- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জামালগঞ্জে অমৎস্যজীবীদের দখলে মৎস্যজীবী সমিতি

আকবর হোসেন, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে অমৎস্যজীবীরা দখল করে আছেন মৎস্যজীবি সমিতিগুলো। অমৎস্যজীবিদের কারণে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা সরকার প্রদত্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বঞ্চিত হচ্ছে জলমহালের ইজারা থেকেও। অবশ্য বার বার মৎস্যজীবীদের পক্ষ থেকে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা যাচাই বাছাইয়ের আবেদন করেও তারা সমিতিভুক্ত হতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
গেল কয়েক মাস আগে জামালগঞ্জে মৎস্যজীবিদের নিবন্ধন ও তালিকাভুক্তির কাজ হলেও এমন অনেকেই আছেন যাদের নাম কোন তালিকায় নেই অথচ তারা মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। শুধু তাই নয় বালু পাথর ব্যবসায়ী, কয়লা ব্যবসায়ী, ঠিকাদার বা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত অনেকেই মৎস্যজীবী সমিতির দায়িত্বে আছেন। এমনকি মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন ক্ষমতাসীন দল আ.লীগ ও বিএনপির নেতারা।
উপজেলা সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষের দাবী মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রত্যায়ন পেলে আমরা সমিতির নিবন্ধন করি। আর মৎস্য বিভাগ বলছে অতীতে অমৎস্যজীবীদের নিয়ে সমিতি হলে তার প্রতিকার আছে। উপজেলা যাচাই বাছাই কমিটি যাচাই করে ব্যবস্থা নিবে। প্রকৃত মৎস্যজীবিরা বলছে আমরা সবগুলো অমৎস্যজীবি সমিতির নিবন্ধন বাতিল চাই।
উপজেলা সমবায় ও মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়,জামালগঞ্জ উপজেলায় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সংখ্যা ৫৬ টি। আর তালিকাভুক্ত মৎস্যজীবি ৮৭৫২ জন। ৮০৯ জন মৎস্যজীবির তালিকাভুক্তির আবেদন পক্রিয়াধীন আছে।  
জানা যায়, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়ন পত্র নেওয়ার পর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি গঠনের পক্রিয়া শুরু হয়। নিদিষ্ট নিয়ম কানুনের মধ্যে যাচাই বাছাই করা হয়ে থাকে। হাওর বিল অধ্যুষিত জামালগঞ্জ উপজেলা। এই উপজেলার ৩৩৮ বর্গ কিমিটারের ভিতরে রয়েছে ছোট বড় মিলিয়ে ৯৫টি জলমহাল । ২০ একরের নিচের জলমহালের জন্য এক নিয়ম আর উপরের গুলোর জন্য অন্য নিয়ম। বড় জলমহালের উন্নয়ন স্কীমের কার্যক্রম ভুমি মন্ত্রণালয়ের মতামতে জেলা প্রশাসক ইজারা দিয়ে থাকেন। আর ছোট জলমহালগুলো জেলা ও উপজেলায় সমিতির মাধ্যমে টেন্ডার হয়ে থাকে। এই কারণেই জলমহাল পাবার জন্য   
সমিতি করতে তোরজোর শুরু হয়। সরেজমিনে হাওর পাড়ের কয়েকটি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির কার্য এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
বেহেলী ইউনিয়নের হরিনাকান্দি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি সারোয়ার হোসেন। তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বেহেলী ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। বেহেলীর ইসলামপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি রইছ উদ্দিন। তিনিও মৎস্যজীবি নন, ব্যবসায়ী।
ফেনারবাঁকের উত্তর লক্ষীপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রানা। তিনিও প্রকৃত মৎস্যজীবি নন, তিনি ফেনারবাঁকের বর্তমান ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। এই সমিতির সম্পাদক আ: মোহাইমিন তালুকদার শিপনও ব্যবসায়ী। কামারগাঁও লক্ষীপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি ছালেক মিয়া,সাধারণ সম্পাদক গোলাম সাকলাইন দীপক তারাও প্রকৃত মৎস্যজীবি নন। তারা ব্যবসার সাথে জড়িত।  ফেনারবাঁকের শরীফপুর একতা মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি মফিজুর রহমান মৎস্যজীবি নন। মাতারগাঁও মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি উৎপল তালুকদার নিজে সাচনা বাজারের ব্যবসায়ী। বেহেলীর মাহমুদপুর মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি জিয়াউর রহমান প্রকৃত মৎস্যজীবিও হলেও সম্পাদক ইজাজুল হক মৎস্যজীবি নন। জামালগঞ্জ সদরের উজান লালপুর মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি এসএম মোর্শেদ মনু, তিনি জামালগঞ্জ, ছাতক, ভোলাগঞ্জের বিশিষ্ট বালু পাথর ব্যবসায়ী। চলতি মৎস্যজীবি নিবন্ধনে তিনি তালিকাভুক্ত নন। জামালগঞ্জ সদরের পূর্ব লক্ষীপুর কেওয়ালী কোনা মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার সাজিব, তার পিতা জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম তালুকদার ঝুনু মিয়া। তিনি ঠিকাদারী ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসার সাথে জড়িত। চলতি মৎস্যজীবি নিবন্ধনে উনার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সাচনা বাজারের নুরপুর মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি অখিল মিয়া, সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক পাঠান। তারা মৎস্যজীবি নন, তারা খেয়া ঘাটের ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসার সাথে জড়িত।
ফেনারবাঁকের উত্তর লক্ষীপুরের সভাপতি ও বর্তমান ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম রানা বলেন,‘আমি আগে মৎস্যজীবি ছিলাম না। বর্তমানে আমার আইডি কার্ড আছে। এখন আমি মৎস্যজীবি।
উজান লালপুর মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতি এসএম মোর্শেদ মনু বলেন,‘ আমরা মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের (মাইমল) অরজিনাল মানুষ। আমাদের মৎস্যজীবিদের কাজ এখন অন্যেরা নিয়ে যাচ্ছে। আমি সমিতির সভাপতি হলেও আমি বালু পাথরের ব্যবসার সাথে জড়িত।’
পূর্ব লক্ষীপুর কেওয়ালী কোনা মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার সাজিব বলেন,‘আমরাই প্রকৃত মৎস্যজীবি সম্প্রদায়ের লোক। আমাদেরই বেশী অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।’
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন,‘অমৎস্যজীবিদের দ্বারা যদি অতীতে মৎস্যজীবি সমিতি করা হয়ে থাকে তাহলে উপজেলা কমিটির মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে বাতিলের জন্য সুপারিশ করে ঢাকায় পাঠানো হবে। তথ্যে মিথ্যা প্রমাণিত হলে সমিতি বাতিল ও জলমহাল ইজারা বাতিল হয়ে যাবে।’  
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আবু তাহের বলেন,‘আমরা শুধু রেজিষ্ট্রেশনের কাজ করে থাকি। মৎস্যবিভাগ যাদেরকে মৎস্যজীবি হিসেবে প্রত্যায়ন করবে আমরা তাদেরকে দিয়ে সমিতি গঠন করে থাকি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি টিটন খীসা বলেন,‘ মৎস্য ও সমবায় আইনে যেভাবে বলা আছে সমিতি নিবন্ধনের সময় এর ব্যতিক্রম ঘটলে সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও জলমহাল ইজারা বাতিলের জন্য সুপারিশ করা হবে।’  

  • [১]