- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতি ভাঙছে বাঁধ ডুবছে ফসল নেতারা ব্যস্ত ঢাকায়

বিন্দু তালুকদার
জনগণের সমস্যার সময় দায়িত্বশীলরা যখন এলাকার বাইরে থাকেন তখন সবাই সেই উক্তিটি ধার করে বলেন ‘ঐতিহাসিক রোম নগরী যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখনও বাঁিশ বাজাচ্ছিল’। লাখো কৃষকের কষ্টার্জিত বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার এই দুঃসহ সময়ে সুনামগঞ্জেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
টানা বৃষ্টিপাত, হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে ও তলিয়ে যখন একের পর হাওর ডুবছে তখন সুনামগঞ্জের হাওর অধুষ্যিত এলাকার আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশী ব্যক্তিগণ, ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ তখন মনোনয়ন বাগাতে ঢাকায় তদরিব-লবিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন।
সম্ভাব্য ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের এই কর্মকান্ড ভাল চোখে দেখছেন না স্থানীয় এলাকার লোকজন। প্রকাশ্যেই তারা ক্ষোভ ঝাড়ছেন এই বলে যে, ‘এই নেতারা নাকি আমাদের সমস্যার সমাধানের জন্য জনপ্রতিনিধি হতে চান। আমাদের এই দুঃসময়ে যদি তাদের দেখা না পেলাম তাহলে তারা কখন জনগণের পাশে থাকবেন?’
দলীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জেলার দিরাই, শালা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা মধ্যনগর এলাকার চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরাসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন আদায়ের জন্য ঢাকায় চেষ্টা-তদবিরে ব্যস্ত আছেন। কৃষকদের চরম দুযোর্গে এলাকায় হাওরের বাঁধে ও কৃষকদের পাশে না থেকে তাঁরা রাজধানী শহরে অবস্থান করছেন। বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় জনগণ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে পাশে পাচ্ছেন না।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান উল্টো অভিযোগ করে বলেন,   
‘হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে স্থানীয় এমপিদের থাকার কথা অথচ তারা কোন বাঁধেই নেই।’
তবে এসব অভিযোগ ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সুনামগঞ্জ -১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ।
দিরাই উপজেলার শ্যামারচার গ্রামের কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন,‘আজকের রাজনীতিতে কোন ধরনের জনসেবা নেই। সবাই নিজের পেটের রাজনীতি করেন। কৃষকদের দুদর্শায় তাদের পাশে থাকার কোন প্রয়োজনই বোধ করেন না তারা। রাজনৈতিক দলের জনেসবা অনুবিক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খোঁজে বের করতে হবে। হাওরের ফসল রক্ষায় দিন-রাত কাজ করলেও নেতারা কৃষকদের পাশে নেই। রাজনীতি এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ভোটের রাজনীতি এখন অর্থ ও লাঠিতে চলে।’
জেলা সিপিবির সভাপতি সহযোগি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন,‘একের পর এক বাঁধ ভেঙ্গে হাওরের ফসল ডুবছে। কিন্তু বাঁেধর পাশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মীকে পাচ্ছেন না এলাকার কৃষকরা। আওয়ামী লীগের নেতারা চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন আদায়ের জন্য রাজধানীতে বসে আছেন। তারা নিজের উন্নয়নের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর সময় তাদের নেই। বাঁধ নির্মাণে তদারিক ও অনিয়ম দুর্নীতি রোধ করতে কোন ধরনের ভূমিকা নেই তাদের।’
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন,‘হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নয় স্থানীয় এমপিদের থাকার কথা। তারা তো কোন বাঁধে নেই। আমি এমপি থাকাকালীন সময়ে দিনরাত হাওরের বাঁধে থেকেছি। নির্বাচনী এলাকার বাইরে জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই-শালা বাঁধ রক্ষায় বাঁশ বস্তা পাঠিয়েছি। কৃষকদের পাশে থেকে কাজ করেছি। এখন আমার কোন প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। তারপরও হাওরের বাঁেধর খোঁজ খবর নিচ্ছি,পরিস্থিতি মনিটরিং করছি।’
তিনি আরো বলেন,‘হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে ঠিকারদাররা সঠিকভাবে কাজ করেননি। যেভাবে মনে হয় বাঁধ নির্মাণ করেছে। যার কারণে বাঁধ দুর্বল হয়েছে। এসব বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করেন না কিছু বলেন না।’
সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন,‘আমি এলাকার সংসদ সদস্য হিসাবে সব সময় কৃষকদের পাশে আছি। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য করচার ও বাউন হাওরে পাম্প বসিয়েছি। স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিনিয়তই হাওরের বাঁধের খোঁজ-খবর নিচ্ছি। ধান কাটার শ্রমিক সংকট নিরসনের জন্য ধোপাজান বালু মহাল বন্ধ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি।’
সুনামগঞ্জ ১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘এমপিদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ হাস্যকর। আমি সব সময় এলাকার কৃষকসহ সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম এখনও আছি। সরেজমিনে বাঁধ পরিদর্শন করেছি, কৃষকদের সাথে কথা বলেছি। সকল ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত করতে ইউএনওদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন,‘যারা কৃষকদের পাশে থেকে হাওর রক্ষা বাঁধে কাজ করছেন ইউপি নির্বাচনে এলাকার মানুষ নিশ্চয়ই তাদেরকেই মূল্যায়ন করবেন। আর যারা মনোনয়নের জন্য ঢাকায় বসে রয়েছেন তাদের বিষয়টি মনে রাখবেন। যারা এমপিদের নিয়ে কথা বলেন মূলত তারাই মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত আছেন।’  

  • [১]