- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জামালগঞ্জে শঙ্কা নিয়েই ধান কাটছে কৃষক

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
জামালগঞ্জে ফসল রক্ষায় বাঁধে বাঁধে মরণপণ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এতে দিনরাত কাজ করছেন উপজেলা ও জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে পাউবো, পিআইসিসহ স্থানীয় কৃষকেরা। এ প্রচেষ্টার ফলে এখনও অক্ষত আছে উপজেলার ছোট—বড় ৬টি হাওরের ২৪ হাজার হেক্টর বোরো জমি। তবে হালি হাওরের হেরাকান্দি বাঁধ, মহালিয়া হাওরের হিজলা গ্রাম সংলগ্ন বাঁধ ও পাগনা হাওরের বৌগলাখালি ক্লোজার এখনও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও বাঁধ রক্ষায় কৃষকসহ সকলে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তারপরও শঙ্কামুক্ত নন হাওর পারের মানুষ। শঙ্কা নিয়েই পাকা—আধাপাকা ধান দেদারছে কাটছে কৃষক।
পাহাড়ী ঢলে একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ার খবরে জামালগঞ্জের হাওর পারেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্বস্তির বিষয়ে হচ্ছে এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত কোন হাওর তলিয়ে যায়নি। এ পর্যন্ত জেলার ছোট—বড় ১৭টি হাওরের ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জামালগঞ্জের হাওর সুরক্ষিত আছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উজান থেকে নেমে আসা ঢলে প্রথম দফা ঝুঁকিতে পড়ে এখানকার হাওর। পরে সকলের প্রচেষ্টায় ঝুঁকি অনেকটা কাটিয়ে উঠলেও দ্বিতীয় দফায় পানি বাড়ার সাথে সাথে হাওর পারে ফের দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে বাঁধ রক্ষা করবেন না ধান কাটবেন, এ নিয়ে উভয় সঙ্কটে পড়েছেন কৃষক। সবকিছু মিলে হাওর পারের দুশ্চিন্তা যেন কাটছে না।
জানা যায়, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়। এতে নদনদীর পানি বেড়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে জানায় সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সে অনুযায়ী গত কয়েকদিনে নদীর পানি বাড়তে থাকে। এতে কৃষকের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরই মাঝে মহালিয়া হাওরের ৭ ও ৮ নম্বর পিআইসি এবং হালি হাওরের আছানপুর গ্রামের উত্তর দিকের হেরাকান্দি বাঁধ প্রচণ্ড ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষ করে মহালিয়া হাওরের হিজলা গ্রামের পূর্বদিকের বাঁধের সুরঙ্গপথ ছঁুয়ে পানি ঢোকার গতি বৃদ্ধি পেতে থাকলে প্রশাসন ও কৃষকের ২৪ ঘন্টার (দিনরাত) জোর প্রচেষ্টায় সে গতি থামানো সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, হালি হাওরের হেরাকান্দি বাঁধেও ফাটল দেখা দিয়েছে। অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধ রক্ষায় এক্সেভেটর দিয়ে মাটি ফেলা হচ্ছে। তবে বাঁধের গোড়ায় বলগেট দিয়ে বালু না ফেললে এ বাঁধ রক্ষা করা যাবে না বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এছাড়া অন্যান্য বাঁধেও ছোট—বড় অনেক সমস্যা রয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাত হলে এ বাঁধগুলোতেও বিপদের আশঙ্কা করছেন কৃষক। অপরদিকে, গত রবিবার পাগনা হাওরের গজারিয়া অংশের স্লুইচ গেইটের কপাট পানির চাপে ভেঙ্গে গিয়ে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। পরে উপজেলা প্রশাসন স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে প্রায় ৪ হাজার বস্তা ফেলে সেই জলকপাট নিয়ন্ত্রণে আনে। এখন পর্যন্ত সেটি শঙ্কামুক্ত আছে বলে জানা গেছে।
