ইকবাল কাগজী
‘সেখান থেকেই জলদস্যু সাইফুল বাহিনী তুলে নিয়ে যায় তাকে।’ ২৭ নভেম্বর ২০১৭ তারিখের দৈনিক সমকাল-এর একটি বাক্য, পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ স্তম্ভজুড়ে ছাপা প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘ডাঙায় ক্ষুধা, জলে দস্যু’। জল ও দস্যু দু’টি একাধারে তরলকঠিন ও নিষ্প্রাণসপ্রাণের মিলনে একটি আলাদা বস্তুগত অস্থিত্বরের ভাষিক প্রপঞ্চ তৈরি হয়। জলে বিচরণশীল নারীকে যেমন বলি জলকন্যা, তেমনি জলে বাস করে যে মানুষ সে হতে পারতো জলমানুষ, কিন্তু জলের উপর চলাচলকারীদের জানমাল হরণ করে বলে সে হয়ে গেলো ‘জলদস্যু’। জলদস্যু শব্দটির প্রথম ব্যবহার মেলে অক্ষয়কুমার দত্তের লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘অকূল জলধির পূর্ব্বপশ্চিম দিক তাহাদের অজ্ঞাত, তাহাতে জলদস্যু পরিপূর্ণ।’ শ্রীদত্ত শব্দটির ব্যবহার করেছেন ১৮৪৯-য়ে তাঁর এক লেখায়।
এদিকে ‘প্রভাবশালীরাই এসব সমিতি নিয়ন্ত্রণ করে বরাবরের মতো জলসর্দার হয়ে মাছের রাজত্ব শাসন করে।’ এই বাক্যটি কবি কুমার সৌরভের কলম কিংবা লেখনী নিসৃত বলা যায় না। কারণ তিনি এখন আর লেখার কাজে লেখনী ব্যবহার করেন না, ব্যবহার করেন কম্পিউটারের কিবোর্ড (তাগিদ অনুভব করছি, কম্পিউটার ও কীবোর্ডের জুতসই বাংলায়নের, কিন্তু নিজে করতে গেলে যতবার করি মনপছন্দ হয় না। এখনও কেউ করেছেন বলে চোখে পড়েনি।) সে যাই হোক, শ্রীসৌরভের বাক্যটিতে সন্নিবেসিত ‘জলসর্দার’ শব্দটি একটি আনকোরা নতুন শব্দ। জল ও সর্দার, শ্রীসৌরভের বাক্যটিতে এই দুই শব্দের সঙ্গম যে দ্বিপদী জঙ্গমের মনোছবি তৈরি করে, সেটা আইনি উপায়ে জলাশয়ের নির্দিষ্ট অংশের অস্থায়ী মালিক, ব্যবহারিক অর্থের দিক থেকে জলদস্যুর একেবারেই ধারেকাছে যায় না। জলদস্যুর অর্থ নদী বা সমুদ্রে যারা ডাকাতি করে, জলসর্দারের অর্থ সরকার নির্দিষ্ট জলাশয়ে যারা মাছমারার আইনি অধিকার লাভ করে। শব্দদু’টির অর্থভিন্নতা যতই থাক, গঠনশৈলীটি একেবারেই যাকে বলে অকৃত্রিম ও অভিন্ন। ‘সরকার নির্দিষ্ট জলাশয়ে মাছমারার অধিকারী বা ইজারাদার’ অর্থে এমন জুতসই শব্দ এর আগে কেউ বোধ করি ব্যবহার করেননি। শব্দটির সর্জনকর্মটি ভাটি অঞ্চলের ভাসান পানিতে জনসাধারণের মাছধরার সনাতনী অধিকার বঞ্চনার দ্রোহের সঙ্গে ওতপ্রোত বলে একটু অন্যরকম তাৎপর্যম-িতও বটে।
যে-কোনও জীবিত ভাষায় শব্দসর্জন ক্রিয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেটি একজন অক্ষয়কুমার দত্ত যেমন চালিয়ে যান সেই ১৮৪৯-য়ে তেমনি একজন কুমার সৌরভ একই কাজ করেন ২০১৭-য়। ভাষায় নবশব্দসর্জনক্রিয়া একটি নিরন্তর ভাষিক প্রকরণ। এই প্রকরণের অনেক প্রকার অনেক প্রদ্ধতি। এর ইংরেজি নাম নিওলোগিজম। হরহামেশা যেসব শব্দ আমরা ব্যবহার করি সহসাই সে-শব্দের অর্থ বদলে যেতে পারে। যেমন ‘ইটভাঙা’ শব্দটিকে কে না চেনে। শব্দটি যে-কাজটিকে বোঝায়, সেটার সঙ্গেও