অ্যাড.আমিরুল ইসলাম
সরকার দেশের সবকটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ৬ টি ধাপে নির্বাচনী তারিখ ঠিক করেছিল। ইতিমধ্যে ৫ টি ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বাকীগুলোর সময় আসন্ন। অন্য বারের চেয়ে এবারের নির্বাচনে ব্যতিক্রম হলÑ এবারের ইউ/পি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ফলে জনমতের প্রতিফলন ঘটছে না ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা আছে। আমার আলোচনা অন্যখানে-
আমি বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি সেটা লাগামহীন ভাবে বেড়ে যাওয়ার সময়ে লক্ষণীয় ভাবে বেড়ে যাওয়া দুটি জিনিস তার একটি হচ্ছে নৌকা অন্যটি ধান। আমার দাদা বাবার সৌখিন বাইচের নৌকা এবং প্রয়োজনে ব্যবহারে ছোট নৌকার দাম দেখেছি। কিন্তু এবারের নৌকার দাম, লক্ষগুনে বেড়ে গেছে। নৌকার খরিদ্দার অর্ধকোটি, কোটি টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকিয়ে নৌকা প্রতিকটি তাদের নামে ৫ বছরের জন্য নিলামে খরিদ করছেন। অবক বিষ্ময়ে নৌকা বাজার থেকে ধানের হাটে গেলাম। ধানের বাজারেও উর্ধ্বমুখী দরের প্রতিযোগিতা দেখা গেল। ওখানকার ধান ব্যবসায়ীরা কেউ কেউ নিজের বাসা পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন, বিক্রয়লব্ধ অর্থ ধান খরিদের ব্যবসায় লগ্নি করলেন। ধানের থেকে নৌকার দাম অনেকটা বেশীই ছিল। কেননা এই একটি নৌকা পেলেই যে, খুব সহজেই ওপাড়ে যাওয়া যাবে, সেখানে পৌঁছামাত্রই লগ্নিকৃত টাকা অনেক গুন হয়ে ফেরৎ আসবে।
স্থানীয় সরকারের বর্তমান “ইউনিয়ন পরিষদ” নামের প্রতিষ্ঠানটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কতগুলো গ্রাম নিয়ে একটি ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনের সৃষ্টি। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির ২২ নম্বর আদেশ দ্বারা “ইউনিয়ন পরিষদ” নাম পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এর আইনও পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯ জারী করা হইয়াছে এবং গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ কার্যকর করা হয়েছে।
গ্রামের উন্নয়নের পাশাপাশি ফৌজদারী ও দেওয়ানী বিচার করার ক্ষমতাও ইউনিয়ন পরিষদকে দেওয়া হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এর বিচারিক ক্ষমতার পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই আইনের অধীন ঘোষিত প্রত্যেকটি ইউনিয়নকে সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদের সাথে পঠিতব্য ৫৯ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে এতদ্বারা প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক একাংশ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ (২০০৬ সালের ১৯ নং আইন)। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের এখতিয়ারাধীন এলাকায় কতিপয় বিরোধ ও বিবাদের সহজ ও দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গ্রাম আদালত আইন গঠন এবং এতদ্বসংক্রান্ত বিষয়াবলী সম্পর্কে বিধান করা সমীচিন বলে ধারা অনুযায়ী আইন করা হইল এবং ধারা ১ অনুসারে এই আইন গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ নামে অভিহিত হইবে। ধারা ৫ এ বর্ণিত আদালত গঠন সম্পর্কে ৫(১) ধারা অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান এবং উভয় পক্ষ কর্তৃক মনোনিত দুই জন করিয়া মোট চার জন সদস্য নিয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হইবে। ধারা ৫ (২) মতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে সেক্ষেত্রে কোন কারণ বসতঃ চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হন সেক্ষেত্রে অন্যান্য বিধানাবলী রাখা হয়েছে। গ্রাম আদালত প্রায় ৩৫ টি বিধি এবং প্রত্যেক বিধিতে অসংখ্য উপবিধি আরোপিত বিধি ৩ এর (১) ৪ ধারার (১) উপধারা মতে নালিশ লিখিত ভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট দাখিল করতে হবে। গ্রাম আদালত ফৌজদারী মামলা সমূহের মধ্যে দন্ডবিধির প্রায় ৫২ টি ধারা এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অংশে বর্ণিত সমস্ত মামলা সমূহের বিচার করবেন।
আমার আজকের আলোচনা পুরো গ্রাম আদালত সম্পর্কিত নয় কেননা এর পরিধি বিশাল । শুধু আলোচনা ৬১ নং আইনের ২৬নং অধ্যাদেশ ২৬(১) এ বর্ণিত উপধারা ২ এর বিধান সম্পর্কে। যেখানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে। ইউনিয়ন পরিষদ আইন ও বিধিমালা এবং গ্রাম আদালত আইন, এতদ্বসম্পর্কিত বইগুলো পড়লে এবং আমাদের নির্বাচিত অনেক চেয়ারম্যান যারা কিনা সরকার প্রদত্ত আইন বলে সরকার কর্তৃক সৃষ্ট আদালতের চেয়ারম্যান বা বিচারক হিসাবে নিযুক্ত হবেন। অর্থাৎ যারা ইউনিয়নের একজন বিচারক হিসাবে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বিচার কার্য্য পরিচালনা করবেন। সেই ম্যাজিস্ট্রেটদের মধ্যে অনেককে যখন দেখি তারা প্রাইমারী পাস তো দুরে থাক প্রাইমারী স্কুলে পর্যন্ত ভর্তি হননি। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে শুধুমাত্র আঁকাবাঁকা কিছু টান দিয়ে তাকে দস্তখত হিসাবে দাবী করে চালিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক তখনই আমার মনে হতে থাকে আসলে পাগল- আমি, না জনগণ, নাকি সরকার ? যিনি আমি বা আমাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিচারকের চেয়ার দখল করেন। সেই বিচারক যখন অক্ষরজ্ঞান শূন্য হন তখন আমি/আমাদের পাগল মনে হয় আর যখন ভাবি যে সরকার আইন সৃষ্টি করে আলাদা আদালত সৃষ্টি করে ওই আদালতের বিচারক হিসাবে এরকম নিরক্ষর লোকগুলোকে বসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কি স্বজ্ঞানে করেছেন?