রবিবার দেশব্যাপী পালন করা হয়েছে জাতীয় পাট দিবস। দিবস উপলক্ষে সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে। ‘সোনালী আঁশের সোনার দেশ, পরিবেশ বান্ধব বাংলাদেশ’ শ্লোগানকে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একদা পাটের সমৃদ্ধ উৎপাদনস্থল ছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানী আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট। আদমজী, বাওয়ানীর মত বড় বড় পাটকল ছিল এ দেশে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ১৯৯০ পরবর্তী সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের এই সমৃদ্ধ কৃষি ও শিল্প খাতটি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল। আমাদের দেশে যখন ক্রমাগত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছিল তখন সমান্তরালভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন নতুন পাটকল গড়ে তোলা হয়। কোন্ ব্যবস্থাপত্রের আওতায় তৎকালীন সরকারগুলো এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আমাদের একটি প্রধান সম্ভাবনাময় উৎপাদন খাতকে ধ্বংস করে ফেলেছিলেন তার সদুত্তর কখনও পাওয়া যাবে না। তবে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি যে কম উন্নত দেশে শিল্পের বিকাশ সাধনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং মুক্তবাজারের মূল বিশ্বমোড়লরা দেশে দেশে শিল্পসম্প্রসারণকে ব্যাহত করতে তৎপর থেকেছেন তা আজ দিবালোকের মত সত্য বলে বুঝা যায়। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পাটের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় পাট দিবস পালন এই কর্মসূচীরই অংশ। এবারের প্রতিপাদ্য বিসয়টিও বেশ চমৎকার। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে এখন প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে প্যাকেটিং ও শপিং ব্যাগের ক্ষেত্রে এখন প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের একচ্ছত্র আধিপত্য। প্লাস্টিক অপচনশীল ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। একসময় প্লাস্টিক ব্যাগের উৎপাদন ও বিপণন সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহারের আধিপত্য এখনও চলমান। সচেতন মহলের সতর্কবার্তা সত্বেও ক্ষতিকারক প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারের জায়গা থেকে সরে আসা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসাবে পাটজাত ব্যাগকে প্রতিস্থাপিত করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। নীতিনির্ধারকরা উপযুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করলে প্লাস্টিক ব্যাগ ও প্যাকেটের বহুমুখী ব্যবহারের প্রসার ঘটানো যেতে পারে।
বস্তা ও শপিং ব্যাগের বাইরেও পাটের আরও বহু ব্যবহারের ক্ষেত্র রয়েছে। পাট ব্যবহার করে যেমন উন্নতমানের কার্পেট, ওয়ালম্যাট, জায়নামাজ, কাপড় তৈরি করা যায় তেমনি ফ্যাশনেবল জুতা, শোপিস তৈরিতেও পাটের ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির চিপস তৈরির জন্যও পাটের ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। পাটগাছের কোন কিছুই ফেলনা নয়। পাটকাঠি দিয়ে কাগজ প্রস্তুতের সুযোগ রয়েছে। এমন আরও বহু জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে পাট হতে পারে সোনালী সম্ভাবনার আরেক নাম।
যেকোন দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য থাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে জনজীবনে টেকসইভাবে প্রযুক্ত করা। জাতীয় পাট দিবস পালনের মধ্য দিয়ে সরকার পাটের উৎপাদন বাড়ানো, পাটজাত দ্রব্যাদির বহুমুখী উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো, এর আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করা; ইত্যাদি বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলÑ দিবস পালনের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে পাট ও পাটজাত দ্রব্যাদির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে এখনও আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। নতুবা অন্তত প্লাস্টিক শপিং ব্যাগকে বাজার থেকে তাড়ানো সম্ভব হত। আমরা চাই দিবসের তাৎপর্য যাতে পুরো বছর ধরেই সকলের চিন্তা ও কাজের মধ্যে প্রবাহমান থাকে। আমরা সেই দেশ যে দেশ পাটের জিনম সিকোয়েন্সিং করে পাটের জীবনরহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি। এই বৈজ্ঞানিক গবেষণা পাটের উন্নত জাত আবিষ্কারের জন্য সহায়ক। আমরা তাই চাই দেশে পাটের পুরনো সোনালী ঐশ্বর্য আবার ফিরে আসুক। তৈরি পোশাকের সাথে বিশ্ববাজার দাপিয়ে বেড়াক পাটজাত সামগ্রীও।