- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জনম জনম রাখব ধরে ভাই হারানোর জ্বালা

অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ
সুনামগঞ্জ স্টেডিয়াম। পূর্ব নাম এ টিম ফিল্ড। এখন আশির দশক। দুটি ছোট গ্যালারি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভগ্নদশার মতো কোন মতে দাঁড়িয়ে আছে। মাঠের পশ্চিম প্রান্ত বাদে সব দিক ফাঁকা। হাসননগরের লোকজন বাজারে যেতে হলে এইচ.এম.পি স্কুল পার হয়েই ডান দিকে নেমে যেতেন। আড়াআড়িভাবে মাঠ পার হয়ে থানার পূর্ব পাশের রাস্তায় উঠে যাওয়া যেতো। লোকজনের নিয়মিত যাতায়াতে যাত্রাপথে ঘাসশূন্য সরু রাস্তা দৃশ্যমান হয়ে যায় মাঠের ভিতরে। তখন এই ভগ্ন স্টেডিয়ামেই ফুটবল ক্রিকেট এ্যাথলেটিক্সে জমজমাট লড়াই চলতো নিয়মিত। এর মধ্যে ১৯৮৭ সালের ছোট খাটো গড়নের এক বালক ফুটবলার মাঠে নামে। ক্ষিপ্রতায় ও বুদ্ধিমত্তায় সে খুব তাড়াতাড়ি মাঠের দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলে। ছেলেটি কেতাবি নাম শাহ আবু জাকের। পাড়ার সবাই ছোট বলে আদর করে ‘ভাই’ বলে ডাকতো। সেই থেকে এই ছেলেটি শুধু পাড়ার না, পুরো শহরের ভাই। যা ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে সারা জেলায়।
সেই ছোট ছেলেটি আর বড় হলো না! এমনকি ৫০ বছর বয়সেও না! ১৯৮৭ সাল থেকে ২০২১, ৩৪ বছর। আমাদের ভাইকে কেউ মাঠ ছাড়া করতে পারেনি। তা করলো কী- না করোনা! অসুস্থ হওয়ার আগের দিনও ভাই মাঠে।
করোনার এই করুণাধারায় মৃত্যুর মিছিল সর্বত্র। এতো মৃত্যু এর আগে দেখেনি কেউ! শোকের মাইকিং চলেছে অবিরত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখা দায়। কবরে, শ্মশানে রাজ্যের ব্যস্ততা। এবার ছিল শহর-গ্রাম একাকার। এমনকি দেশ বিদেশেও কোনো ভেদাভেদ নেই। জাত-পাত নেই। যেন সবই মিথ্যা, শুধু মৃত্যু সত্য। পৃথিবীব্যাপী মৃত্যু।
ছোট বেলা খেলতে যেতেন কারবালার মাঠে। শহরের জামতলার শেষ প্রান্তে যে বিশাল মাঠ ছিলো, সেটি কারবালার মাঠ নামে পরিচিত ছিলো। মাঠটি এবড়োথেবড়ো থাকায় প্রতিদিনই খেলতে গিয়ে কেউ না কেউ আহত হতো। খেলোয়ারদের এই ভয়ংকর পরিণতির জন্য শহরের এই মাঠটি কারবালার মাঠ হিসেবে কুখ্যাত ছিল। এই মাঠের শুরুর দিকের খেলোয়াড়, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব জনাব আমিনুল ইসলাম টিপু এ তথ্যটি জানান। ভাই ১৯৮৭ সালে সুনামগঞ্জে ফুটবল লীগে প্রথম বারের মতো অংশ নেন মিলন ক্লাবের পক্ষে। এক সময়ের কৃতী খেলোয়ার ও কোচ জনাব আব্দুল আলী ভাইকে প্রথম একটি ডানলপ বুট কিনে দেন। এরপর ব্রাদার্স ইউনিয়ন নামে নতুন ক্লাব গঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন।
এরপর একে একে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও শাহবাগ ক্লাবের পক্ষে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে খেলেন। ২০০৪ সালে নিজেই একটি ফুটবল ক্লাব গঠন করেন। ক্লাবটির নাম রয়েল বেঙ্গল। টিমটি ঐ বছর লীগ চ্যাম্পিয়ান হয়। ফুটবল খেলা শুরু করার সাথে সাথে তাকে রেফারি সমিতির সাথে যুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে তার সততা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়। শুরুতেই তাকে রেফারি সমিতির কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন আব্দুর রউফ ঝনর। ভাই ২০১৩ সালে বিপুল ভোটে সুনামগঞ্জ জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতি হয়। তিনি সুনামগঞ্জ ক্রিকেট আম্পায়ার্স এন্ড স্কোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ ১৪ বছর। এই সময়কালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন রেজওয়ানুল হক রাজা। মাঠে ফুটবল হোক, ক্রিকেট হোক বা অন্য খেলা অথবা কোনো খেলা না থাকুক, ভাইকে পাওয়া যাবেই মাঠে।
