আকবর হোসেন ও হাবিবুর রহমান, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে কৃষকদের ভাগ্য নিয়ে প্রতারণা করছেন উপজেলা খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) মোহাম্মদ সেলিম হায়দার। এবার ব্যাপক ফসল হানির পর সরকার কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি প্রতি কেজি ২৩ টাকা করে কৃষক প্রতি সর্ব্বোচ ৩ হাজার কেজি করে ১৪% আদ্রতাবিশিষ্ট ধান সংগ্রহ করার কথা। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে আঁতাত করে কৃষকদের সাথে প্রতারণা করছেন সরকারি এই কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে কৃষক বান্ধব সরকারি কর্মসূচীকে এই কর্মকতা ভূলুণ্ঠিত করে ইতোমধ্যে কৃষকের দুশমনে পরিণত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
ওসি এলএসডি স্থানীয় কয়েকজন মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের দিয়ে দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের কৃষি কার্ড ৫ শত, কোন কোন কার্ড ৮শত টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় ক্রয় করছেন। এমনকি কৃষকদের ব্যাংক একাউন্টের চেক বইয়ের খালি পাতায় স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছেন। কৃষকদের স্বাক্ষরিত কার্ডগুলো ওসি এলএসডির কাছে জমা রেখে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পরে একাধিক কার্ড একত্র করে বিলের জন্য ব্যাংকে পাঠাচ্ছেন। এই বিষয়গুলি নিয়ে স্থানীয় সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের সাথে ওসি এলএসডির মতদ্বৈততা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওসি এলএসডি মো. সেলিম হায়দার পাশ্ববর্তী উপজেলা তাহিরপুরের বাসিন্দা। তিনি তার এলাকার বাসিন্দা বর্তমানের জামালগঞ্জের ব্যবসায়ীসহ একাধিক সিন্ডিকেটের সাথে গোপন চুক্তি করে ধান ক্রয় করছেন। প্রতি টনে ৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায় করে নিচ্ছেন তিনি।
ওসি এলএসডির কথা ব্যাংকের কর্মকর্তারা না শোনায় তিনি ব্যাংকের উপর নাখোশ রয়েছেন বলে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অবশ্য জেলা খাদ্য কর্মকর্তা এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিবেন বলে জানিয়েছেন
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বেহেলী ইউনিয়নে ১৭৬ জন কৃষক, জামালগঞ্জ সদরে ৮৬২ জন কৃষক, ফেনারবাঁকে ৩১৭ জন কৃষক, সাচনা বাজারে ১৩৩ জন কৃষক, ভীমখালীতে ১৮১ জন সহ মোট ১৬৭০ জন কৃষকের তালিকা খাদ্য বিভাগে দাখিল করা হয়েছে। তালিকা প্রাপ্তির পর ওসি এলএসডি ব্যবসায়ীদের সাথে গোপন সমঝোতা করে নানা কায়দায় প্রতারণা শুরু করেছেন ।
উপজেলা খাদ্য গোদামে সরেজমিনে মঙ্গলবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, ফেনারবাঁকের রামপুর গ্রামের কৃষক তাজ উদ্দিন ৭ দিন ধরে ধান নিয়ে লাইনে আছেন। আজ নিবেন তো কাল নিবেন বলে সময় ক্ষেপণ করছেন এই খাদ্য কর্মকর্তা। একই ভাবে জামালগঞ্জ সদরের দক্ষিণ কামলাবাজের কৃষক আম্বর আলীও ৮ দিন ধরে খাদ্য গোদামের সামনের রাস্তায় ধান নিয়ে আছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনিও ধান বিক্রি করতে পারেননি।
শুধু তাজ উদ্দিন আর আম্বও আলী নয়,কৃষক চান মিয়া, মফিজ উদ্দিন, শুক্কুর আলী, আশ্রব আলী, ফরিদ মিয়া, কালাগাজী, ছমির মিয়া, আব্দুল কুদ্দুছ সহ প্রায় ৩৫ জন কৃষককে ধান নেওয়ার কথা বলে সময় ক্ষেপণ করছেন।
