বিশেষ প্রতিনিধি
জেলার নদী ও হাওরপথে’র ১৫ স্থানে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলছে। শনিবার রাতে ছাতকের সুরমা নদীতে চাঁদাবাজদের বেধরক মারপিটে এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনার প্রতিবাদে আজ রোববার থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে অনির্দিষ্টকালের নৌ-ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে নৌ-মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। ছাতকে চাঁদাবাজদের মারপিটে নিহত শ্রমিকের নাম- হারিছ মিয়া (৩৫), তিনি করিম নেওয়াজ নৌ-পরিবহনের একজন শ্রমিক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার ওররাইল গ্রামের খালিক মিয়ার ছেলে।
বাংলাদেশ জাহাজ-বাল্কহেড শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও বাংলাদেশ বাল্কহেড বোর্ড ওনার্স এসোসিয়েশনের ওরাইল- পাক শিমুল বন্দর আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েম আউয়াল বলেন,‘নামে-বেনামে রশিদে- বিনা রশিদে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন নদীপথে অন্তত. ১৫- ২০ টি স্থানে চাঁদাবাজদের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে নৌ-শ্রমিকরা। এরা বাল্কহেড, কার্গো বা জাহাজ প্রতি ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকাও আদায় করছে’।
এই দুই নেতাই জানান, ছাতকে সুরমা নদীতে ৩ স্থানে চাঁদা দিতে হচ্ছে তাদের। ছাতক পৌরসভার নামে পৌর এলাকার সুরমা নদীতে বাল্কহেড, কার্গো বা জাহাজ প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, ব্যবসায়ী সমিতির নামে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, ছাতক শহরতলির শ্যামপাড়া এলাকায় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।
গত এক সপ্তাহ হয় দোয়ারাবাজারেও সুরমা নদীতে ‘মুন্না’ নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি’র কথা বলে ৫০০
থেকে ১০০০ টাকা চাঁদা উঠানো হচ্ছে। একই নদীর কয়েক কিলোমিটার এসে আমবাড়ি থেকে হালুয়ারঘাট এলাকায় ইসমাইল নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা চাঁদা উঠানো হচ্ছে। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ অংশে নানা অজুহাত দেখিয়ে কমপক্ষে ৬ স্থানে টাকা দিতে হচ্ছে। কোন কোন সময় রয়েলিটি দুইবারও দিতে হচ্ছে। এছাড়া উপজেলা ট্যাক্স, পৌরসভা ট্যাক্স, সুরমা ও গৌরারং ইউনিয়ন ট্যাক্স, বিআইডব্লিউটিএ’র ট্যাক্স, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের রয়েলিটি আদায় করা হচ্ছে। এসব ট্যাক্সের কোনটি সঠিক-কোনটি সঠিক নয়, এটি জানেন না নৌ-শ্রমিকরা।
জামালগঞ্জের নদীপথে কয়লা বালু পাথর বহনকারী ভলগেট, কার্গো ও নৌকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি হয়। এই উপজেলার বৌলাই নদীর আহসানপুর, বেহেলী ও গজারিয়া এলাকায় এখনো মাঝে-মাঝেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে চাঁদাবাজরা। সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া, টেকেরঘাট, চারাগাঁও শুল্ক স্টেশন থেকে কয়লা-পাথর, চুনাপাথর, ফাজিলপুর থেকে বালু ও পাথর নিয়ে যাবার সময় সোলেমানপুর ও শানবাড়ি এলাকায় চাঁদাবাজি হয়। চাঁদা না দিলে মারপিটসহ প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে নৌ শ্রমিকদেরকে। এসব চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণকদের মধ্যে সরকার দলীয় নেতা, জনপ্রতিনিধির ছেলে এবং স্বজনরাও রয়েছেন। চাঁদাবাজরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না নৌ-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। নদীতে চাঁদাবাজদের আইন-ই নৌ-শ্রমিকদের মানতে হবে। না মানলে বেধরক মারপিট করা হয়।
জাহাঙ্গীর আলম ও আবু সায়েম আউয়াল বলেন,‘রোববার সন্ধ্যায় সিলেটের কানাইঘাটের ধোবা থেকে করিম নেওয়াজ নৌ-পরিবহন নামের বাল্কহেডটি ঢাকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় সুরমা নদীর ছাতক পৌরসভার শ্যামপাড়া এলাকায় মারূফ মিয়া, গোলাপ মিয়া ও কদ্দুছ মিয়া বাল্কহেডটি আটক করে চাঁদা দাবি করে। এসময় বাল্কহেড’র শ্রমিক হারিছ মিয়া চাঁদা কী কারণে দিতে হবে, জিজ্ঞেস করায় লোহাড় রড দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করা হলে সে গুরুতর আহত হয়। আহত অবস্থায় হারিছ মিয়াকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার থেকে দেশব্যাপি অনির্দিষ্টকালের নৌ-ধর্মঘট ডাকা হয়েছে’।
বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মান্নান মিয়াজি বলেন,‘দেশের সকল নৌ-পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এই ধর্মঘট সমর্থন করেছে। বাল্কহেড শ্রমিক হারিছ মিয়ার খুনীদের গ্রেপ্তার- বিচার ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে এই ধর্মঘট চলবে’।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন,‘সুনামগঞ্জের নৌ-পথের ৭ টি পয়েন্টে চাঁদাবাজি হয় উল্লেখ করে গত বছর নৌ-শ্রমিকরা আবেদন করায় ঐসব পয়েন্টে পুলিশ অভিয়ান চালানো হয়েছিল এবং ঐসব পয়েন্টে চাঁদাবাজিও বন্ধ হয়েছিল, এবার আমরা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আবার পুলিশি অভিযান চালাবো, আজ (রোববার) রাতে কেন্দ্রীয় শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানাবো এবং তারা শ্রমিক খুনের ঘটনায় মামলা দিলে মামলা নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা আশা করছি ধর্মঘট প্রত্যাহার করবেন শ্রমিক সংগঠনগুলো’।
বিকাল ৬ টায় বাংলাদেশ বাল্কহেড বোর্ড ওনার্স এসোসিয়েশনের ওরাইল- পাক শিমুল বন্দর আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েম আউয়াল জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নৌ-ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।