অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হাছান শাহীন
সম্প্রতি আমাদের পৌর শহরের আলোকিত প্রতিষ্ঠান ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি, সুনামগঞ্জ’ তার গর্বের পথ চলার ছয় দশক পেরিয়েছে। ছোট্ট পরিসরে গঠিত পাবলিক লাইব্রেরি ধীরে ধীরে শহরের বুকে মহীরুহ হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন পূর্ণ যৌবনের রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বইপ্রেমিক পাঠক এখানে এসে জড়ো হন। বই, পত্রিকা থেকে শুরু করে মুক্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর যারা শহরে একটু ঘুরতে বের হন, কারণ ছাড়াও একবার লাইব্রেরিতে ঘুরে যান তারা।
আমার লেখার বিষয় একটু ভিন্ন। দীর্ঘ এই ছয় দশকে লাইব্রেরিতে অনেক গুণিজনের পদচিহ্ন পড়েছে। দুটি পরিদর্শন বই এখানে সংরক্ষিত। গুণিজনরা মন্তব্য বইয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করেছেন। কালক্রমে তা ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। এসব মন্তব্যে এই প্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বলতা আরো ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
পরিদর্শন বইয়ের প্রথম মন্তব্য সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আলী হাসান এর, ২৫/০৭/১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে লাইব্রেরি পরিদর্শনে এসে পরিদর্শন বইয়ে তাঁর মন্তব্য দিয়ে যাত্রা শুরু।
বিচারপতি জনাব আব্দুছ ছাত্তার ২৩/১২/৭৬ খ্রিস্টাব্দে লাইব্রেরি পরিদর্শনে এসে লিখেছেন ‘সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করলাম এবং ইহা রক্ষণাবেক্ষণ মোটামুটি ভাল দেখে অত্যান্ত খুশি হলাম। ১,০০০/- (এক হাজার) টাকা অনুদান দিলাম।’
বিশিষ্ট লেখক জনাব বদরউদ্দিন উমর তাঁর মন্তব্যে লিখেন ‘দেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন উল্লেখযোগ্য সরকারি সাহায্য ব্যতিরেকে যারা এই পাঠাগার ঘরে তুলেছেন তারা যে কতখানি কৃতিত্বের অধিকারী অপরাপর বহু স্থানে সাধারণ পাঠাগারের অভাব অথবা অব্যবস্থার কথা চিন্তা করলেই বুঝা যায়।’
দেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান-এর পদচিহ্ন পড়েছিলো আমাদের এই পাঠাগারে। তিনি যখন পাঠাগার পরিদর্শন করেছিলেন তখন তিনি দেশের অন্যতম প্রধান দৈনিক ‘দৈনিক বাংলা’ ও ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক ছিলেন। ১৪/০৩/১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ তারিখে লিখিত মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন ‘অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে এই গণগ্রন্থাগারটি টিকে আছে। এখানকার কয়েকজন উদ্যমশীল সাংস্কৃতিক ব্যক্তির নিষ্ঠার জন্য এখনও এই গ্রন্থাগার চলছে। আর্থিক সংকট এর চলার পথে বড্ড অন্তরায়। এই গ্রন্থাগার যাতে না থামে সে জন্য এখানকার প্রতিটি শিক্ষিত ব্যক্তির আলাপ একান্ত জরুরি।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট-এর বাংলা ভাষা বিভাগের প্রফেসর ড. সফিউদ্দিন আহমেদ ২০/০৪/২০০১ খ্রিস্টাব্দে পরিদর্শন বইয়ে লিখেন ‘সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি দেখে আমি বিমুগ্ধ হয়েছি। এখানে এমন সব বই আছে যে বইগুলো গবেষণাকর্মে খুবই উপকারে আসবে এবং একজন গবেষক এখানে গবেষণার অনেক তথ্য ও উপকরণ পাবেন।
বইগুলোর বিন্নাশ ও শ্রেণীকরণ গ্রন্থ বিজ্ঞান ভিত্তিক।’
ড. মোহাম্মদ আলী খান ১১ এপ্রিল ২০১২ খ্রিস্টাব্দে লাইব্রেরি পরিদর্শনে এসে মন্তব্য বইয়ে চমৎকার একটি কবিতা লিখেন। যা পরবর্তিতে আমাদের লাইব্রেরির পথচলা আরো মসৃণ করেছে।
‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার
সুনামগঞ্জের হৃদয়ে যার নাম উঠে আসে বার বার,
সুরমার বহমান ¯্রােতধারার মত
তার পথচলা যেন আফালের মত
