- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

চারদিন ধরে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে আছেন মা

বিশেষ প্রতিনিধি
‘চারদিন ধইরা নাওয়া খাওয়া বন্ধ তার মায়ের, বিছনা থাকি ওঠতেছে না, কান্না-কাটি আর আহাজারি করে সময় পার করছে। আমি বিপদে পড়ছি বাবা, আমারে না জানাইয়া পাসপোর্ট কইরা খালি বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করতো, পরে জমি-জমা বন্ধক দিয়া দালালরে প্রায় আট লাখ টেকা (টাকা) দিসি, আমার পুয়াটারে নিয়া মারছে হেরা, অখন তার লাশটা যদি পাইরে বাবা, সকলে মিইল্লা চেষ্টা কইরা দেইন।’
লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া সাজ্জাদুর রহমানের বাবা নুরুল আমিন তালুকদার রবিবার সন্ধ্যায় আহাজারি করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন। রবিবার (৩০ জানুয়ারি) ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পরিচয় জানানো সাত বাংলাদেশির মধ্যে একজন সাজ্জাদুর রহমান। নিহত সাজ্জাদুর রহমান সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালি ইউনিয়নের শেখুল মাহমুদপুর গ্রামের নুরুল আমিন তালুকদার ও রহিমুন্নেছার ছেলে।
কৃষক বাবা নুরুল আমিন তালুকদার ও মা রহিমুন্নেছার ৮ পুত্র কন্যার (চার ভাই-চার বোন) মধ্যে দ্বিতীয় সাজ্জাদুর রহমান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করে আর পড়াশুনা করে নি। বাবার গৃহস্তি কাজে সহযোগিতা করতো। বিদেশ যাবার চেষ্টা ছিল তার ছোট বেলা থেকেই। কর্মঠ ছেলেটিকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি-জমা বন্ধক দিয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলার লালুখালি গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী রাসেল আহমদের মাধ্যমে প্রায় দুই মাস আগে লিবিয়া পাঠান বাবা নুরুল আমিন। এজন্য দালাল রাসেল আহমদকে প্রায় চার লাখ টাকা দিতে হয়েছে। টাকা নিয়েছে রাসেলের বাবা ফয়জুর রহমান। ওখানে পাঠানোর পর ইতালি পাঠাতে আরও টাকা দাবি করে তারা। পরে শান্তিগঞ্জ উপজেলার ধনপুরের রফিকুল ইসলামকে (লিবিয়া প্রবাসী) আরও চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই টাকা রফিকুলের গ্রামে থাকা ভাতিজা শাহাব উদ্দিন নিয়েছে।
নিহত সাজ্জাদুরের চাচাতো ভাই ভীমখালি ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান জানালেন, তার চাচা নুরুল আমিন তালুকদার মানসিক কষ্টে পড়েছেন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাজ্জাদুরের মরদেহ ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বললেন, অফিসিয়েলি আবেদন করছি, দূতাবাসের সহযোগিতা কামনা করছি আমরা।
রোববার (৩০ জানুয়ারি) ইতালির বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জানানো হয়, ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ৭ বাংলাদেশির মধ্যে ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুরে। বাকি দুজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে। তারা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম পিয়ারপুর গ্রামের ইমরান হোসেন, পিয়ারপুর গ্রামের রতন জয় তালুকদার, ঘটকচর গ্রামের সাফায়েত, মোস্তফাপুর গ্রামের জহিরুল এবং মাদারীপুর সদর উপজেলার বাপ্পী। অন্য দুজন হলেন- কিশোরগঞ্জে ভৈরব উপজেলার সাইফুল ও সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার মামুদপুর গ্রামের সাজ্জাদ।
দূতাবাস জানায়, মৃতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি ছয় জনের পরিচিতরা উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন। তাই ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তাদের স্বজনদের কাছে পরিচয় পৌঁছে যাওয়ার কথা। মরদেহগুলো সরকারি খরচে দেশে ফেরত পাঠাতে হলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে। পরিচয় নিশ্চিত করতে তাদের পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়/উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় বা ইতালির রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের কল্যাণ শাখার ইমেইলে (বিষভধৎব.ৎড়সব@মসধরষ.পড়স) যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ৭ বাংলাদেশির মরদেহ সিসিলি প্রদেশের এগ্রিজেন্তো এলাকার একটি মর্গে রাখা আছে। লাশগুলো দেশে ফেরানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দূতাবাস। দীর্ঘ সময় তীব্র ঠা-ায় থাকার ফলে ‘হাইপোথার্মিয়া’য় মারা গেছেন ওই বাংলাদেশি।

  • [১]