গোলাম সরোয়ার লিটন
ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের বাসিন্দারা নিন্দা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তাঁরা এ ধরনের ঘটনা বন্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং অভিভাবক, সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহবান জানান।
জেলার ইসলামী চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানুষ হত্যা ক্ষমার অযোগ্য পাপ। যারা নিরীহ মানুষ হত্যা করে রাষ্ট্র ও সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, বিভিন্নভাবে সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ তৈরি করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে দুর্বিষহ ও ভীতিকর করে তোলে তারা জঘন্য অপরাধের কাজ করলো। এরা ইসলামের বিপথগামী। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম তাহিরপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবু সাঈদ বলেন,‘আমরা এ সকল ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। মানুষ হত্যা করে, বোমা হামলা করে, নিরীহ নারী শিশুর ওপর ইসলামের নামে হামলা করে এরা মুসলমান আর ইসলামকে কলংকিত করছে। এরা ঈদের দিন দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাতে হামলা করতে চায়। এদের বিরুদ্ধে সকল মানুষের বিশেষ করে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। পবিত্র কোরআন ও হাদীসের কোথায়ও মানুষ মারা বা বোমা হামলার কোন কথা নেই। এ সকল জঙ্গিরা ইসলামের বিপথগামী। জঙ্গি হামলার ঘটনার নিন্দা জানাতে ও এ বিষয়ে জনসচেতনা তৈরিতে আমরা বিভিন্ন কর্মসুচী নেওয়ার কথা ভাবছি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরবাসী ধর্মপ্রাণ কিন্তু তাঁদের মধ্যে ধর্মান্ধতা বা উগ্রতা নেই। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও গভীর। এই অঞ্চলে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চা দীর্ঘদিনের। মুক্তিযুদ্ধে হাওরবাসীর রয়েছে গৌরব উজ্জ্বল ভুমিকা। হাতে গোনা কিছু লোক ছাড়া ওই সময় হাওরপাড়ের বাসিন্দা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনেই স্থানীয় সচেতন লোকরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ১ জুলাই রাত পৌনে নয়টায় গুলশানে জঙ্গি হামলা ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা। এবং ৭ জুলাই ঈদের দিন সকাল পৌনে নয়টায় আরেক হাওর জেলা কিশোরগঞ্জ চরশোলাকিয়ায় ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলার ঘটনায় হাওরবাসী হতবাক ও বিক্ষুব্ধ ।
জামলাগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরপাড়ের আবু বক্কর (৬০) বলেন, যারা নিরীহ মানুষ মারে, দেশের সুনাম ও অর্থনীতির ক্ষতি করে তারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী হতে পারে না। ইসলাম ধর্মের অনুসারী কোন ব্যাক্তি ঈদের জামাতে হামলায় যেতে পারে না।
এলাকাবাসাীর কাছ থেকে জানা যায়, প্রতি বছর ঈদের নামাজ পড়তে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে উপস্থিত হন। প্রতিবছরের মতো এবারও বিপুল সংখ্যক হাওরবাসী শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ পড়েছেন। হাওরবেষ্টিত উপজেলা তাহিরপুর,জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশম্ভরপুর উপজেলার অনেকেই আছেন যাদের নিজেদের কিংবা পূর্বপুরুষদের বাস ছিল কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে। কিশোরগঞ্জ জেলাটিও হাওরাঞ্চল হওয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যে সহ নানা ধরনের আত্মীয়তাও রয়েছে সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর। কিন্তু দেশের বৃহত্তম ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় হামলার পরিকল্পনার ঘটনায় সবাই বিক্ষুব্ধ। পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ৫শ গজ দুর চরশোলাকিয়ায় জঙ্গিদের আটকে দেয়। এ ঘটনায় ২জন পুলিশ ও একজন গৃহকর্ত্রী ঘরে রান্নারত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। এ সময় একজন জঙ্গিও নিহত হয়।
জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে হাওরপাড়ের বাসিন্দা ‘পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা’ সংগঠনের আহবায়ক হুমায়ুন মল্লিক বলেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক রাজনৈতিক চর্চা জোরদার করতে হবে। নৈতিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা বাড়াতে হবে। সুস্থ সাংস্কৃতি চর্চা লালন ও সম্প্রসারণ করতে হবে । অভিভাবকদের কে আরো সচেতন হতে হবে। এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
হাওরপাড়ের বাসিন্দা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমীর রেজা বলেন, সুনামগঞ্জের হাওরবাসী ধর্মপ্রাণ । ধর্মান্ধতা বা ধর্মীয় উগ্রতা আমাদের রক্তে নেই। আমাদের ঐতিহ্য হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। জঙ্গিবাদকে হাওরবাসী তীব্র ঘৃণা করে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপংকর ভট্রাচার্য্য কাঞ্চু বলেন,‘ হাওরবাসীর মধ্যে ধর্মীয় উগ্রতা নেই। ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং শিক্ষকদের যুবক ও তরুণদের মধ্যে সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি এদেশে জঙ্গিবাদের কোন স্থান নেই।
‘আমরা হাওরবাসী’ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী ও তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন,‘ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। সমাজের সর্বস্থরে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এসব থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি নুরুল আমিন বলেন, ইসলামের নামে যারা এই জঙ্গি হামলা করছে তারা ইসলামের শত্রু। যুবক ও তরুণদের এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা রেখে বিপথগামী হওয়া থেকে ভাই-বন্ধুদের রক্ষা করতে হবে। ’