বিন্দু তালুকদার
জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বিশেষ আইনশৃংখলা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বুধবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় পৌর শহরের বসবাসরত সকল ভাড়াটিয়া ও বাসাবাড়ির মালিকদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, সকল ওয়ার্ডে পর্যায়ে জঙ্গী বিরোধী সভা-সমাবেশ, জঙ্গী বিরোধী কমিটি গঠন করে এপ্রিলের প্রথমেই জঙ্গী বিরোধী মহা সমাবেশ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত ছাতক ও জগন্নাথপুরে প্রবাসীদের বাসা-বাড়িতে কারা থাকছে ও কারা কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করছে জরুরী ভিত্তিতে তার খোঁজ খবর নেয়া ও নজরদারী বৃদ্ধি করার দাবি করেছেন অনেকেই। জঙ্গী ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে সকল শ্রেণী পেশার লোকজনকে সচেতন করার বিষয়ে সভায় জোরালো আলোচনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘প্রবাসীদের বাসা-বাড়িতে কারা থাকছে কি করছে দ্রুত তার খোঁজ খবর নেয়া প্রয়োজন। শুধু শহরেই নয় শহরের আশপাশে কী হচ্ছে তার খোঁজ খবর নিতে হবে। জঙ্গীবাদ প্রতিরোধের বিষয়টি শহর থেকে গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। সবাই সচেতন হলে অবশ্যই এসব প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। ভয় পেয়ে পিছু হটলে চলবে না। সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে হবে।’
পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ বলেন,‘শহরের মোট ৭০০ ভাড়টিয়া রয়েছে। ভাড়াটিয়াদের ৩২টি তথ্য সংগ্রহ করার কাজ চলছে। তবে সুনামগঞ্জকে নিরাপদ ভাবলে হবে না। শান্তির জেলা সুনামগঞ্জেও যে কোন সময় যে কোন ঘটনা ঘটতে পারে। পুলিশকে করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়াসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পুলিশ বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।’ তিনি দৃঢ়কণ্ঠে আরো বলেন,‘ জঙ্গীবাদ কোন আইনশৃংখলা বিষয়ক সমস্যা নয়। এটা হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। এর প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। সবাইকে এই প্রতিরোধ আন্দোলনে সম্পৃক্ত ও সচেতন করতে হবে। ভয়কে দূরে রাখতে হবে। তাহলেই সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ প্রতিহত করতে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কোন বিকল্প নেই।’’
বিজিবির ২৮ রাইফেল ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন,‘ মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণদের জঙ্গীবাদে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বাংলাদেশে যা হচ্ছে তার সাথে আইএস বা আন্তর্জাতিক কোন জঙ্গী গোষ্ঠীর
সম্পর্ক নেই। আজ পর্যন্ত যতগুলোকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে সবগুলোই দেশীয় সংগঠন। তবে এদের প্রতিহত ও প্রতিরোধ করতে বিজিবির সকল স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।’
র্যাব-৯ সুনামগঞ্জ ক্যাম্পের অধিনায়ক লে. কমান্ডার ফয়সল আহমেদ বলেন,‘অপরিচিত ও বাহিরের মানুষকে বাসাবাড়ি ভাড়া দিতে ভবন মালিকদের আরো বেশী সচেতন হতে হবে। জঙ্গীপনায় জড়িতদের বিষয়ে নানা তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে তিনি বলেন,‘জঙ্গীরা সাধারণত সংখ্যায় ২, ৩ সর্বোচ্চ ৪ জন একত্র হয়ে বাসা বাড়ি ভাড়া নেয়। এরা খুব কম আসবাবপত্র ব্যবহার করে থাকে। এরা ল্যাপটপ ও মডেম ব্যবহার করে। এদের কক্ষে কাউকে প্রবেশ করতে দেয় না। প্রতিবেশী সবার সাথে খুব ভাল আচরণ করে। নিয়মিত বাসা ভাড়া দেয়। এরা আশপাশের কোথাও হাট বাজার করে না। সবকিছুই দূর থেকে সংগ্রহ করে। এদের বাসায় কোন আত্মীয়-স্বজন আসে না। ভাড়াটিয়া এমন আচরণ করছেন কিনা বাড়ির মালিকদেও তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ’