তিনি যখন ফুটবলার হিসেবে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন শুরু হয় পাড়ার প্যারামাউন্ট ক্রিকেট ক্লাবের নবযাত্রা। এসময় ক্লাবটির হাল ধরেন স্বনামধন্য ক্রীড়াবিদ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব আমিনুল ইসলাম টিপু। তখন ভাই, পাবেল ভাই, উজ্জ্বল ভাইরা স্কুল কলেজের বালক। তাদের নিয়মিত দেখা হতো পাড়ার একটি দোকানে। তখন একে একে পাড়ার টিম প্যারামাউন্টের পক্ষে তারাও মাঠে নামেন। ভাই প্রথম দিকে ক্রিকেট ক্লাবের খেলোয়ারদের ফিটনেস ট্রেনিং দিতেন। আস্তে আস্তে তিনি নিজেও ক্রিকেটের সঙ্গে একিভূত হয়ে যান। এভাবে কয়েকবছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমিনুল ইসলাম টিপু ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লে প্যারামাউন্ট ক্লাবের দায়িত্ব এসে পড়ে ভাইয়ের উপর। তার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো প্যারামাউন্ট ক্লাব। কাছাকাছি সময়ে তিনি খেলাধুলার পাশাপাশি ছোটখাটো ব্যবসা বাণিজ্যও শুরু করেন। কয়েকজন তরুণ মিলে প্রতিষ্ঠিত খেলাধুলার সামগ্রীর দোকান বি. আর. টি স্পোর্টসকে শহরের অভিজাত স্পোর্টসের দোকানে পরিণত করেন। সেই থেকেই সুনামগঞ্জের সবধরণের খেলাধুলার সামগ্রীর এবং ক্রীড়ামোদীদের আড্ডার কেন্দ্রস্থল শহরের আলফাত স্কোয়ারের এই বি.আর.টি স্পোর্টস। আর এর মধ্যমনি আমাদের প্রিয় ভাই।
জনাব দেওয়ান ইস্কন্দর রাজা চৌধুরীর (সুবক্ত রাজা) হাত ধরে প্যারামাউন্টের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৭ সালে। আশির দশকের মধ্যভাগে বাসস্ট্যান্ডে (বর্তমানে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড) বাসা বাড়ি কম থাকলেও প্রতিটি বাসাতেই ছিলেন একাধিক খেলোয়াড়। খেলার আগের দিন বিকেল থেকেই পাড়ায় থাকতো উৎসবের আমেজ। এমনকি পাড়ার মসজিদে খতমে তেরাবী পড়াতে আসা তরুণ হাফেজ একেএম সাইফুল আলমও মাঠে চলে যেতো খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতে। খেলার দিন সকাল বেলা সাদা শার্ট প্যান্ট পড়ে একে একে বেরিয়ে আসতেন ফজলুল হক ভাই, আজিজুল হক ভাই, নুপুর দা, টুপুর দা, তৌফিক দোলন দা, জহর দা, উজ্জ্বল ভাই, পাবেল ভাই, লিটন ভাই, শিমুল প্রমুখ। এছাড়াও অন্যান্য পাড়ার বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ও টিমে ছিলেন। এক সময় সুনামগঞ্জের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান অনেক খেলোয়াড় প্যারামাউন্ট ক্লাবে খেলেন। এখানে স্থানাভাবে অন্য কারো নাম উল্লেখ করতে না পারায় সবার কাছে আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অচিরেই ক্লাবের স্যুভেনির বের হবে, এতে সবার নাম থাকবে।
খেলা হতো ৩৫ ওভারের। তাতেও মাঝে মাঝে খেলা শেষ হতে সন্ধ্যা হয়ে যেতো! রান রেটে এগিয়ে থাকা দল আলোর স্বল্পতা দেখিয়ে আর খেলতে চাইতো না। লাঞ্চের সময় দুই দলই চলে যেতো বাজারে। হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে আস্তে-ধীরে মাঠে আসতো। আম্পায়ারগণ মাঠে বসে অপেক্ষা করতেন, কখন দলগুলো মাঠে ফিরবে এবং তারা ২য় ইনিংস শুরু করবে!
