জলমহালগুলোকে ঘিরে নানা পক্ষের অনেক স্বার্থ থাকে। মাঝে মধ্যেই স্বার্থের এই দ্বন্দ্ব সহিংসতায় পরিণত হয়। সহিংসতার পরিমাণ সত্তর বা আশির দশকের তুলনায় এখন তেমন নেই সত্য, কিন্তু বড় জলমহালগুলো মাঝে মধ্যেই অশান্ত হয়ে উঠছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার ধর্মপাশার সুনই জলমহালের নিরাপত্তা বিধানে ওখানে পুলিশ ক্যাম্প ও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। জলমহালগুলোতে যে দ্বন্দ্ব তার পিছনে সরকারি নীতিমালার অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে ইজারা বন্দোবস্ত দেয়াকে কিছুটা হলেও দায়ী করা যেতে পারে। জলমহাল নীতিমালা অনুসারে জলমহালের নিকটবর্তী-তীরবর্তী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি বন্দোবস্ত পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। কাগজপত্র ঘাঁটলে দেখা যাবে জলমহালগুলো কোনো না কোনো মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামেই বন্দোবস্ত হচ্ছে। কিন্তু জলমহালের মালিকানা সত্ত্ব ভোগের ক্ষেত্রে ওই সমিতিগুলোকে পরে আর খোঁজে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ জলমহাল ইজারা নেয়ার জন্য প্রভাবশালীরা সমবায় সমিতির কাগজপত্রগুলো ব্যবহার করছে মাত্র। মালিকানার বেলায় আগের মতই জলসর্দারদের আধিপত্য রয়ে গেছে। নীতিমালা প্রণয়ন করেও আমরা জলমহালের উপর জেলেদের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এই ব্যর্থতা কার? ব্যর্থতার খতিয়ান খুঁজলে অনেক জিনিস বেরিয়ে আসবে। প্রথমত, একটি জলমহাল ইজারা নিয়ে পুরো ইজারা মেয়াদ ওই জলমহাল ব্যবস্থাপনার কোনো সক্ষমতা অর্জিত হয়নি সমবায় সমিতিগুলোর। সেই সক্ষমতা যেমন আর্থিক তেমনি সামাজিক প্রভাবের দিক দিয়েও। অন্যদিকে, প্রচ্ছন্নভাবে হলেও আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনও জলসর্দারদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছে। সমবায় সমিতির নামে ইজারা গ্রহণের পর কেন ওই জলমহালে সমিতির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না সেটি কখনও তারা খতিয়ে দেখেন না। সরকারের জাল যার জলা তার নীতিটি এভাবেই ভেস্তে গেছে।
জলমহালগুলোকে কেন্দ্র করে ইজারা গ্রহীতারা ইজারা গ্রহণে ব্যর্থ পক্ষ ও চোরা মাছ শিকারিদের দ্বারা প্রতিনিয়ত বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়ে থাকেন। ফলে জলমহালগুলো শক্তি প্রদর্শনের মহড়াক্ষেত্র হয়ে উঠে। যে পক্ষ শক্তি প্রদর্শনে দুর্বল তারাই জায়গা হারায়। তাই এসব পক্ষ সকলেই শক্তির জোরে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চায়। এর বাইরে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবপুষ্ঠ এই পক্ষ ইজারা না নিয়েও জলমহালের কিছু সত্ত্ব ভোগ করে থাকে। ইজারাদার নিজের স্বার্থেই এমন প্রভাবশালীদের মুফতে কিছু অংশ দিয়ে দেয়। জলমহালগুলো অর্থনৈতিকভাবে খুবই লাভজনক। তাই লাভের গুড়ের আশায় এখানে পিঁপড়ার উৎপাত সইতে হয়। এমন বাস্তবতায় জেলে-কৃষকদের অধিকারের বারোটা বেজে গেছে। ভাসান পানিতে মাছ ধরার আইনি অধিকার থাকলেও এখনও বহু ইজারাদার জলমহালের পার্শ্ববর্তী গ্রামের জেলে-কৃষকদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। মাছ ধরা হাওরাঞ্চলের কৃষকদের বিকল্প পেশা। তারা বাড়ির কাছের জলমহাল বহির্ভূত জলাশয় থেকে মাছ ধরতেও বাধার সম্মুখীন হন। এ কারণেও শক্তির প্রদর্শন হয়। তাই বোদ্ধা মহলের দাবি হল, জলমহালের ইজারাপ্রথা চিরতরে বাতিল করে জেলে-কৃষকদের অবাধে মাছ ধরার অধিকার দিয়ে দেয়া। কিন্তু এই অভিমতের পালটা যুক্তিও আছে। বাধাহীনভাবে মাছ ধরার অধিকার দিলে মাছের বংশ নির্মূল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা বজায় রাখাই কাম্য। এই জায়গায় দেশের প্রচলিত জলমহাল নীতিমালাটি ছিল যথেষ্ট গণমুখী। এর সুষ্ঠু প্রয়োগ সম্ভব হলে বিদ্যমান সংকট অনেকটাই কেটে যেত।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের জলমহালগুলোর স্বাভাবিক চরিত্র বজায় রাখতে হবে। মাছ শিকারের পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও বংশ বিস্তারও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নীতিমালার সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে প্রভাবশালী জলসর্দারদের হাত থেকে মৎস্যভা-ারকে রক্ষা করার জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।