বিপুল তার ব্যপ্তি
অপরিসীম তার হাতছানি’
সুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর লিখনিতে লেখেন ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার (সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি) আমাদের শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্যকে আলো দান করেছে। সুনামগঞ্জের জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে এবং এ এলাকার মনীষী সৃষ্টির পেছনে এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে এক গৌরোবজ্জল অধ্যায়। আমরা যারা এর মাধ্যমে নিরন্তর উপকৃত হয়েছি, এ পাঠাগার কে ঘিরে আমাদের রয়েছে অন্যরকম এক অনির্বচনীয় আবেগ।’
সুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান অস্টেলিয়া প্রবাসী তরুণ বিজ্ঞানী ও গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী লেখেন ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার এই নিয়ে দুইবার আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে কৃতজ্ঞ এবং সম্মানিত।
আমি আশা করছি এই পাঠাগার সুনামগঞ্জের মানবিক মানুষ গঠনের সূতিকাগার হবে।
আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধে জগৎজ্যোতি দাসের ত্যাগ এবং সংগ্রাম অমর হয়ে আছে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই দেশের সকল স্তরে জগৎজ্যোতি দাসের মতো মহান ত্যাগী এবং দেশপ্রেমি মানুষের খুব দরকার।
আমাকে সম্মানিত করায় জগৎজ্যোতি পাঠাগারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
জয় বাংলা।’
গত এক দশক আমরা পাবলিক লাইব্রেরিতে বিভিন্নভাবে জড়িয়ে আছি। সন্ধ্যার পরে এখানে আসলে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। গর্ব হয় আলোকিত স্বজনদের আগলে রাখাতে এমন একটি আলোকিত প্রতিষ্ঠানের অংশ হতে পেরেছি বলে।
লাইব্রেরির বর্তমান অবস্থা
১৯৫৯ সালের ১৭ জুন সন্ধ্যার বৈঠকে শুরু হয় পাবলিক লাইব্রেরির পথচলা। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব বি.আর. নিজাম।
লাইব্রেরির প্রথম সভাপতি ছিলেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক জনাব বি.আর. নিজাম ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মনোরঞ্জন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট।
বর্তমানে লাইব্রেরিতে বই সংখ্যা প্রায় ২০,৫০০টি। লাইব্রেরির নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। ওয়েবসাইট-ংঁহধসমধহলঢ়ঁনষরপষরনৎধৎু.পড়স। কর্মচারীর সংখ্যা ০৪ জন। রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকাল ৩.৩০ ঘটিকা হতে রাত ৯.০০ ঘটিকা পর্যন্ত পাঠকক্ষ খোলা থাকে। লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলায় একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২০০ আসন বিশিষ্ট হলরুম আছে। হলরুমটি ছোট পরিসরের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া প্রদান করা হয়। লাইব্রেরির আয়োজনে জাতীয় সকল দিবস পালন করা হয়।
বর্তমানে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান জনাব অ্যাডভোকেট সালেহ্ আহমদ। এছাড়াও নির্বাচিত কমিটিতে ১২ জন নির্বাচিত প্রতিনিধিসহ কমিটির সদস্য সংখ্যা মোট ১৫ জন। পদাধিকার বলে কমিটিতে সভাপতি হিসাবে জেলা প্রশাসক ও সিনিয়র সহ সভাপতি হিসাবে পৌর মেয়র দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে আছেন।
আমাদের খুব ইচ্ছে, পরবর্তী প্রজন্ম লাইব্রেরিতে যেনো আনন্দ খুঁজে নেয়। যতই ডিজিটাল ডিভাইসে আমরা প্রবেশ করি না কেনো, বুকের ভেতর একপাশে লাইব্রেরিগুলোর স্থান যেনো না হারায়।
আমাদের উত্তর প্রজন্মের ভালোবাসায় এগিয়ে নেবে আমাদের আলোকিত এই প্রতিষ্ঠানকে।
লেখক : সহ সাধারণ সম্পাদক, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি, সুনামগঞ্জ।