বেহেলী ইউনিয়নের মহালিয়া হাওর পারের কৃষক ও ২নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য দেবাশীষ তালুকদার বলেন, মহাইল্যা হাওরের (৮ নম্বর পিআইসি) এই বাঁধের তিনডা বুরুঙ্গা বন্ধ করা হইছে। আমরা রাইতদিন এইখানে আছলাম। ইউএনও স্যার, ডিসি স্যারও এই বান্দে আছলাইন। লাস্টে আমরা ডিসিসন নিছি যে ইউএনও আর ডিসি স্যার যাই কোউক (বলুক) আমরা মানতাম না, আমরা একবারে খেড় (খড়) দিয়া, আমরার যে অপারেশন, এই অপারেশন কইরা আমরা সাকসেসফুল হইছি। খুব কষ্ট কইরা পানি আটকানি হইছে।
তিনি আরও বলেন, মহাইল্যা হাওরে ধান কাডা চলতাছে। অলরেডি ছয় আনা ধান কাডা হইয়া গেছেগা। ধান পাকছে, আধা পাকনাও আছে, তারপরও কাডন লাগতাছে। মহাইল্যা হাওরের ৭ নম্বর, ৮ নম্বর দুইডা বাঁধই ঝুঁকিপূর্ণ। হাম্মকখালি থাইক্যা নওয়াপাড়া আর নওয়াপাড়া থাইক্যা হিজলা পর্যন্ত। ইউএনও মহোদয় সারা রাইত মহাইল্যা বাঁধে আছলাইন, আমরারে যথেষ্ট সহযোগিতা করতাছেন। কিন্তু সরকারি সহযোগিতা আমরার আরও প্রয়োজন।
হালি হাওরের হেরাকান্দি বাঁধ নিয়ে পার্শ্ববর্তী আছানপুর গ্রামের কৃষক মো. সাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে এক্সেভেটর দিয়ে এ বাঁধে মাটি ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এখানে মাটির পাশাপাশি বাঁশের আড় দেওয়া প্রয়োজন। তবে ভবিষ্যতে হালি হাওর রক্ষা করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হাওরের ভেতরের অংশের হেরাকান্দি বাঁধঘেঁষা প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে যে গর্ত আছে সেগুলো ভরাট করা। বর্তমানে যে জায়গাটাতে মাটি ফেলা হচ্ছে সেখানে জরুরী ভিত্তিতে বলগেট দিয়ে বালু ফেলানো দরকার। না হলে এ বেড়িবাঁধ রক্ষা করা যাবে না। এ বাঁধ পুরোপুরিই ঝুঁকিতে আছে। তবে শুধু হেরাকান্দি নয়, হাওরের যে বাঁধগুলোতে ফাটল কিংবা ধসে পড়ছে সবগুলোতে কাজ করতে হবে।
পাগনা হাওর নিয়ে উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, গত রবিবার গজারিয়া স্লুইচ গেইট দিয়ে পানি ঢোকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে রাতঅবধি কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করেছে। সেখানে ৩—৪ হাজার বস্তা ফেলে সেই পথ বন্ধ করা হয়েছে। এখন সেখানে আর ভয় নেই। তবে বৌগলাখালি ক্লোজারের ভেতরের অংশে ধস নেমেছে। এতে প্রশাসন ও পিআইসির নজরদারি আছে। যদি বড় ধরনের ঝড়—বৃষ্টি হয় তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া অন্য বাঁধগুলোতে ঝুঁকি তেমনটা না থাকলেও কাঁকড়া ও ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি ঢোকার ঝুঁকি আছে। এগুলো দেখশোন রাখতে পিআইসিরা বাঁধে নেই। সবকিছু মিলে আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি।
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, হাওরের পরিস্থিতি এখন খুব ভালো। কৃষকরা দিনরাত ধান কাটছেন। গতকাল (সোমবার) পর্যন্ত ২৪ হাজার ৩৮০ হেক্টরের ধানী জমির মধ্যে ৭ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। পুরো হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩১ ভাগ ধান কেটেছে কৃষক। প্রায় ৭৫টি কম্মাইন্ড হারভেস্টার মেশিন হাওরে নামানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, আমি এখন মহালিয়া হাওরে আছি। কৃষকরা দ্রুত ধান কাটছেন। গতকালের (সোমবার) জোর প্রচেষ্টায় মহালিয়ার বিপজ্জনক বাঁধটি বাঁধা হয়েছে। সেখানে ছোট ছোট কিছু গর্ত আছে সেগুলো বাঁধার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে হেরাকান্দি বাঁধেও কাজ চলছে। বলা যায় হাওর এখন অনেকটা শঙ্কামুক্ত।

  • [১]