বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্ত্রী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। ১৯৭৩ সনের ৭ এপ্রিল বসেছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সে হিসাবে গত ৭ এপ্রিল ছিলো এর সুবর্ণজয়ন্ত্রী। এই ঐতিহাসিক দিনে দেয়া রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে সারাংশ করলে যে কথাগুলো বেরিয়ে আসে তা হলো (দৈনিক সমকালের উদ্ধৃতি অনুসারে) – ১. গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন কখনও সর্বজনীন হতে পারে না, ২. গণতন্ত্র আমদানি বা রপ্তানিযোগ্য পণ্য নয়, চর্চার বিষয়, ৩. আগামীতে আইন বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তি সংসদের বাইরে থেকে আনতে হবে, ৪. রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও পরমত সহিষ্ণুতার কোনো বিকল্প নেই, ৫. অসাংবিধানিক শক্তির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ নেই। এই বক্তব্যগুলোর যথার্থতা আমরা বর্তমান বাংলাদেশ ও জাতীয় সংসদের অবস্থা দেখলে বেশ বুঝতে পারি। উন্নয়ন কেবল বস্তুগত অগ্রগতি নয় বরং এর একটি মনোজাগতিক উৎকর্ষতারও দিক আছে। এই জায়গায় দেশের মূল নীতির প্রতি মান্যতা ও আনুগত্য পোষণ স্বাপেক্ষে সকল মত ও পথের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হয়। সকলকেই গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ দিতে হয়। দুঃখের বিষয় হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দুই বছর আগে অতিক্রান্ত হলেও আমরা এখনও রাজনৈতিক জায়গায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। সাংঘাতিক বৈরি সম্পর্কের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে থাকে আমাদের রাজনৈতিক ধারাগুলো। কিছু অনুপক্ষেণীয় ঐতিহাসিক ঘটনাপুঞ্জের প্রতি সকল রাজনৈতিক দলের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে এই বৈরিতার উদ্ভব। এর ভিতর রয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৯৭৫ সনের নির্মম হত্যাকা-, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি বৈসাদৃশ্য দৃষ্টিভঙ্গি, অসাম্প্রদায়িক নীতির প্রতি দ্ব্যর্থহীনতার অভাব, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন, অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকে গণমুখী ও সুষম করার পরিবর্তে গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা প্রভৃতি অন্যতম। বলাবাহুল্য সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার একটি পরিবেশ বজায় রাখা গেলে এসব বিষয়েও দূরত্ব হ্রাস পেত। একইসাথে সাধারণভাবে চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠা হত। জাতীয় মৌলিক বিষয়াবলীর প্রতি প্রধান রাজনৈতিক দল সমূহের এতো বিপরীতমুখী অবস্থান পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়।
গণতান্ত্রিক চর্চার দূর্বলতার সাথে রাষ্ট্রপতি কথিত অপরাপর বক্তব্যগুলোও সরাসরি সম্পর্কিত। আজকাল জাতীয় সংসদে সেরকম বিতর্ক দেখা যায় না। জাতীয় সংসদে দেশের ও বিদেশের সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষণ, নতুন আইন প্রণয়ন কালে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা, বিভিন্ন দেশের রোলিংস ও দৃষ্টান্ত উপস্থাপন, বৃদ্ধিদীপ্ত হিউমার; প্রভৃতির বড়ই অভাব দেখি আমরা। এর কারণ চর্চার অনভ্যাস, অনিচ্ছা। রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গায় রাখা সম্ভব হলে এমন ঘাটতি তৈরি হত না। ক্ষমতাকেন্দ্রে অসাংবিধানিক বা অনভিপ্রেত শক্তির উদ্ভবও ঘটে গণতান্ত্রিক চর্চার দূর্বলতা থেকেই। গণতন্ত্র এমন এক সংস্কৃতি যা জাতীয় বৈশিষ্ট্য, অবস্থা, সংস্কৃতি ও পরম্পরা দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারে। এর মূল হলো জনকল্যাণ নিশ্চিত করা, বৈষম্যহীন ব্যবস্থা কায়েম, মানুষকে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করা তথা সকল ক্ষেত্রে সুষম জাতীয় বিকাশের পথ উন্মুক্ত রাখা। আজকাল মুক্তচিন্তার পক্ষে কথা বলতে গেলে বহু পক্ষ বিরক্ত হয়। নিকট অতীতে মুক্তচিন্তার কারণে কিছু মানুষকে নিহত হতে দেখেছি আমরা। এরকম বাংলাদেশের চিন্তা করে আমাদের পূর্বপুরূষরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি নানাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটলেও গণতন্ত্র চর্চার জায়গায় যে আমরা পিছিয়ে আছি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন অবশ্যই আমাদের এদিকে মনোযোগী হতে হবে। এজন্য দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও শক্তির জাতীয় স্বার্থে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা একান্ত আবশ্যক।
আসুন সকলে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে মননে ধারণ করে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গঠনে একযোগে কাজ করি।