লোকে বেশ ভাল করে পরিচিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ক্রিয়াপদটি যখন ইংরেজি ‘টিউশনি’ (ছাত্রপড়ানো) শব্দের কর্মক্রিয়ার অর্থকে প্রকাশ করতে শুরু করে তখন বলতেই হয় যে, শব্দটির অবাক করা অর্থান্তর ঘটেছে। এইভাবে ব্যাপক জনবোধ্য কোনও শব্দের পুরনো অর্থের স্থলে কিংবা পাশাপাশি নতুন কোনও অর্থ প্রকাশের সামর্থ্য অর্জনকে নিউলোগিজম বলে গণ্য করা হয়ে থাকে।
বেশ কবছর আগে প্রথম আলোর প্রতিনিধি উজ্জ্বল মেহেদী টাঙ্গুয়ার হাওরের জলমহালের উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেখানে প্রচলিত ইজারা প্রথার ঘেরাটোপে হাওরনির্ভর মানুষজনের উপর আরোপিত আর্থনীতিক নিষ্পেষণের, তথা মাছধরা নিয়ে জেলে ও ইজারাদারের দ্বন্দ্বের, প্রসঙ্গটি উঠে আসে। দু’পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান এই দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে তিনি ইজারাদারের প্রবল প্রতাপ ও দৌরাত্ম্যের বিক্রমীবিস্তারের ভাবানুবাদ স্বরূপ ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ওয়াটার লর্ড’ শব্দবন্ধটি প্রথম ব্যবহার করেন। একেবারে অকাঠ মূর্খ ছাড়া অন্যদের কাছে ‘ওয়াটার’ ও ‘লর্ড’ শব্দদু’টি অপরিচিত (কিংবা বোধাতীত) কোনও শব্দ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশে পৌনে দু’শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বদৌলতে এই শব্দযুগল বাংলাভাষীদের কাছে বোধাতীত নয়, বরঞ্চ বাঙালি উচ্চবিত্ত শিক্ষিতমহলে সুবোধ্য ও এখনও ভীষণ আদৃত। অর্থাৎ আলাদা আলাদাভাবে শব্দদু’টির বাংলা অর্থ, যথাক্রমে ‘জল’ ও ‘প্রভু’, অর্থবোধে কোনও জটিলতা নেই। কিন্তু ‘ওয়াটার’ ও ‘লর্ড’ এই শব্দদযুগলের যুগলবন্দি ভাষিক রূপ (ওয়াটার লর্ড) সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলে ‘জলের প্রভু’, ‘জলের রাজা, ‘জলের বাদশা, ‘জলের মালিক’ ‘জলাধিকারী’ ‘জলেশ্বর’, ‘জলাধিপ’ কিংবা ‘বরুণ’, ‘জলতলবিহারী’ ‘জলদানো’ এসব কীছুই বোঝায় না। যেটা বোঝায় সেটা হলো জলমহালের ইজারাদার। এখানে ‘ইজারাদার’ শব্দটির মূর্তনির্দিষ্ট অর্থ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে বিশেষ নির্দিষ্ট জলাশয়ের মালিকানার আইনি অধিকারী। উজ্জ্বল মেহেদী সচেতনভাবেই ইজারাদারী প্রথার প্রাশাসনিক প্রয়োগ কার্যত হাওরাঞ্চলে জেলে ও ইজারাদারের মধ্যে যে-দ্বন্দ্বময় উৎপাদন সম্পর্ক, বা একটু অন্যভাবে বললে, একটি সামগ্রিক আর্থসামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে, সে-বাস্তবতায় ইজারাদারদের যে-স্বার্বভৌম স্বরূপ প্রতিষ্ঠিত হয়, সে-মূর্তনির্দিষ্ট প্রপঞ্চটিকে ‘ওয়াটার লর্ড’ বলে তাঁর প্রতিবেদনে আখ্যাত করেছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বাংলা কোনও শব্দ সর্জনের তাগিদ অনুভব করেননি, হয়তোবা তখন সেটার প্রয়োজনও ছিল না। কিন্তু তাঁর এই শব্দবন্ধের (ওয়াটার লর্ড) ব্যবহার তখন পাঠকসাধারণ্যে খুব আদৃত হয়েছিল ও প্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘ওয়াটার লর্ড’ শব্দবন্ধটি বিভাষার (ইংরেজি) শব্দ। ‘হাসপাতাল’ শব্দটিতে যেমন ইংরেজি ‘হস্পিটাল্’ শব্দটি নিজের জাতবদল করে ভাষান্তরের বদৌলতে বেঁচে আছে এবং আঠারো আনা বাংলা হয়ে উঠেছে, ‘ওয়াটার লর্ড’ শব্দবন্ধটিতে তেমন বাংলায়নের মিষ্টিমধুর আমেজ নেই। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ভাষা ইংরেজির বাংলাভাষায়
প্রবসিত প্রতিনিধিরূপে স্বাভাবিকভাবেই ‘ওয়াটার লর্ড’ শব্দবন্ধটির ভাবপ্রকাশের মুন্সিয়ানা ছিল ষোল আনারও অধিক, কিন্তু তাতে নতুন কোনও শব্দসর্জনের মেধাবী পারঙ্গমতা ছিল না। ‘ওয়াটার লর্ড’ শব্দবন্ধের বাংলায়ন ‘জলসর্দার’ হতেই পারে। কিন্তু ‘জলসর্দার’ শব্দটি সর্জনকালে কুমার সৌরভ হয়তো ভাবেনওনি যে, তাঁরকৃত শব্দটি ‘ওয়াটার লর্ড’-এর ভাবার্থকে পল্লবিত করে তোলছে। অথচ ‘জলসর্দার’ শব্দটির ভাবপ্রকাশের পারঙ্গমতা এতটাই পূর্ণপরিপুষ্ট যে, সে পুষ্টতার প্রসঙ্গে মনের প্রাঙ্গণে কোনও দ্বিধার ছায়াপাত হয় না, শুনেই হাওরপরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠা ‘জলসর্দার’-এর একটি প্রগাঢ় চিত্রকল্প তৈরি হয়ে যায় অনায়াসে, বাংলাভাষীর মনে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এটিকে একটি সৃষ্টশব্দ বলে নির্দ্বিধায় অভিহিত করা যায় এবং এমন শব্দসৃষ্টি বাংলাভাষায় সৃষ্টিছাড়া কোনও কা-ও নয়।
সাহিত্যিকরা প্রায়ই খেয়ালের বশে এমন চমৎকার চমৎকার সব শব্দ সর্জন করা অব্যাহত রেখেছেন। সাহিত্যিকরা ছাড়া সাধারণ মানুষ নতুন শব্দসর্জনে কম যান না, তাঁরা হরহামেশা অজ¯্র নতুন শব্দ তেরি করে চলেছেন। যেমন ‘খালি’ শব্দের সঙ্গে ‘মামা’ শব্দযোগে ‘খালিমামা’ শব্দের অর্থ ‘যাত্রীহীন রিকশা’। কাটাগাড়ি, জলজট, জলবেশ্যা, মলমপার্টি, ইয়াবাসা¤্রজ্ঞী, চোরচক্র ইত্যাদি অতিসাম্প্রতিককালে আবির্ভূত হওয়া এরকম অনেক শব্দের দুয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। সুনামগঞ্জে ‘খালিমামা’ শব্দটির ব্যবহার প্রায় না থাকলেও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে শব্দটির ব্যবহার ব্যাপক। ইদানিংকার গল্পকাহিনীর বিবরণ ও বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে শব্দটির সন্নিবেশন শব্দটিকে ভবিষ্যতের অভিধানে অন্তর্ভুক্তির অগ্রিম সবুজ ছাড়পত্র দিয়ে রেখেছে।
বাংলাভাষায় নবশব্দসর্জনে পারঙ্গম সাহিত্যিকদের মধ্যে আছেন কমবেশি অনেকেই। বিখ্যাতদের মধ্যে মাইকেল মধুসূদন, পরশুরাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, রমাপদ চৌধুরী, আব্দুশ শাকুরের মতো দিকপালগণের নাম করা যায়। তাঁদের পাশে অগুন্তি নামীদামী লেখক ছাড়াও আছেন গ্রামে-গঞ্জের পাড়ামহল্লার বিভিন্ন ঠেকে আড্ডবাজ কেউ কেউ। কাজীকবি নজরুল ‘মৌলভী’ শব্দের অনুকরণে মৌলবাদী ধর্মান্ধতার ধারককে