স্টাফ রিপোর্টার
আন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করতে আসা লোকজনকে চরম দুর্ভোগ সইতে হয়েছে একুশের প্রথম প্রহর থেকে সকাল পর্যন্ত।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভেতরে জমে থাকা জল ভেঙ্গে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করেন রাজনৈতিক, সামাজিকসহ নানা সংগঠন। মুক্ত বাংলাদেশের প্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অব্যবস্থাপনার শিকার হয়েছে মানুষ। যদিও পরে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা শহীদ মিনারের ভেতরে জমে থাকা পানি নিস্কাশন করে দেন।
এরকম অবস্থায় সুনামগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনায় কারা রয়েছেন, শহীদ মিনার কে রক্ষাণাবেক্ষণ করেন ? এই তথ্য তা জানেন না বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যসহ সাধারণ মানুষ। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর থেকেই মঙ্গলবার সকালে ফুল দিতে এসে শহীদ মিনারের ভেতরে জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা দেখে এসব মন্তব্য করেন উপস্থিত অনেকেই।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পৌরসভার। পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখত জগলুল জানিয়েছেন পৌরসভাকে এর রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিটের কমান্ডার নুরুল মোমেন নিজেই জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে তাঁদের। তারাই এর রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘গত দুই বছর ধরে ভাষা শহীদদের জন্য একটি শহীদ মিনার নির্মাণের চেষ্টা করে যাচ্ছি তবে কোনভাবেই হচ্ছে না। শহরের কোথাও জায়গা না পাওয়ায় আমি উপযুক্ত জায়গা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও করতে দেয়া হচ্ছে না। অন্য কোথাও শহীদ মিনার নির্মাণের ভাল জায়গা এখন পাওয়া যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ মিনারেই ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে ফুল দেয়া হচ্ছে। ভাষা শহীদদের জন্য একটা শহীদ মিনার নির্মাণ করতে জেলাবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আয়ুব বখত জগলুল বলেন,‘শহীদ মিনারটি ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এটা পৌরসভার কোন রকম ভূমিতে নয়। পৌরসভা থেকে নির্মাণও করা হয়নি। এর রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন দায়িত্ব পৌরসভাকে দেয়া হয়নি। তবে আমি পৌরসভার দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকেই যথাসাধ্য সংস্কার করে যাচ্ছি। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষে আলোর ব্যবস্থা করছি। এর সামনের দু’টি কক্ষ সরানো দরকার এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধা সংসদের হাতে দিয়ে দিলে ভাল হয়। ’
তিনি আরো বলেন,‘এটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হলেও এর ভূমি শহীদ মিনারের নামে নয়। এর ভূমি শহীদ মিনারের নামে রেকর্ড করানো সহ আশপাশের সকল পরিত্যক্ত ভূমি শহীদ মিনারের নামে রেকর্ডের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ লালনকারী সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। ভূমি উদ্ধারের পর শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই শহীদ মিনারকেই দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার হিসেবে সংস্কার করা যেতে পারে।’
সনাকের ইয়েস গ্রুপের সদস্য আসাদুজ্জামান প্রিয়ন বলেন,‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার এ বিষয়টি সবার জানা প্রয়োজন। মঙ্গলবার সকালে শহীদ মিনারের ভেতরের জমে থাকা পানি নিস্কাশনের জন্য আমরা কাউকে খোঁজে পাইনি। কে আছেন এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে তা জানা সম্ভব হয়নি। পরে নিজারাই পানি নিস্কাশন করি। ’
সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়ামের দল নেতা আবিদ খান হৃদয় বলেন,‘ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চরম অব্যবস্থায় রয়েছে। সংস্কার বা আধুনিকায়নের কোন উদ্যোগ নেই। কারা এর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে তা আমরা জানি না। এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংস্কার না করেই নতুন আরেকটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ’
খেলাঘরের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাজু আহমেদ বলেন,‘ মঙ্গলবার সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে দেখি ভেতরে প্রায় হাটু পানি। আমরা নিজেরাই পানি সরানোর ব্যবস্থা করি। পরে আস্তে আস্তে পানি সরে যাওয়ায় সবাই ফুল দেন। উপস্থিত সবাই শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কাউকে খোঁজে পাননি। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমরা জানতে চাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় কে আছেন ’
বিশ্বম্ভরপুর দিগেন্দ্র বর্মন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক লেখক মো. মশিউর রহমান বলেন,‘একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে আমরা চরম অব্যবস্থাপনার সন্মুখিন হয়েছি। ভেতরে জমে থাকা পানির কারণে সবাই দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। এসময় শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনায় থাকা সংশ্লিষ্ট কাউকে খোঁজে পাওয় যায় নি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ব্যবস্থাপনায় কারা রয়েছেন তা প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। সবাই জানতে চান কোন প্রতিষ্ঠান এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায়।’
জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য রইসুজ্জামান বলেন,‘মঙ্গলবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে এসে দেখি বেদির চারদিকে পানি। দ্রুত আমরা পানি অপসারণে নামি। পরে ধীরে ধীরে পানি সরে যাওয়ায় জনতা শহীদ বেদিতে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পন করেন।’
জেলা সিপিবির সভাপতি শিক্ষাবিদ চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন,‘চারদিকে সরকারি জায়গা থাকলেও সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্প্রসারণ না করে একটি মহল অন্যত্র সরানোর ষড়যন্ত্র করছে। তাই কৌশলে শহীদ মিনারকে অবহেলায় রেখে সংস্কার না করে পরিত্যক্ত দেখিয়ে দখলের ষড়যন্ত্র চলছে। পানি ভেঙ্গে হাজারো জনতা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ মিনারকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, শহীদ মিনার নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদেই শ্রদ্ধা প্রকাশে এবার মানুষের ঢল নেমেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র সুনামগঞ্জ এর আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতি এমন অবহেলাই প্রমাণ করে এটাকে নিয়ে কেমন গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।’ আবেগ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কেন্দ্রীয় এই শহীদ মিনার সংস্কার ও সম্প্রসারণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা নিজ হাতে ডিএসরোডে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এই শহীদ মিনার মুক্ত বাংলাদেশ প্রথম শহীদ মিনার। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে সর্বস্তরের মানুষ এখানেই অধিকার আদায়ের সকল কর্মসূচি পালন করেছেন।