প্রথম দিকে প্যারামাউন্ট ক্লাব স্টেডিয়ামে প্র্যাকটিস করলেও ভাই এক পর্যায়ে আমাদের নিয়ে যান বুলচান্দ হাইস্কুলের মাঠে। সেখানে মহিলা কলেজের ২টি ভবন ছাড়া আর কোনো স্থাপনা না থাকায় প্রায় পুরো মাঠ জুড়েই আমরা প্র্যাকটিস করতাম। উকিলপাড়া পাপ্পাদা তখন আমাদের প্র্যাকটিস করাতেন। ৮৮-৮৯ সালে স্কুল পড়–য়া আমরা দুপুরে খেয়েই বুলচান্দ স্কুলের মাঠে চলে যেতাম। ভাই দীর্ঘ সময় আমাদের ফিজিক্যাল ট্রেনিং করাতেন। তারপর হতো ফিল্ডিং প্র্যাকটিস। সে এক স্বপ্নময় সময়! টিপু ভাইয়ের কাছে কিছু বলার সাহস ছিল না। আমাদের সব আবদার ছিল ভাইয়ের কাছে। ভাই বি.আর.টি স্পোর্টসের স্বত্বাধিকার হওয়ার পর আমরা যখন যা দরকার তা নিয়ে যেতাম সেখান থেকে। বুলচান্দ স্কুলের মাঠে বাসা-বাড়ি বানানো শুরু হয়ে গেলে আমাদের ক্লাবের প্র্যাকটিস আবারও স্টেডিয়ামে চলে আসে।
শাহ আবু জাকের ভাই ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন বাসস্ট্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ভাইয়ের পিতা শাহ মো. আব্দুল আজিজ শহরের নামকরা মোক্তার ছিলেন। মাতা সুফিয়া খাতুন। ৯ ভাই বোনের সংসারে তিনি পঞ্চম। তিনি পাড়ার পি.টি.আই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। সরকারি জুবিলী হাইস্কুল থেকে ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাশ করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হোন। সেখান থেকে আই.এ ও বি.এ পাশ করেন। ২০১৩ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কাকতালীয়ভাবে তার বিবাহের দিন প্যারামাউন্ট ক্লাবের ঐ বছরের শেষ খেলা ছিল এবং তাতে জিতলেই দলটি চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাওয়ার কথা। খেলার এক পর্যায়ে ক্লাব ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে। তিনি বর যাত্রা না করে অনেকক্ষণ মন খারাপ করে মাঠে বসে ছিলেন। একটা ক্লাব কতটুকু অন্তরের অন্তস্থলে থাকলে তা করা সম্ভব! তবে সেদিন ক্লাবের খেলোয়াড়রা শেষ পর্যন্ত ঠিকই জয় ছিনিয়ে আনে এবং ভাইয়ের মুখে হাসি ফোটায়।
২০১৩ ছাড়াও ক্লাবটি ৭৭ সালে যাত্রা শুরু করে ৭৮, ৯২, ৯৮ এবং ২০২০ সালে লীগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। প্যারামাউন্ট ভিক্টর নামে আরও একটি ক্লাব ছিল। এখনও আছে প্যারামাউন্ট ড্রাগন নামে হ্যান্ডবল ক্লাব। এই হ্যান্ডবল ক্লাবটিও একাধিকবার হ্যান্ডবল লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই তিনটি ক্লাব নিয়েই প্যারামাউন্ট পরিবার।
একজন আপাদমস্তক আদর্শ ক্রীড়াবিদ ছিলেন ভাই। খেলোয়াড় দর্শক সবাই তাঁকে চেনে। এমনকি যিনি জীবনে ফুটবলে একবার কিক দিয়েছেন, তিনিও। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন ভাইয়ের কাছে আসতো। খেলাধুলা বিষয়ক, যে কোনোভাবে শরীরে ব্যথ্যা পেলে ফিজিও হিসেবে ভাইয়ের পরামর্শ নিতো। ‘ভাই’ সম্মোধনের সাথে সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা মিশ্রিত থাকতো। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। জেলার ফুটবল-ক্রিকেট দল নিয়ে সারাদেশে ঘুরেছেন। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে এই বছরের ৭ মার্চ অনীশ তালুকদার বাপ্পুর একটি লাইভ প্রোগ্রামে বলেছিলেন তাঁর স্বপ্নের কথা। তিনি চান সুনামগঞ্জের খেলোয়াড়রা জাতীয় দলে খেলবে। প্রাক্তন সব খেলোয়াড়গণকে সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। করোনায় যারা মারা গেছেন তাঁদের স্মরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ২৫/ ০৮/ ২০২১ এ তিনিই সবকিছুর উর্ধ্বে চলে গেলেন!
ব্যক্তিগত জীবনের হিসাব মিলাতে পারেননি। ব্যবসায়ী হিসেবেও সফল ছিলেন না। কিন্তু আপামর মানুষের মন জয় করে নিয়েছিলেন। এখন ভাইয়ের অবুঝ দুই সন্তানের মন জয় করে ভাইয়ের ঋণ আমাদের কিছুটা হলেও শোধ করা উচিত।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, প্যারামাউন্ট ক্লাব, সুনামগঞ্জ।

  • [১]