কটাক্ষকণ্টকে বিদ্ধ করতে সর্জন করেন ‘মৌলোভী’ এবং আব্দুশ শাকুর ‘করিতকর্মা’ শব্দের অনুকরণে তৈরি করেন আমলাতান্ত্রিকতাকে পরিহাসপ্রহরণে পারঙ্গম শব্দ ‘করিবকর্মা’। এমনকি নিতান্ত নগণ্য ইকবাল কাগজী ‘সৌন্দর্য’র অনুকরণে সৌন্দর্যের বিপরীত অর্থ কুৎসীত বোঝাতে রচনা করেন ‘কৌন্দর্য’ এবং কবি কুমার সৌরভ ‘ইজারাদার’ শব্দের অনুকরণে তৈরি করেন ‘জলসর্দার’। যাঁরা সাহিত্যরথী তাঁরা কেমন জানি কী করে এমন সৃষ্টিকৌশলের প্রয়োগ করেই চলেন নিরন্তর। এতে ভাষা সমৃদ্ধ হয়, ভাষার বেগ বাড়ে, বাড়ে ভাবপ্রকাশের ক্ষমতা-দক্ষতা। বলা যায়, ভাষাবৃক্ষ পত্রপুষ্পফলের অপার অপরূপ সম্ভারে আরও আরও পল্লবিত হয়ে উঠে।
পরশুরাম তার একটি গল্পের একজায়গায় লিখেছেন, ‘যেমন অধিরাজ, অধিকর্তা তেমনি অধিগু-া। রাজার উপরে যেমন অধিরাজ, কর্তার উপরে যেমন অধিকর্তা, রজনীকান্ত তেমনি অধিগু-া।’ পরশুরামের এই উদ্ধৃতির পরে লেখক লিখেছেন, ‘অর্থাৎ গু-ার উপরে অধিগু-া। শুধু গু-া বললে রজনীকান্তকে ছোট করা হয় বলেই লেখককে এই নতুন শব্দটি বানাতে হল। এটি একটি অনুগ বয়ন।’ বলাই বাহুল্য রজনীকান্ত পরশুরামের গল্পের একটি চরিত্র।
আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, এই লেখক ও তাঁর যারপরনাই চমৎকার বইর নাম আমার এখনও অজানা। যেহেতু আমার পঠিত বইটির আগাও নেই পাছাও নেই, আছে কেবল মাঝখানের পাতাগুলো, যাতে আছে বেশ ক’খানা সুপাঠ্য সুন্দর প্রবন্ধ। বই ও প্রণেতার নাম নাই বা জানা হলো, তাতে কী, বই পড়তে তো কোনও বাঁধা নেই। বইটি আমি গোগ্রাসে পড়েছি এবং রসাস্বাদন করে যারপরনাই তৃপ্ত হয়েছি এবং এক পর্যায়ে লেখার ধরণ দেখে আমার মনে হয়েছে বইখানার লেখককে আমি চিনি। কোথায় যেনো এমনধারা লেখা পড়েছি। তারপর আমার মনে হয়েছে লেখকের নাম বোধ করি ‘কুন্তক’ হবে। সে অনুমান ভুলও হতে পারে। ‘কুন্তক’ পশ্চিমবঙ্গের একজন বিখ্যাত লেখকের ছদ্মনাম। সে বিখ্যাত লেখকের নামটাও এই মুহূর্তে এই অধমের মনে পড়ছে না।
মাইকেল মধূসূদনের কাল থেকে বা তারও আগে বাংলাভাষায় নবশব্দসর্জনের প্রকরণ প্রচলিত ছিল, সন্দেহ নেই। বাংলা ‘আকাশবাণী’ শব্দটার প্রাচীনত্ব সন্ধান করলেই সে সত্য উদ্ভাসিত হবে। একবার ‘দেশ’ পত্রিকার এক লেখক রবীন্দ্রনাথকে ‘আকাশবাণী’ শব্দের কারিগর বলে বর্ণনা করেন। তথ্যটির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন পল্লবিত হলে, বিভিন্নজনের অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত ‘আকাশবাণী’ শব্দটির উৎসকাল রামায়ণ মহাভারতের বঙ্গীকরণের কালকে অতিক্রম করে যায়। ১৫৮০-তে এক কবির কবিতায় ‘আকাশবাণী’ শব্দটি পরিলক্ষিত হয়। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘শুনিয়া আকাশবাণী সর্ব ভক্তগণ’। আর ‘আকাশ’ শব্দটি তো চর্যাপদেই আছে একেবারে অবিকৃতাকারে। চর্যাপদের একটি পদের (৪১ নং) একটি লাইন এরকম, ‘বালুআতেলেঁ সসরসিংগে আকাশে ফুলিলা।’ কবিগুরু রবি ঠাকুরের কালে তো বিবিধ প্রকরণে নতুন শব্দসর্জনের প্রচলন বিস্পক (বিস্তর+ব্যাপক) ছিল এবং তা আদৃত হয়ে উঠে কেবল নয়, বরং হয়ে উঠে রীতিমতো একটি প্রতিষ্ঠিত প্রকরণ। এইরকম নতুন শব্দসর্জনের অজ¯্র দৃষ্টান্ত পূর্বোক্ত অনামিক লেখক (সম্ভবত কুন্তক) তাঁর বইতে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এদিকে ‘মনোগতি’ নামের রবীন্দ্রনাথের ছোট একটি রচনা রয়েছে। যেমন পাটিগণিত বীজগণিত রেখাগণিত, তেমনি শব্দ মনোগণিত। তফাতের মধ্যে তেমন পরিচিত শব্দ এটি নয়। মনোগণিতের অঙ্ক কষেন কারা? কবি সাহিত্যিকেরা।’ রবীন্দ্রনাথ যদি পাটিগণিত, বীজগণিত, রেখাগণিতের অনুকরণে ‘মনোগণিত’ তৈরি করতে পারেন তাহলে জলদানো, জলদস্যু, জলদাস, জলদেবতা ইত্যাদির অনুকরণে কবি কুমার সৌরভ ‘জলসর্দার’ সর্জনের সম্যক স্বাধিকার সংরক্ষণ করতেই পারেন। এমনকি ‘ইজারাদার’-এর অনুগ বয়নও হতে পারে ‘জলসর্দার’। বাংলাসাহিত্যের বিশাল ভা-ার মন্থন করে অনুরূপ অনেক দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যেতে পারে অনায়াসে। যেমন ‘অভাব দোষ’ (‘স্বভাব দোষ’ থেকে) ধ্যানসাধ্য (‘শ্রমসাধ্য’ থেকে) কিংবা ‘ভাবমূর্তি’ (‘দেবীমূর্তি’ থেকে) ইত্যাদি শব্দ/শব্দবন্ধ সর্জন করেছেন যথাক্রমে সুকুমার রায়, জীবনানন্দ দাশ ও হুমায়ুন আজাদ। অনুগ বয়ন রীতি অবলম্বন করে এই তিনজনের শব্দসর্জনের কৃতিত্বের মতো (প্রকৃতপ্রস্তাবে আরও অনেকের সঙ্গে) কুমার সৌরভের ‘জলসর্দার’ শব্দসর্জনের কৃতিত্বটিও বেঁচে বর্তে থাকবে, বাংলা ভাষায়। এটি ভাষার একটি স্বভাবধর্ম।
জলের দেশ বাংলাদেশ। জলসংস্কৃতির দেশ ভাটির দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী সুনামগঞ্জ। এখানে জল নিয়ে শব্দ তৈরির খেলা করা এখানকার ভাষারাজ্যের নাগরিকের জীবনপ্রকরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাষারাজ্যের নাগরিক হিসেবে সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ প্রত্যেকে প্রকৃতিগতভাবেই নতুন নতুন শব্দসর্জনের সার্থক কারিগর। সেসব সুন্দর সুন্দর সার্থক শব্দের কয়েকটি (যে-গুলো ‘জল’ শব্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট) যেমন : জলকন্যা, জলকুমারী, জলত্রাস, জলপরি, জলনারী, জলবেশ্যা, জলনটিনী, জলবিছুটি, জলটুঙ্গি, জলভূমি, জলযান, জলপান, জলপানি, জলভসকা, জলভাঙা, জলজট, জলযাত্রা, জলযান, জলমন্ধার, জলমরু, জলমেয়ে, জলসই, জলসাই, জলসিঁড়ি, জলভরা, জলকেলী ইত্যাদি অনেক অনেক শব্দ, সন্ধান করলেই মিলবে। এইসব শব্দের বা বিশেষ করে জলদস্যু বা ইজারাদারের অনুকরণে যে-কেউ ‘জলসর্দার’ শব্দটি সর্জন করতেই পারেন। ‘জলসর্দার’ শব্দটির কারিগর হিসেবে আপাতত ধরে নিতে পারি কবি কুমার সৌরভকেই। যদি কেউ অন্য কাউকে ‘জলসর্দার’ শব্দের সর্জনকর্তা হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আমার দাবি কিংবা আবিষ্কার প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।