সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত রোগী আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কিন্তু সামাজিক বিড়ম্বনার ভয় ও উপজেলা হাসপাতালে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভোগান্তির কারণে উপসর্গ থাকার পরও করোনা পরীক্ষা করছেন না অনেকে। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারেও উদাসীনতা রয়েছে। সচেতন নাগরিকরা এই প্রবণতাকে সক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বলে মন্তব্য করেছেন। সিভিল সার্জন অবশ্য বলছেন, গ্রামের কারো জ¦র হলেই, পরীক্ষা ছাড়াই করোনা রোগী বিবেচনা করে বাড়িতেই চিকিৎসা দেয়া হবে।
জেলার তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ের গ্রাম মালেককিল্লা’র বাসিন্দা বায়েজিত আহমদ অপু। তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে পড়াশুনা শেষ করে এখন বাড়িতে রয়েছেন। অপু বললেন, গ্রামের প্রায় সব ঘরেই কম-বেশি মানুষ অসুস্থ রয়েছেন। এদের অনেকের জ¦র সর্দি, গলা ও শরীরে ব্যথা। আমরার ঘরেও ৫ জন রোগী রয়েছে। যারা অসুস্থ তারা করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন কিনা? জানতে চাইলে অপু’র উত্তর, কেউই পরীক্ষা করায় না, তারা মনে করে হাসপাতালে নিয়ে আটকিয়ে রাখবে, ইনজেকশন দেবে। এজন্য কেউ টেস্ট করায় না।
এদিকে শুক্রবার (৯ জুলাই) জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্যমতে জেলায় গত ২৪ ঘন্টায় ৫৬ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ১৩৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৮৩ জনের ফলাফল পাওয়া গেছে। এতে করোনায় আক্রান্ত সনাক্ত হয়েছেন ২৫ জন এবং ১০৯ জনের এন্টিজেন নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে করোনায় আক্রান্ত ৩১ জন। এ দু’রকমের প্রাপ্ত রিপোর্টে সনাক্তের হার ২৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ২০ জন, দোয়ারাবাজারে ১ জন, বিশ্বম্ভরপুরে ১ জন, তাহিরপুরে ৩ জন, জামালগঞ্জে ৭ জন, দিরাইয়ে ৫ জন, ধর্মপাশায় ৭ জন ও ছাতকে ১২ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আরিফুল ইসলাম বললেন, আমার ইউনিয়নের অনেক মানুষের জ¦র, সর্দি, কফ রয়েছে। জ¦র হলে পুরো পরিবারের লোকজন আক্রান্ত হচ্ছেন।
তিনি বললেন, সাধারণ মানুষ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনার নমুনা পরীক্ষা করাতে যায় না, কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়, একজন মানুষকে উপজেলা সদরে আসা যাওয়া করতে ৩শ’ টাকা প্রয়োজন, লকডাউনে কাজ না থাকায় এমনিতেই হাতে টাকা নেই, এতো টাকা খরচ করে যেতে চায় না নিম্ন আয়ের মানুষ।
তিনি জানালেন, দোয়ারা সীমান্তের বাংলাবাজার, লক্ষীপুর ও তার বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদে এসে করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বলেছেন তারা। কিন্তু এখনও এই ধরনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের বাদেরটেক গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুল আমিন। তিনি সিলেট ল’কলেজে এলএলবি শেষ বর্ষের ছাত্র। দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাগবেড় বাজারে গার্মেন্টস’র দোকান দিয়েছেন।
তিনিও বললেন, আমাদের গ্রামের অনেকেরই জ¦র। যে অসুস্থ্য, সে তা প্রকাশ করে না। তারা ভাবেন, জ¦র হয়েছে মানুষ জানলে সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হবেন। এজন্য লুকিয়ে এলাকার ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে খায় তারা।
জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাক ইউনিয়েনের ৭ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু তালুকদার জানালেন, তার এলাকায় ১৫ ভাগ মানুষ জ¦র, সর্দি ও কফে আক্রান্ত। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়লেও গ্রামের মানুষ করোনা টেস্ট করাতেচায় না। তিনি বললেন, আমি সাধারণ মানুষের মাঝে সাবান, মাস্ক বিতরণ করেছি। বুঝিয়ে বলেছি, বার বার হাত ধোয়ার জন্য। দোকানগুলোতেও বলেছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেঁচাকেনা করার জন্য। কিন্তু কেউ এসব কথা শুনে না। এজন্য আজ শুক্রবার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের ডেকেছি। যেকোনো ভাবেই মানুষকে সচেতন করতে হবে।
গত ৫ জুলাই একই দিনে তাহিরপুরে ৬ জন মারা গেছেন। ঘটনার পরে মৃত্যুর কারণ তদন্ত করে দেখেছে মেডিক্যাল টিম।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মির্জা রিয়াজ বললেন, ঘটনার পরে মেডিকেল টিম নিয়ে বের হয়েছিলাম। বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছি। একজন সন্দেহজনক করোনা রোগী ছিলেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। অন্যরা কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নি।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক)’এর সহসভাপতি অ্যাড. খলিল রহমান বললেন, সারাদেশেই করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। এজন্য আমাদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আমাদের জেলায়ও গ্রামে গ্রামে মানুষের জ¦র সর্দির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এবিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও সর্তক হতে হবে। হাসপাতালে আইসিইউ সহ উচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন বললেন, আমাদের এতো জনবল নেই, যে ইউনিয়ন পর্যায়ে গিয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করবো। এজন্য তিনি জ¦র হলেই করোনা রোগী ভেবে বাড়িতে আটকে রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন,
বৃহস্পতিবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব মহোদয়ের সঙ্গে অনলাইনে মিটিং হয়েছে, স্যারের নির্দেশনা হলো- গ্রামে এই বিষয়ে তদারকি করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বারদের নিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি করতে হবে। সেখানে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী, বিদ্যালয়ের শিক্ষাকরা থাকবেন। তারা যে বাড়িতে জ¦রের রোগী থাকবেন সেখানে গিয়ে বলবেন রোগী যেনো বাইরে না বের হয়। জ¦র হলেই করোনা ভেবেই থাকে বাড়িতে আটকে রাখতে হবে। সে যেনো বাইরে গিয়ে অন্যের সঙ্গে মিশতে না পারে। তাহলেই এটাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।