পাহাড় বেয়ে জাদুকাটা নদীতে নেমে আসা বালু উত্তোলন নিয়ে শুক্রবার তাহিরপুর উপজেলা সদর পক্ষে বিপক্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো। এক পক্ষ বিক্ষোভ মিছিল করে বালু তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। অপর পক্ষটি বোমা মেশিন দিয়ে বালু তোলার কারণে জনবসতি হুমকির মুখে পড়েছে দাবি করে বালু তোলার বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছেন। সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসকের নিকট প্রেরিত একটি অনুরোধপত্রে ছোট আকারের বোমা মেশিন (সেভ মেশিন) দিয়ে বালু তোলার কারণে জাদুকাটা তীরবর্তী গ্রামগুলো ব্যাপক ভাঙনের মুখে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে সেভ মেশিন দিয়ে বালু তোলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। শুক্রবার তাহিরপুর উপজেলা সদরে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে একটি পক্ষের ক্ষোভের মুখে পড়ার কারণ এই অনুরোধপত্র। আমরা জানি জাদুকাটা নদীর বালুর উপর কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। বংশ পরম্পরায় এরা সনাতন পদ্ধতিতে যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই বালু উত্তোলন করে আসছিলেন। কয়েক দশক ধরে বালু উত্তোলনে পরিবেশগ্রাসী বোমা মেশিনের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর মূলত সনাতন পদ্ধতিতে বালু উঠানোর চিরাচরিত পদ্ধতিটি বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা এই বালুর উপর সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার বিলুপ্তির সূচনাও তখন থেকেই। বোমা মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত থাকে প্রভাবশালী মানুষ। এদের প্রভাবের কাছে সাধারণ মানুষ অসহায়। যুগ যুগ ধরে বালুর উপর নির্ভরশীল শ্রমজীবীরা তাদের জীবিকা হারিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হয়েছেন। তাহিরপুর উপজেলা সদরে বালু তোলার পক্ষে যারা বিক্ষোভ করেছেন কিংবা যারা বালু তোলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেছেন তারা আসলে কী চান সংবাদপত্রের খবরে সেটি পরিস্কার হয়নি। এখানে বিষয় দুইটি। একটি হলো সনাতনী পদ্ধতিতে শ্রমজীবীদের বালু তোলা আরেকটি হলো সেভ মেশিন বা বোমা মেশিন ব্যবহার করে বালু তোলা। পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থানকারীদের এখন স্পষ্ট করতে হবে তারা আসলে কী চান। আমাদের কাছে মনে হয় সনাতন পদ্ধতিতে বালু তোলার বিরোধিতা কেউই করবেন না। এই প্রক্রিয়ায় বালু তোলা হলে কখনও কোনো জনবসতি হুমকির মুখে পড়বে না। যে বালু তোলা হবে প্রাকৃতিকভাবেই সেটি আবার ভরাট হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়ায় বালু তোলার সুযোগ বাধাহীন করা হলে একদিকে যেমন কয়েক হাজার শ্রমজীবী পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তা তৈরি হবে তেমনি কখনও বালুর সঞ্চিতি হ্রাস পাবে না।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বোমা মেশিন বা সেভ মেশিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে যে অনুরোধপত্র লিখেছেন পরিবেশ সুরক্ষার বিবেচনায় আমরা সেটিকে সমর্থন করি। বালু পাথর উত্তোলনে এই ধরনের বোমা মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। বোমা মেশিনের ব্যবহার বন্ধ করে এবং বালুমহাল ইজারা দেয়ার তথাকথিত ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এখানে বরং সরকারিভাবে রয়েলটি আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেকোনো রূপে ইজারা প্রথায় গেলেই প্রভাবশালীদের কাছে শ্রমজীবীরা অসহায় হয়ে পড়বেন। ইজারা প্রথা থাকলে স্বল্পসময়ে অধিক মুনাফার আশায় বোমা মেশিন থাকবে, বাল্কহেড নৌকা থাকবে। আর ইজারা প্রথার অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণে বারকি শ্রমিকদের নিকট থেকে নৌকা পিছু রয়েলটি আদায় করা হলে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবন থেকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও কেটে যাবে। এতে সরকারি রাজস্ব আদায়েরও কোনো ক্ষতি হবে না। প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত সম্পদকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়া কখনও কাম্য নয়।
আমরা আশা করি সরকার জাদুকাটা নদীতে যেকোনো ধরনের বোমা মেশিনের ব্যবহার কঠোরভাবে বন্ধ করে শ্রমজীবী মানুষদের সনাতনী পদ্ধতিতে বালু তোলার সুযোগ করে দিয়ে গণস্বার্থ সংরক্ষণ করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিবেন।