স্কুল ছাত্রদের রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করেছেন এক সময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা তথা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শনিবার কেন্দ্রীয় ছাত্র লীগ আয়োজিত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় কাদের আরও বলেছেন, ‘এমনিতেই ছেলে-মেয়েদের পিঠে বইপুস্তকের বোঝা, তার উপর রাজনীতির বোঝা চাপানোর দরকার নেই’। ছাত্র লীগের সাবেক সভাপতির এই বক্তব্যকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করি। কারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের যে বয়স থাকে তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু বয়স বলা হয়ে থাকে। এই বয়সে সবকিছু বোঝার সক্ষমতা তৈরি হয় না তাদের। এরকম বয়সে যদি পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তে তারা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদের মেধা বিকাশের জায়গাটি রুদ্ধ হবে। এখন রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতির যে ধারা সেসব জায়গায় যে সংস্কৃতি বিরাজমান সেখানে মেধা ও মননশিলতার বিকাশ ঘটানোর রাস্তা এমনিতেই সংকুচিত হয়ে গেছে। রাজনীতির ওইসব জায়গায় এখন স্তাবকতা, অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন, রাজনীতিবহির্ভূত বিষয়াদির ব্যাপক চর্চা ইত্যাদি বহুল পরিমাণে বিদ্যমান। একজন মেধাবী ছাত্র ওই সংস্কৃতিতে ঢুকলে নির্ঘাৎ সে পথহারা হবে। সুতরাং মন্ত্রী মহোদয় বাস্তবতার নিরিখে যে কথা বলেছেন ছাত্র লীগ বা অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলোর তা মেনে চলা উচিৎ।
মূল ধারার রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব এখন আর ছাত্রদের হাতে নেই। ছাত্র সংগঠনের নেতাদের ছাত্রত্ব মেয়াদের অবসান ঘটে না কখনও। বিয়ে থা করে ফেলে ছেলেপুলের বাপ হয়ে গেলেও বহাল থাকে তাদের ছাত্রত্ব। শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনগুলো এখন ছাত্র ও শিক্ষা সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের বড় দায় হলো মূল সংগঠনকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে অথবা প্রতিপক্ষ দলকে ঘায়েল করতে মূল দলের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা। এর ফলে আমাদের দেশের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের মেজাজ নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকার কারণে নেতৃত্ব ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নেতৃত্ব অর্জনের বিষয়টি রুদ্ধ হয়ে গেছে। ফলে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে আসতে পারছে না কেউ। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে আশি বা নব্বই দশক পর্যন্ত ছাত্র নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে যেমন দাপুটে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়েছিলেন পরবর্তী দশকগুলোতে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্তিমিত হয়ে গেছে। এতে করে ছাত্র রাজনীতি ও মূল রাজনীতির গণমুখী চরিত্র ক্রমশ বিবর্ণ হচ্ছে।
আমরা ছাত্র রাজনীতির অতীত ঐতিহ্যের পুনরাবির্ভাব সর্বদাই কামনা করি। একটি দেশের মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীকার-স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত যে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে সেটি কখনও ম্লান হোক তা কেউই চায় না। সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি যেমন উপলব্ধি করেছেন ছাত্র রাজনীতির দুর্বলতার দিকটি, আমরা চাইব প্রতিটি ছাত্র সংগঠন ও জাতীয় সংগঠনও তা উপলব্ধি করুক অন্তর থেকে। ছাত্র রাজনীতি নিজের জায়গায় ফিরে এলে স্কুলে রাজনীতি না করার কোন উপদেশ আর দিতে হবে না। কারণ তখন ছাত্র রাজনীতিই হবে শিক্ষার আরেক প্লাটফর্ম। যেখানে পাঠ্যসূচি বহির্ভূত বিষয়াদি, যার সাথে মানুষের সুখ দুঃখ জড়িত, সেটি জানতে বুঝতে শিখতে ছাত্ররা সক্ষম হবে।