- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ছেলের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা বদরুল ইসলাম

আসাদ মনি
৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুল ইসলাম। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেম নতুনভাবে উপলব্ধি হয় তার। দেশ হলো মায়ের মতো, আর মায়ের মুখের ভাষার মান রক্ষা করতে জীবন দিয়েছে আমার ভাই। ভাষা আন্দোলনে বারো আর স্বাধীনতা আন্দোলতে একুশ বছর বয়স ছিল তার। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের সুযোগ না হলেও স্বাধীনতা সংগ্রাম তাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তাহিরপুর মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম কমিটির সদস্য হন বদরুল ইসলাম। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সি বদরুল ইসলাম ছেলের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে মানুষের বাড়িতে রাত্রি যাপন করতে হচ্ছে থাকে।
বিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে জন্ম বদরুল ইসলামের। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের সময় তার বয়স সাত। সে সময়কার বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে নেই তার। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেবার চক্রান্তের সময় জাতীয়তাবাদের বোধ প্রথম জন্ম হয় তার। দেশ হলো জননীর মতন, সে জননীর অপমান মানতে পারেন নি ১২ বছর বয়সি বদরুল ইসলাম। প্রচন্ড অভিমান নিয়ে সহপাঠিদের সাথে সময় কাটতো তখন। তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়া বিহীন সেকালে ৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর ৪ দিন পর শুনতে পান। সাথে সাথে প্রতিবাদ ক্ষোভে উদ্বেলিত হন তিনি। সুঠাম দেহের অধিকারি বদরুল ইসলাম তখন তাহিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র (বর্তমানে তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়)। পড়াশুনার পাশাপাশি গান, নাটক ও আবৃত্তির প্রতি ছিলো ঝোঁক।
বদরুল ইসলাম এর কাছ থেকে জানা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগে তাকে একাধিক স্কুলে পড়াশুনা করতে হয়েছে। সেসময়
তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জামালগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন তিনি।
৭১ তিনি মেট্রিক পরীক্ষার্থী। একই বছরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে পরীক্ষা দেয়া হয়নি তার। যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। তাহিরপুর মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। গান, নাটক ও আবৃত্তিতে পারদর্শী বদরুল ইসলামকে ক্যাম্পে রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়। রান্না করার পাশাপাশি ক্যাম্পের যাবতীয় কাজ বদরুল কে করতে হতো। যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে সুস্থ করতেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক মিলিটারীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ না নিলেও পেছন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। গান-নাটকে দেশ প্রেমে উজ্জীবিত করেছেন সহযোদ্ধাদের।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে নতুন করে যোগ দেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। যোগ দেন যাত্রা দলে। বলাকা সহ অসংখ্য যাত্রা দলে কাজ করেছেন। সে সুবাদে ঘুড়ে বেড়িয়েছেন সারা দেশে। এক সময় মানুষের যাত্রা দলের প্রতি চাহিদা থাকলেও ধীরে ধীরে সেগুলোর প্রতি কদর কমে যায়। দীর্ঘ ২৩ বছর সংস্কৃতি জগতে থাকার পর বিদায় নেন সেখান থেকে। এছাড়াও তিনি তাহিরপুর ক্রীড়া সংস্থার প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ দিন। তার হাতে গড়া অনেক খেলোয়ার ফুটবলকে ভালোবেসে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। অনেকে চাকরী করছেন সরকারি দপ্তরে।
বর্তমানে তাহিরপুরে ওস্তাদজি নামে পরিচিতি তার। তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সি মানুষ ওস্তাদজি বলে সম্বোধন করেন বদরুল ইসলামকে।
মুক্তিযুদ্ধা ভাতা প্রাপ্ত বদরুল ইসলামের বয়স এখন ৮০ বছর। বয়সের ভারে সুঠাম দেহের অধিকারি বদরুল ইসলামের পিঠ নুয়ে পড়েছে। সকাল বেলা হাত দুটি পেছনে নিয়ে ধীরে ধীরে বাজারের হোটেলে এসে খেতে হয় তার। এর পর যান যৌবনে পায়ের দাপটে বলকে কাবু করা খেলার মাঠ ‘তাহিরপুর উপজেলা স্টেডিয়ামে’। সেখান থেকে আবারো বাজারে গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে, রাতের জন্য টিফিন বন্দি করা খাবার নিয়ে রওয়ানা দেন বাড়ির দিকে। এটাই তার প্রতিদিনের রুটিন।
প্রচন্ড শ্বাস কষ্টে ভোগা বদরুল ইসলামের স্ত্রী অনেক আগেই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। ২ ছেলে ও ২ মেয়ের বাবা তিনি। অনেক আগেই ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। তার ছোট ছেলে সরকারি চাকুরীজীবী। চাকরীর জন্য সবসময়ই বাড়ির বাইরে থাকতে হয়। আর বড় ছেলে বউ-বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে থাকেন।
এই বড় ছেলের অত্যাচারে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধা বদরুল ইসলামকে। অত্মীয় স্বজনদের বাসায় বাসায় থাকতে হচ্ছে তাকে। বৃদ্ধ বয়সে যেখানে সন্তানের উপর নির্ভর করে পরম নিশ্চিন্তে থাকবেন, সেখানে বাড়িতেই টিকতে পারেন নি তিনি। উপরন্তু ছেলের হাতে মার খেয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। বর্তমানে অসুস্থ হয়ে অন্যের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন তিনি।

  • [১]