বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
বছর দুয়েক আগে ঢাকা-খুলনা-বরিশাল নৌরুটে কারগো জাহাজ চালাতেন জামালগঞ্জের ভীমখালী ইউনিয়নের ছোট ঘাগটিয়া গ্রামের মৎস্য চাষী মো. রুবেল মিয়া। দীর্ঘদিনের চাকরি বাদ দিয়ে বাড়িতে ফিরে মাছ চাষে আগ্রহী হন তিনি। কর্মসংস্থান হিসেবে বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে মাছ চাষের কাজ বেছে নিলেও সাম্প্রতিক বন্যা তাঁর সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এতে সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এই মৎস্য চাষী।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রুবেল মিয়া বলেন, ‘২৫ বছরের জাহাজ চালানোর চাকরি জীবন বাদ দিয়া বাড়িতে আইসা পুকুরে মাছ চাষ শুরু করছিলাম। বন্যা সব ভাসাইয়া নিয়া গেছে। নিজের শ্রম-টমের হিসাব বাদ দিলে আনুমানিক আড়াই থাইক্যা তিন লাখ টাকার ক্ষতি হইছে। এইডা খালি চালান খরচ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাল-চামানা বাদে পুকুর পারের অন্তত ২০০ পেঁপে গাছ হইব নষ্ট হইছে। সবকিছু মিলাইয়া অনেক টাকার ক্ষতি হইছে আমার।’
জামালগঞ্জে বন্যার পানিতে মৎস্য খাতের মতো প্রাণী ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ তিন খাতে অন্তত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্ব-স্ব অধিদপ্তর। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বন্যায় মৎস্য, প্রাণী ও কৃষি মিলে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ওপরে। আর্থিক দিক থেকে এ তিন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। চোখের পলকে পানি বাড়তে থাকায় পুকুরে চাষকৃত প্রায় ২০ কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
গত এপ্রিলে হাওরডুবে প্রথম দফা ক্ষতি হয়েছে কৃষকের। এবার আউশ ও সব্জিসহ গোলার ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে কৃষক আরেক দফা ক্ষতির মুখে পতিত হয়েছে। গোলাজাত ধান বাদ দিলে কৃষকের আউশ ও সব্জিতেই কেবল ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকারও বেশি। আউশ ও সব্জিতে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারলেও মাচার ধান ভিজে নষ্ট হওয়ার হিসাব নিরূপণ করতে পারেনি কৃষি অধিদপ্তর। এছাড়া হাঁস, মুরগী ও গরুর খামার ভেসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন খামারীরা। যাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় কোটি টাকার মতো। বন্যায় প্রাণী সম্পদের অনেক ক্ষতি হলেও ক্ষতিপূরণ চেয়ে কেউ আবেদন করেনি বলে জানিয়েছে প্রাণী সম্পদ কার্যালয়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ৬টি ইউনিয়নে ৭২ হেক্টর আয়তনের ৪৫০টি পুকুর পানিতে তলিয়েছে। যাতে ৭৭৭ মেট্রিক টন মাছ ও ৭৫ লাখ পোনা পানিতে ভেসে গেছে। মাছ ও পোনা মিলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে বড় মাছ ১৫ কোটি ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, পোনা মাছে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকাসহ অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে ১০ লাখ টাকা, এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে মৎস্য অধিদপ্তর।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, জামালগঞ্জে ১৩৬ হেক্টর আবাদি সব্জি ক্ষেতের মধ্যে ৯৮ হেক্টর সব্জি বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। ডুবোকৃত সব্জির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৭২ মেট্রিক টন। উপজেলার প্রায় সাড়ে ৪ হাজার সব্জি চাষী বন্যায় কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এছাড়া আবাদকৃত ২৫ হেক্টর আউশ ধানের পুরোটাই বানের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩৭৫ জন কৃষক। তলানো আউশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ টন চাল। যার আর্থিক ক্ষতি ২০ লাখ টাকা।
উপজেলা প্রাণী সম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বন্যায় গবাদি পশুসহ হাঁস ও মুরগীর খামারীরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সারা উপজেলায় ৫৭টি গরু, ১২৭টি ছাগল, ১৯৫টি ভেড়া, ২ হাজার ২০০টি হাঁস ও ৭ হাজার মুরগী বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এর মধ্যে কিছু কিছু মরে ভেসে উঠেছে, কিছু পাওয়া গেছে আর কিছু পাওয়া যায়নি। এতে প্রায় ৯০ লাখ টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কোন খামারী ক্ষতির পরিমাণ জানিয়ে কোনকিছু প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ে জমা দেন নি। যে কারণে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোন হিসাব মেলাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। আনুমানিক যতটুকু হিসাব করা হয়েছে সেটুকুও বিভিন্নভাবে খোঁজ-খবর নিয়ে করা হয়েছে বলে জানায় প্রাণী সম্পদ কার্যালয়।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের নয়াহালট গ্রামের খামারী মো. মান্না মিয়া বলেন, আমার ৪টি মুরগীর খামারের মধ্যে ২টি খামার পানিতে ডুইব্যা যায়। এই খামারে প্রায় ৩ হাজার মুরগী আছিল। এর মাঝে অর্ধেকটিই মইরা গেছে। এছাড়া আমার একটা পুকুর তলাইয়া মাছ সব ভাইস্যা গেছে। সবকিছু মিলাইয়া প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হইছে। তবে এখন পর্যন্ত কারও কাছে কোন আবেদন করিনি, দু’একদিনের মধ্যে একটি দরখাস্ত করব।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনন্দা রানী মোদক বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারিভাবে আমাদের কিছু দেওয়া হয়নি। তবে এডিপির টাকায় কিছু চুন ও সার দেওয়া হয়েছে। সামনে মৎস্য সপ্তাহ আছে সে সময় পোনা দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি। যদি কিছু আসে তখন সবাইকে দেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, আউশ ও সব্জি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নিয়মিত যে প্রণোদনা আছে সেগুলো তো দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে আরও আসবে সেগুলোও দেওয়া হবে।