- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

মোহাম্মদ সাদিক
১৯৭০ সাল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুনামগঞ্জ মহকুমা শহরে তার নির্বাচনী প্রচারে এসেছেন। তখনকার স্টেডিয়ামের পূর্বপাশে একটি মঞ্চ করে তার জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি করা এ মঞ্চে সিনিয়র নেতারা উঠছেন। আমি তখন কলেজের ছাত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য অসাধারণ এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। ‘রাজনৈতিক মুক্তি ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি আসে না’- লেনিনের এসব উক্তি তখন আমাদের মুখে মুখে। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা কীভাবে শোষণ করেছে, নিপীড়ণ করেছে এবং পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানকে পুষ্ট করছে। ১৯৬৮ সাল থেকে স্কুল হোস্টেলে থাকতেই আমি ‘দৈনিক পাকিস্তান’ নামে বাংলা দৈনিক ও ‘জনতা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং সিনেমার সংবাদের জন্য একটি মাসিক ‘সচিত্র ঝিনুক’ নিয়মিত রাখতাম। ‘জনতা’ পত্রিকায় তখন প্রথম পৃষ্ঠায় জাতির পিতার জনসংযোগ, জনসভার সংবাদ প্রকাশ করা হতো। প্রতিদিন এসব সংবাদ পাঠ করে এই নেতার প্রতি এক অসাধারণ আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ আমাকে আবেগাপ্লুত করে। সারা পৃথিবীর শোষিত মানুষের মুক্তির কথা লেনিনের মুখে উচ্চারিত হতে দেখে এবং সমাজতান্ত্রিক একটি নতুন পৃথিবীর মানচিত্র খুঁজতে গিয়ে কমরেড শফি ভাইয়ের পরিচর্যায় আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমার নিজের দেশের মানচিত্র রচনার ভিত্তি রচিত হতে শুরু      হয়েছে। সচিত্র ‘ঝিনুক’ পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাসে নায়ক তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র রুপার ফ্রেমে বাঁধিয়ে শিয়রে রাখছে। আর বাঙালিদের জন্য একটি নতুন দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে  যে জাতি, বয়সে তরুণ হলেও আমি তার ধ্বনি শুনতে পাই।
আওয়ামী লীগের মহান নেতার জন্য তৈরি করা মঞ্চের মধ্যে আমি আমার স্বপ্নের পৃথিবী, তার একটি অবয়ব রচিত হতে চলেছে- এ মুগ্ধতা নিয়ে মোহাবিষ্টের মতো বড়দের সঙ্গে সঙ্গে আমিও এই মঞ্চে আরোহণ করি। বড়রা সবাই সারি বেঁধে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেছিলেন। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এই ক্ষীণকায় তরুণও অনেক স্পর্ধায় হাত বাড়িয়ে দিই। জাতির পিতার হাতে হাত জীবনে আমার এই প্রথম ও এই শেষ। জীবনে পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনায়ক এবং রাজার সঙ্গেও ঘটনাক্রমে হাত মেলানোর সুযোগ হয়েছে। কিন্তু এত নরম এবং প্রশস্ত হাতের তালু- আর কখনও অনুভব করিনি। সম্ভবত সেদিন সবচেয়ে কনিষ্ঠ যে মানুষটি মঞ্চে সারাক্ষণ বসে ছিল- সে আমি। আমার সারা অনুভূতির মধ্যে দেশের জন্য এক অনাস্বাদিত আনন্দের অনুভূতি কাজ করতে থাকে। পুরো অনুষ্ঠানে আমি মহান নেতার এক মুগ্ধ অনুসারী হয়ে মঞ্চের মধ্যে বসে থাকি।
১৯৭০ সালে নির্বাচন হল। ইতিহাসের চাকা ঘুরে মুক্তি সংগ্রাম, একাত্তরের মার্চ মাস। ৭ মার্চে জাতির পিতার আহ্বান- ‘…প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে …। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
তারপর ২৫ মার্চের কালোরাত! গণহত্যা! মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানের কারাগারে জাতির পিতা। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষের জীবন দান, তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানো। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। অতঃপর প্রতীক্ষা। অতঃপর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। আবার সেই রেসকোর্স। ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ ‘কবিগুরু’ আপনি এসে দেখে যান, আমার বাঙালি মানুষ হয়েছে।’
এই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে ফিনিকস্ পাখির মতো বাঙালিকে জাগিয়ে তোলার স্বপ্ন এবং সংগ্রামে তার দিন কাটে। তার রাত কাটে। তার সহধর্মিণী, তার সন্তানেরা, বাংলার মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ হয়ে তাকে চির প্রেরণা দান করেন। বাঙালিকে বিশ্বাস করে আড়াই তলা একটি সাদা বাড়িতে এক মধ্যবিত্তের জীবনযাপন করেন তিনি।
তারপর ১৯৭৫, ১৫ আগস্ট। তারপর রাতের অন্ধকারে বাঙালি নামের কতিপয় ঘাতক তাকে, তার সহধর্মিণীকে, তার সন্তানদের, এমনকি শিশু রাসেল, পুত্রবধূ, তার সামরিক সচিব, যাদের সামনে পেয়েছে, যারাই তার স্বজন- তাদের হত্যা করেছে। বাঙালির ইতিহাস কালিমাযুক্ত করেছে। তখনও তার পরনে মধ্যবিত্ত বাঙালির পোশাক- বাঙালির লুঙ্গি, তার চশমা, তার প্রিয় পাইপ-
ষাট দশকে যখন দারুণ ঝড় বইছিল / বাংলায়, তখনো সেই পাইপটি জ্বলছিল তাঁর হাতে। / সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরে পাকিস্তানের কারাগারে / নির্জন অন্ধকারে সেই পাইপ কখনো নেভেনি।
এই বাংলার ভবিষ্যৎ, বাংলার স্বাধীনতার বিষয়টি তখন / নির্ধারিত হয়েছে এই পাইপ টেনে টেনে।
স্বাধীন বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা / কিংবা বঙ্গোপসাগরের জলের গভীরে গিয়েও এই পাইপ কখনো নেভেনি।
শুধু পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে / টকটকে লাল রক্তের ছিটায়, ঘন অন্ধকারে / প্রিয় পাইপটি অকস্মাৎ কাত হয়ে পড়ে, আর / বাংলার সমূহ স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিঃশেষ হতে দেখে / ক্ষোভে দুঃখে অপমানে ও ঘৃণায় / বাংলাদেশের প্রিয় পাইপটি নিঃশব্দে নিভে যায়
 কোনোদিন আর জ্বলে না! / জ্বলবে নাকি কোনোদিন, / কোনোদিন আর!
এই আগস্টে পুনরায় স্মরণ করি- একটি দেশ, একটি মানচিত্র, একটি জাতীয় সঙ্গীত, একটি পতাকা এবং একটি স্বপ্নকে বাঙালির জন্য যিনি বাস্তবে অনুবাদ করেছেন, এই বাংলার মাটিতে তাকে এবং তার স্বজনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে এ হত্যার বিচার রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘কবিগুরু’ আপনি এসে দেখে যান, আমার বাঙালি মানুষ হয়েছে।’ মানুষ হওয়ার জন্য বাঙালিকে আর কত রক্ত দিতে হবে?
 লেখক : কবি ও গবেষক, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন

  • [১]