বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
ছোট পাতা। সরু ডালপালা। গাঢ় সবুজের কাঁটাযুক্ত ঝোপ। ফুল তার ধবধবে সাদা। পাঁচ পাপড়ির মাঝখানে হলুদাভ কেশর। নজরকাড়া এই ফুলে আছে হৃদয় হরণের হাতছানি। ৫ থেকে ১০ সে.মি. লম্বা পাতার কিনারটা করাতের ফলা সদৃশ্য। চিকন শাখা-প্রশাখার ফাঁকফুকুরে গজানো কাঁটায় জমে আছে বিষাদময়তা। ভারি মনোরম গুল্মজাতীয় বৃক্ষ এটি। ডাক নাম গুজাকাঁটা। শুদ্ধ করে বললে হয় বনগোলাপ বা বুনো গোলাপ।
সাহিত্যের ভাষায় গুজাকাঁটার পরিচয় সেঁউতি ফুল নামে। রবিঠাকুর তার লেখায় এই ফুলকে টেনে ধরেছেন এভাবে- ‘তটের চরণে তটিনী ছুটিছে,/ ভ্রমর লুটিছে ফুলের বাস/ সেঁউতি ফুটিছে, বকুল ফুটিছে/ ছড়ায়ে ছড়ায়ে সুরভিশ্বাস।’ বাড়ির পাশের ঝোপে ফুটে আছে কবিগুরুর সেই সেঁউতি ফুল, সেই বনগোলাপ।
জামালগঞ্জের রহিমাপুরস্থ বাড়ির পেছনের ডোবা তীরবর্তী স্থানে বেড়ে ওঠা গুজাকাঁটা তথা বনগোলাপের। সেই ছোটবেলা থেকেই এ প্রতিবেদকের পরিচয় তার সাথে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাড়ির পেছনের ডোবা থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাটি দখলে নিয়েছে গাছটি। আঞ্চলিক পরিচয়ের গুজাকাঁটাই যে বনগোলাপ সেটা হয়তো অজানা অনেকের। বাড়ির টব কিংবা পুষ্প উদ্যানে ফোটা গোলাপ আর জংলি এই গোলাপের মধ্যে ব্যবধান ঢের। একটি পরম পরিচর্যায় ডালপালা গজায় ভালোবাসার তরে। আরেকটি অযতেœ অবহেলায় যত্রতত্র পেখম মেলে ঝরে পড়ে নীরবে। কেউ ছুঁয়েও দেখে না তাকে। কাঁটা কিংবা বুনো বলে কেউ ধার ভেড়ে না তার। কিন্তু এ বুনো ফুল যে আমাদের নিজস্ব গোলাপ। বাংলার বিরল শ্বেত-শুভ্র পুষ্প এটি।
পৃথিবীর একমাত্র জলসহিষ্ণু গোলাপ হচ্ছে গুজাকাঁটা। দেশে রঙ-বেরঙের যত গোলাপ আছে সবগুলোই ভিনদেশি। যেগুলো ধার করে এনে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। কিন্তু গুজাকাঁটা ওরফে বনগোলাপ হাওরাঞ্চল তথা সুনামগঞ্জের পল্লী প্রকৃতিতেই বেশি দেখা মেলে। এছাড়া সিলেটের রাতারগুল এবং ভারত ও মিয়ানমারের কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে স্বল্প সংখ্যায় জন্মে এই দুর্লভ গাছটি। বর্তমানে এটি বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Rosa Clinophylla, আরেক নাম R. Involucrata
ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ গুজাকাঁটা পানিসহিষ্ণু স্বভাবের উদ্ভিদ। জলের ভেতর অদ্ভুত ক্ষমতা লালন করে চলে এ বৃক্ষ। হাওরের কান্দা, ডোবা-নালা, খাল-বিলের তীরবর্তী অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গাই যার বেড়ে ওঠার উপযুক্ত স্থান। গাছটি বছরের (আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন) চার মাসই থাকে পানিতে নিমজ্জিত। হাওর পারের অতিচেনা এই বৃক্ষটি বর্ষার জলে যবুথবু হলেও হেমন্তে আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে ওঠে জঙ্গলের সৌন্দর্য বর্ধনে। ছোট ছোট পাতা আর সরু চিকন ডালপালায় সজ্জিত রূপ ধারণ করে গাঢ় সবুজের গুজাকাঁটা। ডালে ডালে পঞ্চ পাপড়িতে ফুটে সফেদ পুষ্পের হাসি। ঘন ঝোপের আড়ালে কাঁটা লুকিয়ে সৌরভ বিলায় শুদ্ধ সুশ্রী এই বনগোলাপ। বসন্তের ভর মৌসুমে ফুটে এ ফুল। থাকে বর্ষাকাল পর্যন্ত। হাওর পারে যত্রতত্র জনবসতি স্থাপন, চারনভূমি ধ্বংস ও বন-জঙ্গল উজাড়সহ নানা কারণে বিপন্নের তালিকায় বনগোলাপের বাড়ন্ত পরম্পরা। ধীরে ধীরে হয়তো হাওরাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাবে এ ফুল।