প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম কারণ ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। দেশে ভূমি সংস্কার না হওয়ায় এ ধরনের সমস্যা আরো বেড়ে উঠছে। এতে সরকারি তো বটেই, বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি লক্ষণীয়। জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্পের কাজ করার ক্ষেত্রে পদে পদে স্থানীয়দের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে এলজিইডি, যা শেষ পর্যন্ত মামলায় গড়াচ্ছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে এমন প্রতিবন্ধকতার জন্য সরকারের বিদ্যমান জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। তাদের অভিমত, ঢাকা শহরে যেভাবে আবাসন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে, গ্রামেও সেভাবে প্রকল্পগুলো নেয়া হোক। তারপর সঠিক নিয়মে সেখানকার অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। এতে একদিকে যেমন গ্রামে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ বন্ধ হবে, অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে অহেতুক প্রতিবন্ধকতাও এড়ানো যাবে। এলজিইডি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্রামের মানুষ মেঠো পথ চায়, পাকা সড়ক চায় না। কারণ এতে জমির ওপর মালিকানা হারানোর ভয় থাকে তাদের। ফলে অবকাঠামো নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এলজিইডি কার্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা চলমান রয়েছে, যা বাধাগ্রস্ত করছে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম। জমির মালিকানা নিয়ে ব্রিটিশদের করে দেয়া আইন-কানুনেই চলছে দেশ। সরকারের বিদ্যমান জমি অধিগ্রহণ পদ্ধতিই পরিকল্পিত গ্রামীণ বসতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রধান বাধা।
ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে প্রকল্প গ্রহণের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, যা এলাকাবাসীর কোনো কাজেই আসে না। এমন অবস্থায় এলজিইডির প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে তুলে ধরে তাদের সহায়তা চাওয়া হলে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা এড়ানো অসম্ভব হবে না বলেই ধারণা। ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে সরকারের বিধিবিধান কার্যকরভাবে পালন করা হলেও এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয় না। স্থানীয় জনগণ ভূমির বিনিময়ে যথাযথ মূল্য পেলে বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকলে তাদের মধ্যে জমি হারানোর ভয় হ্রাস পাবে। সবচেয়ে জরুরি প্রকল্প সম্পর্কে মানুষকে বোঝানো এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের মাধ্যমেই ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে এলজিইডি। জোরপূর্বক যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ব্যতিরেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে বিপত্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সর্বোপরি ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কর্মপদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নির্ধারণও জরুরি। এ-সংক্রান্ত সরকারের বিধিবিধান যথাযথ অনুসরণ করা হলে জটিলতা তৈরি হওয়ার কথা নয়। এলজিইডি সেগুলো অনুসরণ করছে কিনা, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গ্রামীণ ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে স্বল্প ভূমি ব্যবহারপূর্বক সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের নীতি নিয়ে এলজিইডিকে কাজ করতে হবে। বরাদ্দ এসেছে বলে দ্রুত ব্যয় করার মানসিকতা নিয়ে উপযোগবিহীন প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকতে হবে এলজিইডিকে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক অনাবশ্যক প্রকল্প নিয়েছে তারা। এতে ভূমির অপচয়ই হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভূমি রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। অর্থাৎ স্বল্প ভূমি ব্যবহারপূর্বক একই সুবিধা নিশ্চিত করার মতো প্রকল্প হাতে নেয়া উচিত। গ্রামের মানুষ শেষ সম্বল হিসেবে ভূমিকে আঁকড়ে রাখতে চায়। কারণ এটিই তার জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস। এক্ষেত্রে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা বা ক্ষতিপূরণ দেয়া গেলে জমির প্রতি তাদের উৎসাহ কিছুটা হলেও কমবে। সর্বোপরি ভূমি অধিগ্রহণ নীতিমালা সংস্কারের মাধ্যমে আরো যুগোপযোগী করে তোলা প্রয়োজন।