পৌর মেয়র আয়ুব বখত জগলুল বলেন,‘ শহরের সকল ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে জঙ্গী প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সচেতনতা সমাবেশ করা হবে। আগামী ২ এপ্রিল সকল ভাড়া প্রদানকারী বাসা-বাড়ি ও ভবন মালিকদের নিয়ে পৌরসভায় সভা করব। ভাড়া দেয়া ভবন ও বাসার কারা কি করছে তা নজরদারীর জন্য সবাইকেই সিসি ক্যামেরা স্থাপন কতে হবে।’ তিনি আরো বলেন,‘ কোন কোন মসজিদে কুতবার সাথে কৌশলে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হয়ে থাকে। এসব বন্ধ করতে হবে। প্রতি শুক্রবারের কুতবায় সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নিয়ে কথা বলতে হবে। প্রয়োজনে মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও ইমামদের নিয়ে সভা করতে হবে। সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে কুতবা পাঠ করতে কারো সমস্যা হলে প্রয়োজনে ইমাম পরিবর্তন করতে হবে। ’
এনএসআই সুনামগঞ্জ এর উপ পরিচালক ইসমাইল হোসেন পলাশ বলেন,‘দিরাই শাল্লা উপ নির্বাচনে কোথাও কোন ঝামেলা হওয়ার আভাস পাওয়া যায়নি। ভাড়টিয়াদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। কারা বাসা-বাড়িতে আসছে কি করছে তা নজরদারী করতে হবে। ছাতক ও জগন্নাথপুর উপজেলায় প্রবাসীদের বাসা-বাড়ির কেয়ারটেকার সম্পর্কে দ্রত খোঁজ খবর নেয়া প্রয়োজন ।’
সিনিয়র আইনজীবী আপ্তাব উদ্দিন,‘ বাসা-বাড়ি ভাড়া দিতে সবাইকে এখন আগের চেয়ে বেশী করে সচেতন হতে হবে। কারণ এখন মাঝে মাঝে বোরকা পড়ে কিছু মহিলাকে বাসা বাড়ি খোঁজতে দেখা যায়।’
অ্যাড. আলী আমজাদ,‘স্বাধীনতার মাসে সারা দেশ জুরে নাশকতা সৃষ্টির পেছনে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখতে হবে। এসব কিছুর পেছনে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সদস্যরা জড়িত থাকতে পারে। কারণ এরা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে অস্বীকার করলেও স্বাধীনতা দিবস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন করে। এদের এসব বিতর্কিত কর্মকান্ডের পেছনে অবশ্যই কোন রহস্য জড়িত আছে। ’
সদর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ,‘ সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বসবাসরত সকল ভাড়াটিয়ার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া শহরের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে পুলিশ।’
জেলা কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন,‘ সুনামগঞ্জ শিল্প-সংস্কৃতির জেলা ও শান্তির জেলা। তবে শান্তির জেলা ভেবে নিরবে বসে থাকলে হবে না। ’
বিটিভির জেলা প্রতিনিধি অ্যাড. আইনুল ইসলাম বাবলু বলেন,‘জঙ্গী, সন্ত্রাস ও নাশকতার কোন তথ্য পেলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে অবগত করতে একটি হটলাইন চালু করলে সাধারণ মানুষ তথ্য উপাত্ত দিতে পারবে।’
জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন,‘ শহরের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও জঙ্গী প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশকে আরো সক্রিয় করলে উপকার হতে পারে।’
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন,‘জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে আইনশৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসনের সাথে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে জঙ্গী বিরোধী কার্যক্রম চালু করতে হবে।’
দৈনিক প্রথমআলোর জেলা প্রতিনিধি খলিল রহমান বলেন,‘ বেসরকারি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বাসা-বাড়ি বা ভবন ভাড়া নিয়ে নাশকতা করা হচ্ছে। তাই ভবন ভাড়া দিতে মালিকদের আরো সচেতন হতে হবে। নানাভাবে খোঁজ খবর নেয়ার পর ভাড়া প্রদান করতে হবে।’
চ্যানেল ২৪ এর জেলা প্রতিনিধি এআর জুয়েল বলেন,‘ ভাড়াটিয়াদের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ঢিমেতালে চলছে। কারা এসব তথ্য সংগ্রহ করছে কিভাবে করছে সাধারণ মানুষ ও অনেক ভাড়াটিয়া ও ভবন মালিক এখন পর্যন্ত অবগত নয়। ’
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আইনুর আক্তার পান্না, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাড. সৈয়দ শায়েক আহমদ, পিপি নারী ও শিশু অ্যাড. নান্টু রায়, পিপি অ্যাড. খায়রুল কবির রুমেন, সাবেক পিপি অ্যাড. শফিকুল আলম, জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি দ্বীপক ঘোষ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন প্রমুখ।