- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জিন্নাহ’র নাম মুছতে ৪৬ বছর লাগা দুর্ভাগ্যজনক

স্বাধীন দেশে একটি বিদ্যালয়ের নাম থেকে দ্বিজাতি তত্ত্বের অন্যতম রূপকার পাকিস্তান নামক বিকলাঙ্গ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা মোহাম্মদ আলী খান জিন্নাহর নাম পরিবর্তন করতে ৪৬ বছর লেগে গেল, এ বড় দুঃখজনক বাস্তবতা। তাও পরিবর্তন বলতে বিদ্যালয়ের দেয়ালে পুরাতন নাম মুছে দিয়ে নতুন নাম লিখার একটি প্রয়াস মাত্র। আমরা জানতে পারি নি শিক্ষা বিভাগের নথিপত্রে এই বিদ্যালয়ের নাম আদৌ পরিবর্তন হয়েছে কি না। জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজার ইউনিয়নের রুপাবালি গ্রামে ১৯৪৭ সনে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাতারা সমকালীন বাস্তবতা অনুসারে বিদ্যালয়ের নামকরণ করেছিলেন জিন্নাহ সাহেবের নামে। স্বাধীনতার পর এই বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের বাস্তবতা আসলেও বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা এই প্রয়োজনীয় উদ্যোগটি গ্রহণ করেন নি। এমন কি বিদ্যালয়টি যখন জাতীয়করণ করা হয়, স্বাধীনতার পর তখনও এই উদ্যোগটি কেউ নেন নি। নানা সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠলেও সেটি গ্রাহ্য হয় নি। বহাল তবিয়তেই স্বাধীন বাংলাদেশের একটি গ্রামে বিদ্যালয়টির নাম পাকিস্তানি ভাবাদর্শের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র নামেই রয়ে যায়। অবশেষে স্থানীয় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নাম পরিবর্তনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবরে আবেদন করা হয়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পর স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ ৪৬ বছর পরে বিদ্যালয়ের দেয়াল থেকে জিন্নাহ’র নামটি মুছে ফেলা সম্ভব হলো, তাও কোনরূপ সরকারি লিখিত গেজেট বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা ছাড়াই। এই যে একটি বিদ্যালয়ের গা থেকে জিন্নাহর নাম পরিবর্তনে ৪৬ বছর লাগল এর পিছনে কারণ কী? আমরা যদি বলিÑ আমাদের মননে এখনও পাকিস্তানি ভূত রয়ে গেছে তাহলে কি সেটি খুব অসঙ্গত হবে? পাকিস্তানি ভূত যে রয়ে গেছে তার প্রমাণ তো চার পাশে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায়। একাত্তরের চিহ্নিত বিরোধিতাকারী বা গণহত্যাকারীরা স্বাধীন দেশে নানা সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত হয়। তারা ভোটে নির্বাচিত হয়। তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পারে। পক্ষান্তরে যারা রক্ত দিয়ে এই প্রিয় দেশটি স্বাধীন করেছিল তাদের দীর্ঘদিন পর্দার অন্তরালে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল এই দেশে। ১৯৭৫ সনের পর এই দেশটিকে পুনরায় পাকিস্তানি ভাবাদর্শে ফিরিয়ে নেয়ার এক পরিকল্পিত প্রয়াস ছিল জোরেসোরে। এর জের রয়ে গেছে এখনও। রয়ে যে গেছে তার প্রমাণ রুপাবালি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে জিন্নাহ সাহেবের সদম্ভ উপস্থিতি। জাতির মননে স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ যতদিন পর্যন্ত না গভীরতা পায় ততদিন এই ধরনের বাস্তবতার সন্মুখিন আমাদের হতেই থাকবে।
ধন্যবাদ জামালগঞ্জ উদীচীকে। তারা প্রাথমিক বিজয় অর্জন করেছেন। আসল কাজটি হলো সরকারি নথিপত্রে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করানো। এই দিকে এখন তাদের লক্ষ্য দিতে হবে। আমরা যতদূর জানি এ বিষয়ে শিক্ষা বিভাগে প্রস্তাব দাখিল করা আছে। এবং এই প্রস্তাব বেশ আগেই দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো স্বাধীন দেশের বিদ্যালয় থেকে  জিন্নাহ সাহেবের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগটি শিক্ষা বিভাগেরই স্বউদ্যোগে নেয়ার কথা ছিল। কেন তারা এই উদ্যোগ নেন নি? ওখানেও কি পাকিস্তানি ভূতের রাজত্ব আছে? প্রাথমিক শিক্ষার সিলেট বিভাগীয় উপ পরিচালক নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগটিতে খুশি হয়েছেন বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁর নিকট আমাদের অনুরোধ, বিদ্যালয়টির নাম সরকারি নথিপত্রে পরিবর্তনের বিষয়টিকে তরান্বিত করার। আমরা আশা করব এ বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি একটি গেজেট নোটিফিকেশন ইস্যুর ব্যবস্থা তিনি নিবেন।

  • [১]