- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জারলিয়ার পাড়ে শোকের মাতম

বিশেষ প্রতিনিধি ও আবু হানিফ চৌধুরী
দিরাইয়ে জলমহাল দখল নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে নিরীহ ৩ ব্যক্তি। মর্মস্পর্শি এ ঘটনায় উপজেলার গোড়ামারা সাতপাখিয়া প্রকাশিত জারলিয়া নদী জলমহালের আশপাশের দুটি গ্রামে চলছে শোকের মাতম। জলমহালের পাড়ের গ্রাম আখিলনগর ও হাতিয়ার নিহতের ৩ পরিবারের সদস্যরা বুধবার সন্ধ্যায় নিহতদের লাশ দাফন করেছেন। এদিকে, এই ঘটনার পর বিরোধকৃত জলমহালের খলায় থাকা কয়েক’শ জেলে ও ইজারাদারের লোকজন এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। জলমহালের খলায় ও দুই পাড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ও দিরাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে হাওরের দুর্গম এলাকায় জারলিয়া নদী জলমহাল। এই জলমহালটি কাগজে-পত্রে মালিকানা দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির হলেও এর শাসন ও দখল নিয়ে গত ৩ বছর ধরেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুক মিয়াসহ কয়েকজন ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা একরার হোসেনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। গত ৩ বছরে কয়েক দফায় এই জলমহালে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার সকাল ১১ টায় একরার হোসেনের নেতৃত্বে ঐ মহাল দখলে একদল লোক যেতে চাইলে জলমহালের দখলদার ইজারাদার পক্ষ বাধা দেয়। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলাগুলি শুরু হয়। গুলাগুলির সময় ৩ নিরীহ ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান এবং ৪ জন আহত হয়।       
স্থানীয় লোকজন বলেছেন, দুই পক্ষই সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় বিরোধ লেগেই আছে। এই বিরোধের জের ধরেই এমন হৃদয় বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জলমহাল পাড়ের আনন্দনগরের বাসিন্দা রবিন্দ্র দাস বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ করেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি পুর্ব দিক দিয়ে একরার হোসেনসহ বেশ কিছু লোক পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। আমাদের বাড়ী অতিক্রম করার পর অপরদিক থেকে জলমহালের ইজারদারপক্ষের ১০-১২জন অস্ত্রসহ পাড়ে ওঠে। এর পরই গুলাগুলি শুরু হয়। কয়েকটি গুলি আমাদের ঘরের চালে ও বেড়ায় এসে লাগায় আমরা দৌঁড়ে হাওরের দিকে পালাই’।
হাতিয়া গ্রামের নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ইজারদার পক্ষ আনন্দনগর এলাকায় মাছ ধরছিল, এসময় একরার হোসেনসহ কিছু লোক বাধা দিতেই গুলাগুলি শুরু হয়’। তিনি জানান, ঘটনার সময় ইজারাদারের পক্ষে অস্ত্র নিয়ে গুলাগুলি করার সময় মাসুক মিয়া, আব্দুল কাদির আহাদ মিয়া, ইয়াহিয়া চৌধুরীসহ মাথায় হেলমেট পড়া ১০-১২ জন ছিল।bbbbbbbbb
সরেজমিনে বুধবার বিকালে আকিল নগরে পৌছে দেখা যায়, নিহত উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী ও নিহত শাহরুলের মা বিলাপ করে কান্নাকাটি করে বলছেন,‘আমরা নিরীহ মানুষ, আমরাতো জলমহাল দখলে যেতে চাইনি, আমরা মালিকও হতে চাই না, আমাদের জান গেল কেন, আমরা এখন কী নিয়ে বাঁচবো’। এরা দুজনেই বলেন, ‘এরা ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী কাওছার, আঙ্গুরসহ অনেককে দিয়ে গুলি করিয়েছে’।
বিরোধে যুক্ত যুবলীগের দিরাই উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত সহসভাপতি একরার হোসেনকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একরার হোসেন ঘটনার জন্য দিরাই পৌরসভার আ.লীগ নেতা মেয়র মোশারফ মিয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়কে দায়ী করে বলেন,‘এই জলমহালটি ৩ বছর আগে দক্ষিণ নাগের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি উমেশ দাস আমাকে সাব লিজ দিয়েছিলেন। পরে সমিতির কমিটি পরিবর্তন হবার পর ধনঞ্জয় দাস অন্য পক্ষকে দিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করেছেন। এই সংঘর্ষ ও ঝামেলার জন্য দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশারফ মিয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় দায়ী। এর আগে গত দুই বছর তারা আমাদের ডিস্টার্ব করেছিলেন। পরে সেন বাবু (সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত) মধ্যস্থতা করে দিয়েছিলেন।’
ইজারাদার পক্ষের কুলঞ্জ গ্রামের ইয়াহিয়া চৌধুরী বলেন,‘গতকালের গ-গোলসহ এখানে ৪ বার ঝামেলা হয়েছে। আমি মাসুক মিয়া, আহাদ মিয়া, আব্দুল কাদির জলমহালে যাইনি। আমি সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ নিয়ে পৌছাতে পৌছাতেই ঘটনা ঘটে যায়’।
দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশারফ মিয়া তাঁর ও প্রদীপ রায়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অসত্য এবং এ ঘটনায় সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও মতিউর রহমানের নাম যুক্ত করা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করে বলেন, ‘এই জলমহালে এমন পরিস্থিতি হতে পারে আশংকা করে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে ২৭ ডিসেম্বর উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আমি কথা বলেছি’।
পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বললেন, আমরা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য জলমহালে পুলিশ মোতায়েন করেছি। ঘটনায় জড়িত ছাড়া অন্য কাউকে হয়রানি করা হবে না। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ঐ এলাকায় থাকা বন্দুকসহ অস্ত্র-সস্ত্র পুলিশ জব্দ করবে।

  • [১]