ছয় দিনের মোটামোটি দীর্ঘ বিরতির পর আজ যখন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পাঠকের হাতে আসছে তখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ঘটে গেছে অনেক দুর্ঘটনা। গুলশানের বেকারি হর্টি আর্টিজানে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর ঈদের ছুটি শেষ হয়। এমনিতেই জঙ্গি হামলার কারণে মানুষ ঈদের আনন্দ একেবারে মনের ভিতর থেকে উপভোগ করতে পারেনি। দেশজুরে প্রতিটি ঈদগাহে নেয়া হয়েছিল নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কোন আনন্দ আয়োজন যখন নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে উদযাপন করতে হয় তখন ওই আনন্দ ম্লান হয়ে যেতে বাধ্য। এমন সময়ে ঈদের দিনের সকালেই যখন খবর আসল দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতস্থল কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় আবারও জঙ্গি হামলা হয়েছে তখন দেশের সকল মানুষ আবারও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়লেন। এর আগে ইরাক ও মদিনায় জঙ্গি হামলার মন খারাপ করা ঘটনাগুলো তো রয়েছেই। সুতরাং এবার যে শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর কোথাও ঈদের নির্মল আনন্দ উপভোগ করা যায়নি তা বলাই বাহুল্য।
হলি আর্টিজান কিংবা শুলাকিয়ায়, যেসব জঙ্গিদের পরিচয় পাওয়া গেছে তা আঁতকে উঠার মতো। এরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত দেশের বিত্তবান পরিবারগুলোর তরতাজা তরুণ সন্তান। এদের অনেকেই ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল। এদের জীবন যাপন, বেড়ে উঠা, পারিবারিক আবহ কিংবা লেখা-পড়া কোথাও জঙ্গি হওয়ার মতো কোন পরিবেশ ছিল না। তারপরেও এরা কোন এক অশুভ শক্তির সুচতুর প্রয়াসে মগজ ধোলাইর শিকার হয়ে জঙ্গিতে পরিণত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে সমাজের কোন স্তরেই এখন আর নিরাপত্তা নেই। জঙ্গিবাদের হিং¯্র থাবা সমাজের একেবারে নি¤œস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত প্রসারিত। এ অবস্থায় অভিভাবকরা সীমাহীন উদ্বেগ আর ভয়ের মধ্যে পতিত হয়েছেন। কার সন্তান কখন কীভাবে এই মরণনেশার ছুবলে আক্রান্ত হয় কেউ বলতে পারছেন না।
সমাজ যখন অস্থির থাকে তখন এর প্রতিক্রিয়া নানাভাবে প্রকাশিত হয়। বিশ্বব্যাপী আজ একধরনের অস্থিরতা চলছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক কিংবা সামাজিক পরিম-লে বিস্তৃত এই অস্থিরতা। অস্থিরতার মূলে উদগ্র ক্ষমতার বাসনা আর অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েমের বিষয়টি। ক্ষমতা আর সম্পদের লোভে সারা বিশ্ব টালমাটাল। প্রতিযোগিতায় লিপ্ত পক্ষগুলো নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে হেন কোন কাজ নেই যা করতে পিছ পা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদী তৎপরতা এই বৈশ্বিক আধিপত্যবাদী অস্থিরতা থেকে জন্ম নেয়া প্রতিক্রিয়ার একটি দূরতম বহিঃপ্রকাশ। উগ্র ধর্মীয় মতান্ধতার মধ্য দিয়ে এর প্রকাশ ঘটছে বটে, কিন্তু প্রকৃত ধর্মের সাথে নেই এর কোন দূরতম সম্পর্ক। দলে দলে মানুষ মরছে একটি অবাস্তব আদর্শ মরীচিকার কারণে, এতে তথাকথিত আদর্শ প্রতিষ্ঠা না হলেও কোন না কোন ভাবে আধিপত্যবাদীদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হচ্ছে। আজ বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্ব মোড়লদের দেশের ভিতরে নিয়ে আসার বাস্তবতা তৈরি করেছে। আমাদের স্বাধীন বঙ্গোপসাগর যদি যুদ্ধবাজ রণতরীর আস্ফালনে তরঙ্গসঙ্কুল রূপ ধারণ করে তাহলে আমাদের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হলেও কিছুই করার নেই। আমরা কি এই ভয়াবহ বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি? ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্থান, সিরিয়া, লেবানন, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, পাকিস্তানের দশা দেখেও যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ না করি তাহলে সেটি হবে আমাদেরই গ্লানি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের উপযুক্ত কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার জন্য কখনও ক্ষমা করবে না। আজ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হলো মানব সভ্যতার জন্য চরমভাবে হুমকি হয়ে উঠা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী প্রতিরোধ ঘোষণা করা।