অপর দিকে খাদ্য গোদামের নদীর ঘাটে জনৈক মিল মালিক আব্দুর রহিম, ব্যবসায়ী আবুল কালামসহ আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীর নৌকা ভর্তি ধান দেখা গেছে গোদাম এলাকায়। কৃষকদের ধান ছাড়া মিল মালিক ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের ধান ঠিকই নেওয়া হচ্ছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন।
কৃষকদের কৃষি কার্ড ও ব্যাংকের চেক বই ওসি এলএসডির কাছে জমা রাখার বিষয়টি এখন জামালগঞ্জের আলোচিত বিষয়। ওসি এলএসডির টেবিলে কৃষক নাসির, রমজান আলীসহ ১৩ জনের স্বাক্ষরিত চেক পড়ে থাকতে দেখা গেছে। গণমাধ্যমকর্মীরা চেকগুলো দেখার জন্য বললে ওসি এলএসডি দ্রুত চেকগুলো সরিয়ে ফেলেন। গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় অনেক কৃষকের চেক বই উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে কৃষকদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বস্থ করেন।
সরকারী হিসেবে ৫ই মে থেকে ধান ক্রয়ের কথা থাকলেও ২২ মে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধান ক্রয়ের কাজ আরম্ভ করেন এই কর্মকর্তা। ধান ক্রয়ের ৩৮ দিন অতিবাহিত হলেও জামালগঞ্জের ৩৫৫৩ টনের বিপরীতে মাত্র ২৫৫ টন ধান ক্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
উপজেলা খাদ্য গোদামের সামনে ৫ ইউনিয়নের ধান নিয়ে অপেক্ষমাণ একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, কৃষকদের ধান দেখলেই ওসি এলএসডি ও গোদামের লোকজন নয় ছয় শুরু করেন। ধানের গুণগতমান ও আদ্রতা কম দেখিয়ে ধানগুলো ফেরত দেন। অপরদিকে ওসি এলএসডির সাথে চুক্তিরত ব্যবসায়ীদের ধান সেই ফাঁকে ঠিকই ক্রয় করছেন।
কৃষি ব্যাংক জামালগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মিঠুন চৌধুরী জানিয়েছেন,ওসি এলএসডি একজন কৃষকের একাউন্টে টাকা না দিয়ে তার ব্যবসায়িক সঞ্চয়ী হিসাবে ৬৯ হাজার টাকা জমা দেওয়ায় আমি তা জব্দ করে রেখেছি।
সোনালী ব্যাংক জামালগঞ্জের ব্যবস্থাপক মিলন কুমার সাহা জানান,খাদ্য গোদামের পেমেন্ট নিয়ে প্রথম থেকেই আমার সাথে ওসি এলএসডির মতপার্থক্য দেখা দেয়। আমি নিয়মের বাইরে কোন পেমেন্ট দেবনা বলে জানিয়ে দিয়েছি। যার যার বিল তার হাতেই আমি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
এ বিষয়ে ওসি এলএসডি মোহাম্মদ সেলিম হায়দার জানান, এই বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই। সরকার আমাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেন নাই। আপনারা তো দেখতেছেন, এত লেইখ্যা লাভ নাই। আপনারা আসেন আমার এই খানে চা খেয়ে যান, আর আপনাদের কোন কথা থাকলে আমাকে বলে যান।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা জানান, স্বচ্ছতার জন্য কৃষি কার্ড ও ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে ধান ক্রয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে যদি এই সমস্ত অনিয়ম হয় তাহলে সেটা দু:খজনক। কৃষকদের চেক বইয়ের পাতা ওসি এলএসডির কাছে থাকার কথা নয়,বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবুৃ নাঈম মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,‘ সরকার কৃষকদের জন্য অত্যন্ত আন্তরিক। কৃষককে প্রাধান্য দিয়েই কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ধান নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে টাকা পরিশাধ করা হচ্ছে, কোন অবস্থাতেই ওসি এলএসডির কাছে চেক থাকার কথা নয়। এই বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।