- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

চেতনার অগ্নিমশাল আপনি খসরু আংকেল

ডা. নূরুল ইসলাম
“বাবাজি আমি তোমার লেখাটা পড়েছি। এটা সুনামগঞ্জের বাস্তব চিত্র। রাষ্টপতি হাওড় পাড়ের সন্তান। আর কিছু না হোক আশা করি কৃষকের কষ্টটা তিনি বুঝবেন। তোমাকে ধন্যবাদ।” … প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল চৌধুরী খসরু।
২০১৭ সাল। অকাল বন্যায় ফসল রক্ষার বাঁধ ভেঙ্গে পুরো সুনামগঞ্জ জেলার কৃষক ভাই-বোনদের কপালে দুর্ভাগ্যের বলিরেখা। চারিদিকে হা-হুতাস! পঁচা ধানের গন্ধের সাথে যোগ হয়েছে পানি দূষণের কারণে মৃত মাছ, জলজ প্রাণি, হাঁস ও গবাদি পশুর মরাদেহের গন্ধ। পুরো হাওরাঞ্চল যেনো বসবাসের পৃথিবীর সবচেয়ে অযোগ্য এক জায়গা। এরই মধ্যে ঘোষণা আসলো, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদের সুনামগঞ্জের কৃষকদের দুর্দশা পরিদর্শন করতে সুনামগঞ্জে আসবেন। ২৮ বছর পর সুনামগঞ্জে কোন রাষ্ট্রপতির সফর!
পুরো সুনামগঞ্জ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর ‘যে চিঠির পাঠক লেখক নিজেই’ নামে একটি লেখা লিখলাম। লেখাটি সারা ফেলে দিলো বিভিন্ন মহলে। একদিন কমেন্টস করলেন প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল চৌধুরী খসরু আংকেল। বাঁধ রক্ষায় দুর্নীতিবাজদের বিচার, দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের অধিকার, স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি তখন রাজপথ, হাওর-বাওর, সভা-সেমিনার, মিডিয়া সব জায়গাতেই দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
খসরু আংকেলের পরিশ্রম কতোটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছিলো, সেটা বিশ্লেষণ করবো না। তবে এটুকু জানি, কৃষকদের ফসল রক্ষা বাঁধের নামে দুর্নীতিবাজরা বছরের পর বছর সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে বাঁধ দেয়ার নামে যে নাটক আর প্রহসনে মেতে উঠেছিলো, তাদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার এই অসাধারণ ব্যক্তিটির আন্দোলন আর কলমশক্তির কারণে।
১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল চৌধুরী খসরু ছিলেন একাধারে সুদক্ষ আইনজীবী, লেখক, মুক্তিয্দ্ধু বিষয়ক গবেষক এবং সর্বোপরি ছিলেন এদেশের সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষদের এক প্রিয় অভিভাবক। যে মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার ও এদেশে তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তা বাস্তবায়িত হতে না দেখে প্রতিনিয়তই আফসোস করতেন।
যুদ্ধ জয়ের পরেও দেশকে শোষণমুক্ত এবং সর্বসাধারণের মধ্যে স্বাধীনতার সত্যিকারের প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করার জন্য দেশপ্রেমিক নাগরিকরা আরেকটা যুদ্ধে নিজেদের আজীবন নিয়োজিত রাখেন। সুনামগঞ্জের প্রিয় মুখ প্রয়াত অ্যাডভোকেট বজলুজ চৌধুরী খসরু আংকেল ছিলেন সেরকমই একজন আপাদমস্তক দেশপ্রেমিক সুনাগরিক।
যুদ্ধবিদ্ধস্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিনির্মাণে তিনি আজীবন ছিলেন এদেশের একজন অতন্দ্র প্রহরী। আবার একটি নতুন রাষ্ট্রকে ঘিরে ক্ষমতালোভী, অর্থলোভী, দুর্নীতিবাজদের জন্য তিনি সবসময় ছিলেন তাদের পথের কাঁটা, একটি আতঙ্কের স্ফূরণ! এই হীন চরিত্রগুলোর বিপক্ষে তিনি তাঁর কলম চালিয়েছেন সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষে; রাজপথে মিছিলে যোগ দিয়েছেন সাধারণ মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে, মুক্তিয্দ্ধু নিয়ে গবেষণা করেছেন প্রজন্মকে সত্যিকারের মুক্তিয্ুেদ্ধর ইতিহাস জানানোর জন্যে; গ্রামের পর গ্রাম হেঁটেছেন এদেশের সাধারণ মানুষদের ন্যায্য দাবী আদায় করার জন্যে; শতো প্রচেষ্টায় বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সবার শিক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্যে। সেজন্য তিনি সবসময় এদেশের একটি দুষ্টচক্রের বিরাগভাজন ছিলেন, তবে চোখের মণি হয়ে উঠেছিলেন সুবিধাবঞ্চিত পুরো সুনামগঞ্জবাসীর। দুর্নীতিবাজদের চক্ষুশূল হলেও তিনি কখনো ক্ষান্ত হোননি, কুটকৌশলকে ভয় পাননি, দম্ভ ও হুঙ্কারে কখনো নিজের ব্যক্তিত্ব বিলিয়ে দেননি। সরবে, নীরবে তিনি দেশ মাতৃকার হয়ে কাজ করে গেছেন আজীবন।
চলনে-বলনে, পোষাক-পরিচ্ছেদে, জ্ঞান-গরিমা এবং আঁচাড়-ব্যবহারে সৌম্য চেহারার খসরু আংকেল সব মহলের কাছেই অতি প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ববোধ ছিলো খুবই প্রখর, ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবেন, কিন্তু কারো অন্যায্য, অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে কিংবা করার সুযোগ দিয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব বিলোবেন না।
সুনামগঞ্জ জেলার এই গুণি ব্যক্তিত্ব, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২১ সালে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গিয়েছেন একেবারে না ফেরার একদেশে! তাঁর অকাল প্রয়াণে পুরো সুনামগঞ্জ জেলা মুহূর্তের মধ্যে যেনো অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো। এমন একজন সৎ, নির্ভীক ও সাধারণ মানুষের অভিভাবক সুনামগঞ্জবাসী আবার কখন পাবে, সেটা বলা খুবই কষ্টসাধ্য। তবে আশার কথা তিনি রেখে গেছেন সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষদের জন্য শতো শতো সৃজনশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়; কিভাবে ক্ষমতালোভী, অর্থলোভী, দুর্নীতিবাজ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের দুর্বল হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দিতে হয়।
মানুষ মরণশীল। কিন্তু সেই মরণের পর পৃথিবীর শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনি কি করে গেছেন, সেটাই মূল্যায়িত হয় যুগের পর যুগ। আত্মকেন্দ্রিক এবং ক্ষণিকের তরে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যারা হীন থেকেও হীনতর হয়ে উঠে, সময়ের কাল পরিক্রমায় তারা হারিয়ে যায় সভ্যতার অতল গহ্বরে। সেক্ষত্রে আপনি যতো বড় ক্ষমতাবান, অর্থবান কিংবা দুর্নীতিবাজই হোন না কেনো।
বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল চৌধুরী খসরু আংকেল দেশের জন্য, নিজ জেলার জন্য এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষদের অধিকার রক্ষা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন যে সংগ্রাম করে গেছেন, কলম চালিয়ে গেছেন, দেশের তরে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে গেছেন, তা যুগ যুগ ধরে মূল্যায়িত হবে সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে। সুনামগঞ্জ জেলার সাধারণ মানুষদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন অধিকার আদায়ের দৃঢ় মূর্ত প্রতীক হয়ে।

  • [১]