বিশেষ প্রতিনিধি
সবচেয়ে বড় উপজেলা ছাতকের ১৩ ইউনিয়নে প্রার্থী মনোনয়নে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে আ.লীগের বিবদমান দুই পক্ষই। স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি মুহিবুর রহমান মানিক বলেছেন,‘দলীয় জনপ্রিয় প্রার্থী থাকা অবস্থায় ১ টি ইউনিয়নে বিএনপি থেকে এনে প্রার্থী, অন্য দুটি ইউনিয়নে বশিভূত হয়ে অজনপ্রিয় প্রার্থীর নাম প্রস্তাব আকারে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল’। অপরাংশের উপজেলা আহ্বায়ক (আবুল কালাম সমর্থক) আবরু মিয়া তালুকদার অবশ্য বলেছেন,‘আমরা কিছু কিছু ইউনিয়নে প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য আবেদন জানাবো’। প্রার্থী নিয়ে দ্বিধাদন্দ্ব রয়েছে ২০ দলীয় জোটেও। জোটের অন্যতম শরীক জামায়াতের নেতারা বলেছেন,‘আমাদের সঙ্গে কথা না বলেই প্রার্থী ঘোষণা হয়েছে, সমন্বয় না হলে আমাদের প্রার্থীরাও নির্বাচন করবে’।
ছাতক উপজেলা আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিধা বিভক্ত। দলের একাংশের নেতা স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক। অপরাংশের নেতা ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী। মুহিবুর রহমান মানিক সমর্থক অংশের উপজেলা আহ্বায়ক লুৎফুর রহমান সুরকুম, আবুল কালাম সমর্থক অংশের আহ্বায়ক আবরু মিয়া তালুকদার।
স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এই দুই বলয়ের পরস্পর বিরোধী অবস্থান থাকে গত প্রায় ২০ বছর ধরে। বিগত ইউপি, উপজেলা এবং পৌরসভা নির্বাচনেও এখানে দুই বলয় থেকেই আলাদা প্রার্থী ছিল। বিগত ইউপি নির্বাচনে এই উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের ৯ টিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন এবং ৯ জনেই মুহিবুর রহমান মানিকের সমর্থক। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দুই বলয়ের দুই প্রার্থী ছিলেন। অবশ্য জয় পেয়েছেন মুহিবুর রহমান মানিকের সমর্থক অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল। পৌর নির্বাচনে মুহিবুর রহমান মানিক সমর্থকরা কোন প্রার্থী ঘোষণা দেননি বা সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক প্রকাশে-অপ্রকাশ্যে কারো পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন বলেও জানা যায়নি। তবে ছাতক পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল ওয়াহিদ মজনু তাঁর (মুহিবুর রহমান) সমর্থক হিসাবেই পরিচিত।
এবার ইউপি নির্বাচন হচ্ছে দলীয় প্রতীকে। অর্থাৎ দলের প্রার্থীর পক্ষেই থাকতে হবে দলের নেতা কর্মীদের। প্রকাশে বা অপ্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করলে দল ব্যবস্থা নেবে এমন হুশিয়ারি ইতিপূর্বে দলীয় হাইকমান্ড থেকে দেওয়া হয়েছে।
ছাতক উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে আগামী ৩১ মার্চ ইউপি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
জেলা নির্বাচন অফিসার মো. সাদেকুল ইসলাম জানান, ছাতকের ১৩ ইউনিয়নে প্রার্থীরা ২ মার্চ মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন। বাছাই হবে ৫ ও ৬ মার্চ, ১৩ মার্চ প্রত্যাহার এবং ১৪ মার্চ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
রবিবার আওয়ামী লীগ ও ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত হয়েছে উল্লেখ করে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
১৩ ইউনিয়নের মধ্যে ১০ ইউনিয়নে মনোনীত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মুহিবুর রহমান মানিকের সমর্থক হিসাবে পরিচিত। এদের বেশিরভাগই বর্তমান চেয়ারম্যান। ৩ ইউনিয়নে মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম চৌধুরী’র সমর্থক।
দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রসঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা মুহিবুর রহমান মানিক বলেন,‘বিগত উপজেলা নির্বাচনে জেলার অনেক উপজেলায় দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হলেও আমার নির্বাচনী এলাকায় আমরা দলের প্রার্থীকে জিতিয়েছি। এর আগে ইউপি নির্বাচনেও দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এবারও ছাতকের ১০ টি ইউনিয়নে দলের যোগ্য প্রার্থী করায় এরা জয়ী হবেন বলে আশা করছি। কিন্তু ৩ টি ইউনিয়নে প্রার্থী মনোনয়ন হয়েছে বশিভূত হয়ে। আগের জেলা কমিটি এসব প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন।
এদের একজন ছাতক সদর ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম। সাইফুল ইসলাম বিএনপি করতেন, গত ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। এই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জন দাসকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সমর্থন জানিয়েছিল। তাকে (রঞ্জনকে) না দিয়ে নির্বাচনের জন্য বিএনপি থেকে আসা সাইফুল ইসলামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কালারুখা ইউনিয়নে মুক্তিযোদ্ধা কবীর উদ্দিন এবং ইউনিয়ন সভাপতি আপ্তাব উদ্দিনকে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি থেকে যোগদানকারী আব্দুল ওদুদকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সিংচাপইড়ে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মুর্শেদ চৌধুরী এবং গত নির্বাচনে সমান ভোট পেয়ে ড্র হওয়া প্রার্থী, শেষে আবার উপনির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত মোজাহিদ আলীকে না দিয়ে সাহাব উদ্দিন সাহেলকে দেওয়া হয়েছে। তাকে (সাহেলকে) নিয়ে এলাকায় অনেক বিরূপ সমালোচনা রয়েছে। আমি মনে করি এখনও প্রতীক বরাদ্দ হয়নি। বদলের সুযোগ রয়েছে। যাচাই-বাছাই করে এই ৩ ইউনিয়নে জনপ্রিয়দের যেন প্রার্থী করা হয়’।
আওয়ামী লীগের অপরাংশের আহ্বায়ক আবরু মিয়া তালুকদার বলেন,‘সাইফুল ইসলাম ও আব্দুল ওদুদ সব সময়ই আওয়ামী লীগ করে। অন্য কিছু ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়রা প্রার্থী হতে পারেননি, এই বিষয়ে আমরা পূন: বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমরা মনে করি তিনটি স্থরে (ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা) যাচাই-বাছাই করে আমরা তালিকা দিয়েছি, আমাদের তালিকা অনুযায়ি প্রার্থী করা হলে দলের প্রার্থীর বিজয় অবশ্যই নিশ্চিত হবে’।
অন্যদিকে, ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দানকারী দল বিএনপি’র ছাতকের প্রভাবশালী দুই রাজনীতিক জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের ১৩ ইউনিয়নের প্রার্থী ঘোষনা করেছেন বললেও জোটের শরীক জামায়াতের রয়েছে ভিন্ন সূর।
জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মমতাজুল হাসান আবেদ বলেন,‘ছাতক উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে জামায়াতকে ছাড়াই ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের দলের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ছুফি আলমকেও প্রার্থী করা হয়নি। আমাদের সঙ্গে প্রার্থীতা নিয়ে সমন্বয় না করলে আমাদের প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে’।