- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

গল্প- চড়ুই পাখির বড়াই

সজল চন্দ্র সরকার
‘চড়াই পাখির বড়াই’-কথাটি লোকমুখে বেশ প্রচলিত আছে। কাঁচাঘর আর পাকাঘর নিয়ে বাবুই আর চড়ুইয়ের আত্মকলহের ছড়াটি অনেকেরই জানা। যেখানে চড়ুই পরের ঘরে  থেকেও বাবুই পাখির শিল্পগুণকে অস্বীকার করে। কিন্তু এবারের বিষয় ভিন্ন। খঞ্জনি পাখির সংগে চড়ুই পাখির হাঁটার বড়াই।
বিহান বেলা। সবুজের মাঠ আর হাওর-বিলের খোলাদিগন্ত থেকে সুর্যটা জেগে ওঠে কেবল উঠোন রাঙিয়েছে। চড়ুই বাসা ছেড়ে লেজ নাড়িয়ে আয়েশ করে তিক্ তিক্ করে উঠোনে হাঁটছে। গাছে-গাছে বসে থাকা অন্য পাখিরা চড়–ইয়ের হাঁটার দৃশ্য দেখে বেশ তারিফ করছে। কেহ কেহ উড়ে এসে চরণ ছুয়ে ধন্য হচ্ছে। তাতে বাবুই পাখিও অতীত ভুলে গিয়ে বেশ খুশি। দশের সাথে সুর মিলিয়ে খঞ্জনি পাখিও স্বীকৃতি দিয়েছে চড়ুই পাখির হেঁটে চলার নিজস্ব ভঙ্গিকে। এ নিয়ে গাছে-গাছে পাখিদের কলরব, এক ফাঁকে টুনটুনি বলে উঠলো-অপূর্ব! অপূর্ব! এ যেন স্বর্গের পদলীলা। কথাটা শুনে পেঁচাও বলছে-চমৎকার! চমৎকার এ দৃষ্টিনন্দন হাঁটা দেখলে স্বর্গের দেবতারাও নিশ্চই খুশি হতেন। হাঁটার প্রসংশায় অগণিত মুখ। তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিল হাঁটার নান্দনিকতা প্রদর্শনে স্বর্গে যাওয়ার। যথারীতি দিনক্ষণও ঠিক হলো। স্বর্গের দেবতারাও দ্বার খুলে স্বাগতম জানাতে প্রস্তুত। চড়ুই রীতিমতো ভাবনায় পড়ে গেল। তাই হাঁটার চর্চা করতে লাগলো প্রতিদিন সকাল-বিকাল। হঠাৎ একদিন দেখা হলো খঞ্জনি পাখির সাথে। তার হাঁটা দেখে চড়ুই মুগ্ধ হল। তবুও বড়াই করে বললো-আমার মতো হাঁটতে শেখ! খঞ্জনি কোন কিছু না বলে চলে গেল। চড়ুই গোপনে গোপনে অনুসরণ করতে লাগলো খঞ্জনির হাঁটার কলাকৌশল। দিনরাত বিরামহীন চললো হাঁটার অনুশীলন। একপর্যায়ে শুভদিন এলো স্বর্গে যাওয়ার। বনের সকল পাখিরা ঢাক-ঢোল বাজিয়ে চড়ুইকে উৎসাহ দিতে উঠোনে এলো। চড়ুই তার বাসা থেকে ফুড়–ৎ করে উড়ে নামলো উঠোনে। শুরু হলো ঢাক-ঢোলের তালে-তালে পাখিদের নৃত্য। কোকিল, ময়না, টিয়া ও দোয়েল-শ্যামা গাইল গান।
মোদের গরব মোদের আশা
স্বর্গে মোরা গড়বো বাসা।
চড়ুই পাখিকে সাজিয়ে দিল মাছরাঙা। ময়ূর পড়িয়ে দিল সোনার নূপুর। মেঠো পথে লাল গালিচা সাজিয়ে দিল বুলবুলি। এ আয়োজনে কেউ কেউ এলো হাঁটার মহিমা দেখতে আর অনেকেই এলো স্বর্গ প্রাপ্তির আশায়। জয় জয় ধ্বনি তোলে ঢাক-ঢোল বাজালো সবাই। চড়ুই প্রশংসার প্রাপ্তিতে বুক ফুলিয়ে আকুপাকু। ভুলে গেল খঞ্জনির মতো হাঁটার কৌশল। পা যেন নড়ছে না। সময় বয়ে চলেছে। সবাই অবাক! পায়ে আবার নজড় লাগলো নাকি! যে যার মতো করে চড়ুই’র পায়ে ঝার-ফুঁ দিল। তাতেও কোন কাজ হলো না। প-িতের বিধান নিয়ে গঙ্গাজলে ¯œান-তর্পণ করেও কাজ হচ্ছে না। চড়ুই ভুলে গেছে তিক্ তিক্ করে নিজের মতো লেজ নাড়িয়ে হাঁটতে। এক পর্যায়ে সবাই ধৈর্য্যচ্যুত হয়ে চড়ুইকে তিরষ্কার করে কটু কথা বলতে লাগলো। চড়ুই অপমান সহ্য করতে না পেরে দু’পা তোলে আড়াআড়ি লাফ দিয়ে এক কদম এগুল। সকলেই আশান্বিত হলো চোখ রাখলো চড়ুইয়ের শ্রীপদে। কেউ কেউ ফুল-চন্দন ছিটাতে লাগলো। যারা হতাশ হয়ে তিরস্কার করেছিল, তারাই তারিফ করে বলতে লাগলো-চড়ুই পাখির শ্রীপদ বলে কথা! তাই পুনরায় ঝঙ্কার উঠলো আকাশে বাতাসে। চড়ুই প্রসংশার প্রাপ্তিতে নিজের হাঁটা ভুলে গিয়ে আড়াআড়ি লাফাতে লাফাতে লাল গালিচা বিছানো স্বর্গের পথ ছেড়ে আপথে চলে গেল। চড়ুই তাই আজও পারে না স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে। এ চরণ যেন চলে না জীবনের পথে, নিজের মতো।
তখনি সবাই বলিয়া উঠিল- অথর্ব চড়াই, মিছে তোর বড়াই, পরের হাতে নাটাই, নিজত্ব কিছু নাই। তারপর সকলে যার যার মতো করে তাকে তিরষ্কার করিল। জাতির মান রাখিতে খঞ্জনি লাল গালিচা ধরে স্বর্গের পথে হাঁটিতে লাগিল। বাদ্য বাজিল, গাহিল সকলে মিলিয়ে গান। তবুও চড়ুই হিংসায় বলিল-খঞ্জনির পদযুগল কুচ্কুচে।
আর স্বর্গের পথ ধরে সকলে মিলিয়া গাহিল-
বাঙালি,বাংলার পথে চলো
গায়ক, বাংলার সুরে গাও
প্রেমিক, বাংলা ভালোবাস
কবি, বাংলায় লিখে যাও।  

  • [১]