- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

গাফ্ফার ভাইকে যেমন দেখেছি

হোসেন তওফিক চৌধুরী
আমার পরম সৌভাগ্য আমি আমাদের সাংবাদিক জগতের মহিরূহ কিংবদন্তি সাংবাদিক, ক্ষণজন্মা কলামিষ্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাথে সাংবাদিকতা করার সুযোগ পেয়েছি। ঢাকার অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘পূর্ব দেশ’ পত্রিকায় তিনি ছিলেন সহযোগি সম্পাদক, আমি ছিলাম প্রথমে সহ—সম্পাদক এবং পরে স্টাফ রিপোর্টার।
আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারি— আমি কি ভুলিতে পারি? ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রম্ন গড়া এই ফেব্রুয়ারি’ এই অনন্য সৃষ্টি কালজয়ী গানটির সাথে আমরা ছেলে বেলা থেকেই নিবিড়ভাবে পরিচিত। ২১শে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত ফেরীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই গানটি হাজারও কন্ঠে গীত হয় সর্বত্র। এই গানটি যেভাবে অমর গাফ্ফার চৌধুরীও সেভবে অমর হয়েছেন। বুদ্ধিজীবীদের মতে গাফ্ফার চৌধুরী যদি আর কিছু নাও করতেন এই গানই তাকে যুগ যুগ ধরে চির স্মরণীয় রাখত। তিনি ছিলেন একজন ভাষা সৈনিক। তিনি ভাষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন। কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি এই গান রচনা করেন। একটি গান লিখে অমরত্ব লাভের নজির বিশে^ বিরল। গত ১৯শে মে তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনার পর থেকে তার চেহারা ছবি আমার নয়নে বার বার ভাসছে। আমরা একই রুমে বসে কাজ করতাম। তার সদা হাস্যময় চেহারা দেখেছি। প্রায় প্রতিদিনই তার সাথে আমাদের কথা হতো। পূর্ব দেশের সহযোগি সম্পাদক হিসাবে এ সময়ে নুরুল ইসলাম পাটোয়ারি, কবি মহাদেব সাহা, আব্দুর রজ্জাক চৌধুরী, সালাউদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন।
কামাল লোহানী ছিলেন চীফ সাব এডিটর। আ.ন.ম. গোলাম মস্তফা (শহীদ) ছিলেন ডেপুটি সাব—এডিটর। প্রখ্যাত ছড়াকার ফয়েজ আহমদ ছিলেন নগর সম্পাদক আর সলিমুল্লাহ ছিলেন চীফ রিপোর্টার। এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ছিলেন বার্তা সম্পাদক। প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা এবং সাবেক পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের তুখোর সদস্য মাহবুবুল হক ছিলেন সম্পাদক। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী পূর্ব দেশে তৃতীয় মত নামে একটি নিয়মিত কলাম লিখতেন। আব্দুল গনি হাজারী লিতেন কালো পেচার ডায়েরী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী লিখতেন পরিবর্তনে পরিবর্তনীয় নামে কলাম। তাদের লেখায় সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা ছিল অত্যন্ত আকর্ষনীয়।
আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীকে সবাই গফ্ফার ভাই ডাকতো। তিনি অফিসে এসে বেশি সময় থাকতেন না। তিনি ছিলেন দারুণ আড্ডাবাজ। কম সময়ের মধ্যেই কাজ সেরে প্রেসক্লাবে গিয়ে আড্ডায় মজতেন। তিনি নিজ হাতেই লিখতেন। মাঝে মধ্যে ডিকটেশন দিতেন। মাঝে মাঝে তার বাসা থেকেও টেলিফোনে জরুরী বিষয়ে সম্পাদকীয় আনা হতো। তিনি ছিলেন এক রেডি রেফারেন্স। যে কোন বিষয় সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। তাঁর ছিল অসম্ভব স্মরণ শক্তি। অতীত তাঁর কাছে জীবন্ত ছিল। তিনি যেন ছিলেন এক চলমান ইতিহাস। অতীয়র প্রায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ ছিল নখদর্পনে।
১৯৩৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর বরিশালের উলানিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৯৪৭ সালে কংগ্রেসের হিতৌষী পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ সালে দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় নিযুক্তি লাভ করেন। পরে তিনি ঢাকার দৈনিক ‘ইত্তেফাক’, ‘আজাদ’ এবং ‘সংবাদ’ পত্রিকায় কাজ করেছেন। তিনি সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজ পত্রিকায় সম্পাদনা করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি সেখানে জয়বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তখন তাঁর কলাম কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার ও যুগান্তরে ছাপা হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় এসে তিনি জনপদ পত্রিকার সম্পাদনা গ্রহণ করেন। তাঁর লেখনি ছিল অত্যন্ত ক্ষুরধার ও বেগবান। অত্যন্ত কঠিন বিষয় তিনি সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতেন। তাঁর মতো উঁচু মানের কলাম লেখক বিরল। এই সময়ে আবুল মনসুর আহমদ, খন্দকার আব্দুল হামিদও বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন। গফ্ফার ভাই একজন প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক। তাঁর লেখা চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনা, শেষ রজনীর চাঁদ, স¤্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দর, বাংলাদেশ কথা কয় প্রভৃতি অন্যতম। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক সহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৭৪ সালে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান। এরপর সেখানে তিনি বসবাস শুরু করেন। কিন্তু লন্ডনে থাকলেও নিয়মিত ঢাকার পত্রিকায় তাঁর কলাম বের হতো। লন্ডনে তিনি বাংলা সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। নতুন দিন নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
এহেন মহান ব্যক্তিত্বের সাহচর্য ও সান্নিধ্য লাভ আমার জীবনের এক স্মরণীয় ও গর্বিত অধ্যায়। আমি কোন দিন তাঁকে ভুলতে পারবো না। তাঁর স্মৃতি চিরদিন আমার কাছে উজ্জ্বল ও অমলিন হয়ে থাকবে। মানুষ তাঁর কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকে। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীও এমনি ভাবেই আমাদের মাঝে অনাগত কালেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিষ্ট।

  • [১]