাজটিও সেরে ফেলবে? আমরা যেভাবে এসব বিষয়ে সীমাহীন ঔদাসিন্য ও নিস্পৃহতা দেখিয়ে চলেছি তাতে কখনও ওরকম কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।
তো স্বাধীনতার ৫০ বছর ধরে আমরা কী করলাম? কেন দেশটিতে জাতীয় সংহতি গড়ে উঠল না? কেন কিছু বিষয়ে সকলের ঐকমত্যের জায়গা তৈরি হলো না? এই প্রশ্নের নির্মোহ উত্তর না খোঁজলে স্বজাতি—বিদ্বেষ আর পরদেশপ্রীতির সংস্কৃতি দূর করা এভারেস্ট চূড়ায় উঠার চাইতেও কঠিন কাজ হয়ে উঠবে নিশ্চিতভাবেই। এই যে তরুণ প্রজন্ম দেশের বিরুদ্ধে যেয়ে পাকিস্তান—বন্দনায় মেতে উঠছে তার পিছনে দায় যতটুকু স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির ততটুকু দায় স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি বলে দাবিদার সকলের। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত স্বাধীনতাকে সংহত এবং ওই আদর্শে রাষ্ট্র গঠনের জায়গাটিকে নির্ঝঞ্ঝাট রাখতে কেউই কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। তারা সকলেই অধিকমাত্রায় ক্ষমতাসুখ ভোগ করতে যেয়ে জাতির চেতনার মূল জায়গাটিকে উপেক্ষা করে গেছেন। এই সুযোগেই পাকিস্তান দেখেনি যে প্রজন্ম সেই প্রজন্মও অতিশয় পাক—প্রেমিক হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা ও আদর্শ চর্চার মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিশাল বিস্তৃত ফাঁক দূর করার কঠিন কাজটি এখনই শুরু না করতে পারলে বিপদ সমাসন্ন।
আশির দশকের ‘মেরি মি আফ্রিদি’ এর সফল পরিণতি একুশের ‘লাভ ইউ আফ্রিদি’। এর বিপরীতে স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থান কী?