পুলক রাজ
স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা ভাবার সুযোগ নেই দৈনিক আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর। সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় নামতে বাধ্য তারা। এদিকে প্রতিদিন বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জনসাধারণকে বাসা-বাড়িতে থাকতে বলা হচ্ছে। এতেই বিপাকে পড়েছে হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ। যাদের ঘরই নেই, তারা কিভাবে ঘরে থাকবে। কিন্তু প্রতিদিন অগণিত মানুষ রাস্তায় নামলেই শুধুমাত্র যাদের দিন শেষে খাবার জোটে, সেই মানুষগুলো এখন পড়েছে চরম বিপাকে। দিন এনে দিন খাওয়া এই মানুষগুলোর এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই, ফলে উপার্জনও একদম শূন্যের কোঠায়। অনেকেই দিন কাটাচ্ছেন না খেয়ে অথবা এক বেলা খেয়ে। আবার অনেকে বসে আছেন সাহায্যের অপেক্ষায়।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ছিন্নমূল মানুষজন রিকশা, ভ্যান, ঠেলা গাড়ী চালিয়ে, রেষ্টুরেন্টে কাজ কনে, ভিক্ষা করে, অনেকেই কাগজ, পলিথিন, বোতল কুড়িয়ে বা ঘুরে পান, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করে, বেসরকারি অফিস ও দোকানে ফুটফরমাশ করে সংসার চালায়। কেউ আবার কাজ না পেয়ে জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধ কর্মে। সুবিধাবঞ্চিত ছিন্নমূল মানুষগুলো বেঁচে থাকার তাগিদে আশ্রয় খোঁজে ফুটপাতে, দোকান বা অফিসের বারান্দায়।
ছিন্নমূল আমেনা বলেন, আমার স্বামীর অন্ধ। হাটবাজারে গান গাইয়া সংসার চলে। আমি ভিক্ষা করি। রাইত হইলে পুরান কোর্টের বারান্দায় ঘুমাই, তুফান দিলে ঘুম নাই কুয়াই গিয়া লুকাইতাম কোন কুল ফাই না। মেঘ-বৃষ্টি দিলে ভিজ্জা রাইত ফুয়ায়, দিনের রইদে হুকায়। বড় কষ্টে আছি। প্রায় সময় না খাইয়া থাকতে হয়। সরকার থাকি যদি থাকার জায়গা কইরা দিতো আমরারে।
ছিন্নমূল ভিক্ষুক পারভিন বলেন, মারাত্মক কষ্টে আছি, আমরারে কেউ দেখে না। দিন হইলে পেট ভরাব ধান্দা আর রাইত হইলে কুয়াই ঘুমাইমু ইতা নিয় রাইত ফার করা লাগে। মাঝে মধ্যে পুলিশেও দৌড়ায়। শরীরে থাইকা যে কাপড় ভিজে হেই কাপর আবার হুকায়। সবাইরে একটা যদি ঘর দেওয়া হয় অন্তত রাইতে ঘুমাইতে পারমু।
স্বপ্নডানা পাঠশালার ছাত্র ছিন্নমূল শুকুর আলী বলে, দিন আনি দিন খাই। কাজ পাইলে কাজে যাই নাইলে বোতল তুকাই। রাস্তাঘাটে থাকি। আমরারে মানুষ মারে, গালি দেয়। আমরারে কেউ মায়া করে না। আর পেঠের ক্ষুধা থাকলে পৃথিবীর কেউওই ভালা থাকে না। আমরার মতো মানুষরে থাকার জায়গা দিলে একটু শান্তিতে বাঁচা যাইতো।
কবি মানবেন্দ্র কর বলেন, অসুখ-বিসুখ, রোগ-শোক সব সময়ই গরীর খেটে খাওয়া লোকদেরই বেশি আক্রমণ করে। তবে করোনা এবার বড়লোকদের ছাড়েনি। এর উদাহরণ অহরহ। করোনা দেখিয়েছে প্রাণঘাতী জীবাণু দিয়েই লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলা যায়। এমতাবস্থায় ছিন্নমূল মানুষকে বাইরে অরক্ষিত রেখে ঘরে সুস্থ থাকার অবকাশ নেই। তাই সরকার-বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে এদের পুনর্বাসন করা জর”রী। এদের সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকি বেশী। যেহেতু শহর-জুড়ে এদের চলাচল। তাই এদের মাধ্যমে সমাজে সংক্রমণ বাড়বে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া জর”রী।
স্বপ্নডানা সুনামগঞ্জ’র সিইও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সুনামগঞ্জে ভাসমান মানুষজন থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান দরকার। সরকার থেকে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় ঘর করে দিলে ভালো হতো যেখানে শুধুই ভাসমান মানুষজন থাকবে। সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও পথশিশুদের জন্য জেলা শহরে চাইল্ড সেইভ হোম নির্মাণ স্বপ্নডানার দীর্ঘদিনের দাবি। করোনাকালীন সময়ে ভাসমান মানুষজন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তাই তাঁদের স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা খুবই জরুরী।
উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী সাধারণ সম্পাদক ও সঙ্গীত শিল্পী সন্তোষ কুমার চন্দ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে লকডাউন উঠে যাওয়ার পর সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে। এমতাবস্থায় ছিন্নমূল মানুষেরা আরো কঠিন অবস্থায় আছে। এদেও ব্যাপারে ভাবা উচিত। যদি এদের সংক্রমণ হয়, তাহলে তো আরো ভয়াবহ হবে। কারণ এই ভবঘুরে ছিন্নমূল মানুষেরা তো কোথা থেকে কোথায় যায় তাঁর ঠিক ঠিকানা নাই। এই সংক্রমণ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিবে। এদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে অবশ্যই পুনর্বাসন করতে হবে। নইলে করোনা সংক্রমণ এদের মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে।