- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

গুরুত্বপূর্ণ বোগলাখালি বাঁধ নিয়ে চিন্তিত কৃষকরা

বিশেষ প্রতিনিধি
‘এই বাঁধ ভাঙলে দিরাই, শাল্লা, খালিয়াজুড়ি, আজমিরিগঞ্জ, ইটনা-মিঠামইনের হাওরের ধানও ভাসাইয়া নিবো, ইটা যত আগে বান্দন (বাঁধ দেওয়া যাবে) যাইবো, তত মজবুত অইবো, ইবার একটু কামে (কাজে) ধীর গতি আছে, তাড়াতাড়ি করলে ভালা অইবো।’
মতলিব মিয়ার পাশে দাঁড়ানো আরেক কৃষক (নাম বলতে নারাজ) বললেন, ‘বাঁধে একপল্লা একপল্লা মাটি পালাইয়া দুর্মুজ করার দরকার আছিল, তারা ইটা করছে না। এখনো বাঁধে ৪০ ভাগ কাজ অইছে না, তাগদাও কম, অখন হাওরের পানিও নামের না, কেনে যে তারা বাঁধ বান্দের না জানি না।’
হাওরাঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজার বা ভাঙনের একটি জামালগঞ্জে বোগলাখালি (কাইলানির বাঁধে) বাঁধে বুধবার বিকালে দাঁড়িয়ে এভাবেই মন্তব্য করছিলেন পাশের ফাজিলপুরের কৃষক মতলিব মিয়াসহ দুই কৃষক। বোগলাখালি বাঁধটি জামালগঞ্জের পিয়াইন নদীর ফাজিলপুর ও মোড়লপুর এলাকায় করা হয়। পিয়াইন নদী শুরু হয়েছে সুরমা নদী থেকে জামালগঞ্জের আলীপুর মাতব্বরপুর থেকে। এই নদী গিয়ে দিরাইয়ের কালনী নদীতে মিশেছে।
কৃষকদের সঙ্গে এই নিয়ে বুধবার বিকালে সরেজমিনে বাঁধে গিয়ে কথা বলার সময় তারা এসব কথা বলছিলেন। বাঁধ পরিদর্শনে আসা জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভাপতি আসাদ আলীকে এসময় ডেকে বললেন, দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করুন, আপনারা এখনো নদীর মাঝখানে কেন মাটি ফেলছেন না?
পিআইসি সভাপতি আসাদ আলী অজুহাত হিসাবে এসময় দাঁড় করালেন, নদীর মাঝখানটা বন্ধ না করার জন্য দিরাইয়ের রফিনগরের মানুষের আপত্তি আছে, এজন্য খোলা রাখা হয়েছে।
রফিনগর ইউনিয়নের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান শৈলেন্দ্র কুমার তালুকদার বৃহস্পতিবার সকালে এ প্রতিবেদককে বললেন, এখন আর পিয়াইন নদী দিয়ে দিরাইয়ের কালিয়াখুটা হাওরের পানি নামছে না। সামান্য পানি ফুলিয়াটানা দিয়ে নামছে। অন্যান্য বছর বোগলাখালি বাঁধার (বাঁধ দেবার আগে) আগে পানি নামার সময় দেবার জন্য আমরা অনুরোধ করেছি। এবার পানি নামার কোন সমস্যা নেই। হাওরে ওইভাবে পানিও নেই। এখন ভোগলাখালির কাজ শেষ না করলে বাঁধ দুর্বল হবে। এই বাঁধে জামালগঞ্জের পাগনার হাওর, দিরাইয়ের কালিয়াখুটা হাওর এবং শাল্লা ও খালিয়াজুড়ির ছায়ার হাওরের ফসলসহ অসংখ্য ছোট বড় হাওরের ফসল অকাল বন্যা থেকে রক্ষা করে। এটি ভাটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাঁধের অন্যতম।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জামালগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বললেন, বোগলাখালি হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষা বাঁধের মধ্যে অন্যতম ক্লোজার। এই ক্লোজার বন্ধের জন্য ৩৯ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ৩৫ ও ৩৬ নম্বর পিআইসি এই কাজ করছে। নদীর ডান পাড় থেকে মাঝখান পর্যন্ত এক পিআইসি, বাম পাড় থেকে মাঝখান পর্যন্ত আরেক পিআইসি কাজ করবে। পিআইসিগণ কাজ শুরু করার পরই বলা হয়েছে, প্রতি লেয়ারে লেয়ারে (স্তরে স্তরে) কমপেকসনের (মাটি বসানোর) কাজ করার জন্য। আমরা সামনে থাকলেই সিডিউল মোতাবেক কাজ হয়, না হয় ঠিকভাবে কাজ হয় না। ১৮০ কিলোমিটার বাঁধের কাজ দেখভাল করা আমার একার পক্ষে কঠিন হয়। নতুন তিনজন লোক দেওয়া হয়েছে, তাদের বুঝতে বুঝতে সময় চলে যাচ্ছে।
