বিশেষ প্রতিনিধি
এবারের বন্যায় সরকারি হিসাবে সুনামগঞ্জের ৬৮ হাজার কৃষকের গোলার ধান ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ছোট কৃষকরা যেমন কষ্টে পড়েছেন, বড় কৃষকরাও আরো বেশি বেকায়দায় আছেন। কৃষি অফিস বড় কৃষকের সংখ্যা দুইশ’ এর বেশি হবে না দাবি করলেও, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোর কৃষকরা এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি দাবি করেছেন। সামর্থবান অনেক কৃষকের বাড়ি ধংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। ধান পচা গন্ধ রয়েছে বাড়ির আশপাশে। কেউ কেউ বাড়ি ছাড়ার পর এখনো ফিরেন নি আর বাড়িতে। বাড়ির দীর্ঘদিনের কৃষি শ্রমিকরা কেবল বড় গৃহস্তির স্মৃতি রোমন্থন করছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের পীরপুর গ্রামের বড় কৃষক আব্দুস সালাম। গেল বোরো মৌসুমে ধান পেয়েছেন দুই হাজার মণেরও বেশি। বাড়ির গোলায় রেখেছিলেন ২০০ মণ ধান। বাকী ধান ছিল পাশের অটো রাইসমিলে। বাড়ির গোলা ডুবেছে, চাল ছুঁয়েছে পানি। মিলের ধানও ডুবেছে। গোলায় থাকা ২০০ মণ ধান পচে এলাকাজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। দুর্গন্ধ আছে মিলের আশপাশেও।
আব্দুস সালামের বাড়ির কৃষি শ্রমিক বাচ্চু মিয়া ও মোমিনা বেগম ছাড়া ১৬ জুন গভীর রাতের পর বাড়ি ছেড়ে যাওয়া আর কেউ এখনো (রবিবার পর্যন্ত) বাড়ি ফিরেন নি।
মোমিনা বেগম বললেন, মাথার উপর দিয়া ঢেউ গেছে। গোলা ঘরের ইটের দেওয়াল ভেঙে ভেসে গেছে ধান। বন্যার পানি ছাল ছুঁয়েছে। জান (প্রাণ) লইয়া কোন লাখান (রকমে) গেছি (গিয়েছি) আমরা। চাইর (চার) জন বছরচুক্তির শ্রমিক আছিল, এরা যে গেছে, আর ফিরছে না। ধান বার (বের) করার কোন উপায় আছিল না। বাড়ির ধান মিলের ধান, সব পইচ্ছা (পচে) গন্ধ বারাইছে (বেরিয়েছে), মালিকের মাথায় চৌরঙ্গি (মাথা ঘুরতেছে) মারছে। মালিক আর বাড়িত আইছইননা (আসেন নি)। গরু, বাছুর মরেছে, যেগুন (যেগুলো) আছে, খাওয়াইবার (খাওয়ানোর) কোনতা (কিছুই) নাই, চাষের ট্রাক্টর, মাড়াইকল ১০—১২ দিন ডুইব্বা আছিল (ডুবে ছিল), মালিকে আর সামনেরবার চাষবাস করবো কি না জানি না।
মুঠোফোনে কথা বলার সময় কৃষক আব্দুস সালাম বললেন, খেতের ধান বন্যায় আগেও গেছে, তবে এতো ক্ষতি ৬০ বছর বয়সে দেখি নাই, গোলার ধান এইভাবে কোন সময় গেছে না, বাড়িতে কিছুই নাই, সুনামগঞ্জ শহরের বাসায় আছি, ওখানে গেলে ধৈর্য ধরা কঠিন, এজন্য যাচ্ছি না।
মোমিনা বেগম এর পাশে দাঁড়ানো আব্দুস সালামের ভাই মতিউর রহমান (পৃথক পরিবারে বসবাস) জানালেন, তার ১৬ হাত লম্বা কংক্রিটের পিলারের খড়ের ঘর প্রথম ধাক্কায় ভাসিয়ে নেয়। রাত ১২ টায়ই পানি গোয়াল ঘরে কোমর সমান হয়। ১৭ টি গরু একটি দু’তলায় নিয়ে তুলতে তুলতে দুটি মারা গেছে। এই কয়েকদিনে আটটি গরু অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করেছেন। যেগুলো আছে, সেগুলোও ঘাসের অভাবে বিক্রি করতে হবে। এক হাজার মণ ধান গেল বোরো মৌসুমে গোলায় তুলেছিলেন। এরমধ্যে চারশ মণ পচে এলাকাজুড়ে গন্ধ বের হওয়ায় কোনভাবে শ্রমিক লাগিয়ে দূরে হাওরে নিয়ে ফেলেছেন। ৬০০ মণ ধান আছে, এগুলো থেকেও পচা গন্ধ বের হচ্ছে। ১২ টি ছাগল ছিল, ৫ টি পানিতে মরেছে, চারটি কম দামে বিক্রি করেছেন, ট্রাক্টর নষ্ট হয়ে আছে, মাড়াই মেশিনও শেষ। এই কৃষক দাবি করলেন, বড় কৃষককে রক্ষা করতে হলে, পুরোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধের চাপ না দিয়ে নতুন কৃষি ঋণ দিতে হবে। না হয় চাষাবাদে ফেরা কঠিন।
গ্রামের আরেক বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক মো. আব্দুল হাফিজ বললেন, ধাণের গোলাসহ ঘর ভেসে গেছে, আড়াইশ মণ ধানের মধ্যে ৬০—৭০ মণ ধান কয়েকদিন হয় কোনভাবে শুকিয়েছেন। এই শুকনা ধান থেকেও পচা গন্ধ বেরুচ্ছে।
গ্রামের হিরণ মিয়া, রুমি বেগম, সুমন মিয়া ও বাচ্চু মিয়া সকলেই ধান পচে গন্ধ বের হবার কষ্টের বিবরণ দিলেন।
এই গ্রামের কৃষকরা জানালেন, দেখার হাওরপাড়ের আব্দুল্লাপুর, সাধকপুর, দরিয়াবাজ, ছনপুর, গোয়াছড়া, ইছাগড়ি, ভবানিপুর ও লালপুরের ছোটবড় কৃষক বাড়িতে একই চিত্র। বড় কৃষকের বাড়ির পাশ দিয়ে গেলেই ধান পচা গন্ধ নাকে লাগছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ—পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানালেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬৮ হাজার ৫১১ জন কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা পেলে তাদেরকে প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হবে। ইতিমধ্যে সাত হাজার ৫৭০ চাষীদের মধ্যে রূপা আমনের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বড় কৃষকের সংখ্যা ২০০ হবে না দাবি করে এই কৃষি কর্মকর্তা বললেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকগণকে জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষি ঋণ দেবার জন্য ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঋণ দেবার জন্য প্রত্যয়ণ দেবেন তারা।