বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘আমার অবস্থা কী সারা গেরামের মানুষ জানে। ছেলে মারা যাওয়ার পর আমি ভালো করে একদিন মাছ পর্যন্ত খাইতে পারি নাই। এই মুহূর্তে ১০ হাজার টেকা পাওয়া মানে ১০ লাখ টেকা পাওয়ার সমান। এ সাহায্যগুলাই আমার এখন ভরসা।’ কাতর কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত কুলসুম (৪৭)।
তিনি আরও বলেন, ‘স্বামী নাই। বড় ছেলেডা গত বৈশাখ মাসে মারা গেছে। আরেক ছেলে ছোট। এক মেয়ে। বিয়ে দিয়া দিছি। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়েরে লইয়া বাবার বাড়িতেই থাকি। ভাইয়ান আছে, কিন্তু হেরার অবস্থাই ভালো না, আমারে দেখব কী কইরা। এর মাঝে থাকার ছোট ঘরডাও বন্যায় নিয়া গেছে, শেখ হাসিনার দেওয়া ১০ হাজার টেকায় কতযে উপকার অইছে।’
ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুর গ্রামে বিয়ে হয়েছিল কুলসুমের। স্বামী অজুদ মিয়া মারা যাওয়ার পর দক্ষিণ কামলাবাজ বাবার বাড়ি আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে ছোট্ট একটি ঘর বেঁধে খেয়ে না খেয়ে কোনরকম বসবাস করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক বন্যায় একমাত্র আশ্রয়স্থলটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় বিপদাপন্ন অবস্থা হয় কুলসুমের। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামত বাবদ দেওয়া সরকারি আর্থিক অনুদানের তালিকায় নাম ছিল না তাঁর।
গত ৪ জুলাই দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামে বন্যা ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে নগদ টাকা তুলে দিতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব প্রতিবেশীদের কাছে কুলসুমের ক্ষতির বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁকে ডেকে ঘর মেরামতের সরকারি অনুদানের ১০ হাজার টাকা তুলে দেন তিনি। ইউএনও’র কাছ থেকে টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ক্ষতিগ্রস্ত কুলসুম। শুধু কুলসুমই নয়, বানের পানিতে ঘর ভেঙ্গে এভাবে গৃহছাড়া হয়েছে জামালগঞ্জের অন্তত কয়েক হাজার পরিবার।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বন্যার পানি থেকে বাঁচতে জামালগঞ্জের ৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। এদের প্রায় সবাই কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মাঝে ৪২৫টি বন্যা কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ঘর মেরামত বাবদ ৪২ লাখ ৫০ হাজার নগদ অর্থ তুলে দিয়েছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবার পেয়েছে ১০ হাজার টাকা করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দুই-আড়াইশ পরিবার ৫ হাজার টাকা করে পাবে। এছাড়া সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর বানানোর ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য মাধ্যম থেকে আরও সহযোগিতা আসতে পারে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে, প্রথম পর্যায়ে বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে বন্টনকৃত অর্থের বিষয় নিয়ে নানা অভিযোগও উঠছে। পূর্ব থেকেই বিধ্বস্ত এবং ঘরে থাকে না এমন অনেক পরিবারকে বন্যা কবলিত দেখিয়ে অনুদানের অর্থ প্রদান করা হয়েছে। আবার বন্যায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই গৃহ নির্মাণের সরকারি ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগও করছেন। তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে এক্ষেত্রে বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত ছাড়াও মূলত অসহায় গরিব পরিবারগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বেহেলী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের শুধাংসু তালুকদার জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের জন্য সরকারি ১০ হাজার টাকা তিনি পেয়েছেন। অসুস্থ থাকায় এখনও ঘর মেরামত কাজে হাত দেন নি। বিপদের মুহূর্তে সরকারি এ অনুদান পাওয়ায় তার উপকার হয়েছে। শীঘ্রই সেই টাকার সাথে আরও কিছু যোগ করে বসতঘরটি মেরামত করবেন তিনি।
ফেনারবাঁক ইউপি সচিব অজিত রায় বলেন, এ ইউনিয়নে বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মালিকেরা ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। ফেনারবাঁক ইউনিয়নে সরকারি সহায়তা পেয়েছে ১৫০টি পরিবার। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকা প্রক্রিয়াধীন আছে। এখন যারা পাবেন তাদের বেলায় সম্ভবত টাকার পরিমাণটা কমে আসবে। এবার টাকার পরিমাণটা ৫ হাজার টাকা হতে পারে।
বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আমার ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে ৫৯টি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। বন্যায় যাদের বসতঘর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই এ টাকা পেয়েছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, বন্যা ক্ষতিগ্রস্তদের দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকা হচ্ছে ঠিক, তবে এক্ষেত্রে নানামুখী তৎপরতা আছে। উপজেলা প্রশাসন থেকেও ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। অন্যান্য খাত থেকেও টাকা আসবে। আবার সেনাবাহিনীও ঘর বানাতে সাহায্য-সহযোগিতা করবে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে যে টাকা দেওয়া হয়েছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করেই দেওয়া হয়েছে। মোট কথা হচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ছাড়াও যারা অতি গরিব তাদেরকেই সিলেক্ট করা হয়েছে।