রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে চলমান ৫৮তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ১১১ টি দেশের মধ্যে ২৬তম স্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশের প্রাপ্ত নম্বর ১১১। বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম। সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র আসিফ-ই-এলাহী ও ক্যান্টনম্যান্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজ চট্টগ্রামের আহমদ জাওয়াদ চৌধুরী যথাক্রমে ২৪ ও ২৩ নম্বর পেয়ে প্রতিযোগিতায় রৌপ্যপদক পেয়েছে। এছাড়া আরও দুই শিক্ষার্থী ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে। মাত্র ১ নম্বরের জন্য স্বর্ণপদক বঞ্চিত হয়েছে সিলেটের আসিফ। বলাবাহুল্য আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত প্রতিযোগিতায় ৫২তম, শ্রীলঙ্কা ৬২তম, পাকিস্তান ৮১তম এবং প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করা নেপাল ১১০তম স্থান পেয়েছে। ফলাফলের এই অবস্থান নিঃসন্দেহে আমাদের ছেলেদের মেধাগত উৎকর্ষতার পরিচায়ক। বাংলাদেশিরা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জায়গায় বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে প্রতিযোগিতার এই আশাব্যঞ্জক ফলাফল তার প্রমাণ। আমরা রিও-ডি-জেনিরোর গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়া বাংলাদেশি প্রতিযোগিদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
বিজ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতির জায়গায় গণিতের অবস্থান মুখ্য। যারা গণিতে ভাল তারা বিজ্ঞানের সকল শাখায় ভাল থাকে। বলাবাহুল্য বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বিজ্ঞানে অগ্রবর্তীরাই দুনিয়া শাসন করছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকাদের এই বিশ্বে কোন স্থান নেই। পৃথিবী এখন যে উন্নতির চরম শিখরে উঠেছে তার পিছনে বিজ্ঞানের অবদান সর্বাধিক। তাই বিজ্ঞান শিক্ষাকে সর্বদাই গুরুত্বের চোখে দেখা হয়। বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা জ্ঞান চর্চার এই জায়গায় কখনও পিছিয়ে ছিল না। বাংলাদেশের বহু মেধাবী শিক্ষার্থী ইউরোপ-আমেরিকার নানা দেশে নতুন নতুন গবেষণায় সফলতা দেখাচ্ছে। এই তরুণরা দেশে থেকে জ্ঞান চর্চার সুযোগ পেলে আজ বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে থাকত নিঃসন্দেহে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমরা মেধাবীদের দেশে থাকার ব্যবস্থা করতে পারছি না। বরং এদের বিদেশ গমনেই কেন জানি আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। এটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। যেসব দেশ উন্নতি করেছে সেসব দেশ এই মেধাপাচারকে নিয়ন্ত্রণ করে দেশের মেধাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছে। মেধাবী তরুণরা দেশের ভিতর ন্যুনতম সুযোগ সুবিধা পেলে বিদেশে পাড়ি জমাতেন না। আমাদের দেশটি যারা পরিচালনা করছেন অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এখন সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। গার্মেন্টস কিংবা জনশক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা উন্নতির মোহ ত্যাগ করে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের পথে হাঁটার সময় হয়েছে আজ। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছি সেখানে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও বেশি জরুরি।
আসিফ-জাওয়াদরা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছে আমরা যোগ্যতায় পিছিয়ে নেই। এমনকি আমাদের দেশটিও সম্পদেও পিছিয়ে নেই। এই দেশের মতো অনুকূল আবহাওয়া সুজলা সুফলা প্রকৃতি পৃথিবীর অনেক দেশেই নাই। আমাদের দরকার শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার যার আওতায় ধারাবাহিকভাবে মেধাবীরা দেশোন্নয়নে ব্রতী হওয়ার সুযোগ পাবে। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান সরকার দেশকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চান যেখানে জ্ঞানভিত্তিক উৎকর্ষতা থাকবে। এই উদ্দেশ্যে মেধাবীরা যাতে নিজের দেশ ছেড়ে অন্যত্র না চলে যায় সেটি রোধ করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে আমরা একটি জাতীয় নীতিমালা দাবি করছি। নতুবা গণিত অলিম্পিয়াডের এই সফলতা কোন কাজে আসবে না। বিদেশি ল্যাবরেটরিতে আমাদের সোনার ছেলে-মেয়েদের নতুন আবিষ্কারের আনন্দে উদ্ভাসিত হওয়ার সময় গত হোক এটি আমরা চাচ্ছি এ কারণে যে এই গবেষণাগুলো স্বদেশের গবেষণাগারেই পরিচালিত হোক। আমরা সেই নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় শামিল হতে চাই।