পিয়াইন নদীর এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁধের কয়েক কিলোমিটার উজানে পাগনার হাওরপাড়ের গজারিয়া ও কান্দবপুরের পাশের ক্লোজারে গিয়ে দেখা গেলো, ওখানে বিশাল বাঁধের স্লোফ ঠিকভাবে হয় নি। বাঁধের একপাশে ফাটলও ধরেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেটের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বাঁধ সরেজমিনে দেখার সময় বলছিলেন, স্লোফ ঠিক না করলে বৃষ্টি আসলেই বাঁধে ধস শুরু হবে।
জামালগঞ্জের লক্ষীপুর ক্লোজারও বিশাল হালির হাওরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ওখানে ভেজা মাটি ভেতরে দিয়ে বাঁধ উঁচু করা হচ্ছে, একারণে বাঁধের ভেতরের মাটি কমপেকসন হচ্ছে না।
এই ক্লোজারের কয়েক কিলোমিটার উজানের মুচিবাড়ী ক্লোজারে কাজ শেষ করে এক্সেভেটর সরানো হয়ে গেছে। এখানে কোন শ্রমিকও কাজ করার নেই। কিন্তু এই বাঁধের স্লোফ ১৬ মিটারের স্থলে ১০ মিটার করে রাখা হয়েছে।
কেবল বোগলাখালি, গজারিয়ার কান্দবপুর, লক্ষীপুর কিংবা মুচিবাড়ী নয়, জেলাজুড়ে ১২৭ ক্লোজারেই সবগুলোতেই কাজ এখনও অসম্পুর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ রয়েছে।
হাওররক্ষা বাঁধ মনিটরিং ও বাস্তবায়ন জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে কোন ত্রুটি মেনে নেওয়া হবে না। বাঁধে বাঁধে কর্মকর্তাগণসহ আমি নিজে যাচ্ছি, যেখানে কাজ শুরু হয় নি সেখানে তিনদিনের মধ্যে কাজ শুরু করতে হবে। যেই বাঁধ অসম্পুর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ দেখছি, এক সপ্তাহ পর আবার যাব, এরমধ্যে ত্রুটি সারাতে হবে, না হয় বিল আটকানোসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম বললেন, সুনামগঞ্জে অবস্থান করে তিনদিন হয় বাঁধে বাঁধে ঘুরছি। জেলার ১২৭ ক্লোজারের ১০০ টিতে কাজ চলছে। অন্যগুলোতে এই সপ্তাহে কাজ শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাঁধের কাজ শেষ করতে হবে।
সুনামগঞ্জের ৫২ টি হাওরের ফসল অকাল বন্যার কবল থেকে রক্ষার জন্য এবার ৫৩০ কিলোমিটার বাঁধ ৭২০ টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি’র) মাধ্যমে করা হবে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৭১৫ টি পিআইসি গঠন হয়েছে। ৫৩০ কিলোমিটার বাঁধে বড় ভাঙন চিহ্নিত করা হয়েছে ১২৭ টি। এরমধ্যে ১০০ টি বড় ভাঙনসহ ৫২৪ টি অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কাজ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম। এজন্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে প্রায় ৬৭ কোটি টাকা।

  • [১]