- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জিলাপি চোর

কুমার সৌরভ
‘ইলাখান মারার দরকার কিতা। এখবারে শেষ খরিলাউ। তুমার নু বন্দুক আছে। গুল্লি নাই? তে গুল্লি খরও না খেনে। একবারে শেষ করিলাউ।’
তারস্বরে চিৎকার করছিল বিপিনবিহারী। তাকে চুরির দায়ে ধরে আনা হয়েছে এই সর্দার বাড়িতে। তারিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। আগে ফুড গোডাউনের লেবার সর্দার ছিলো। তখন তার বাড়িকে সবাই সর্দার বাড়ি বলে ডাকা শুরু করে। এরপর তারিনী মেম্বার হয়েছে, চেয়ারম্যান হয়েছে। তার আগের দু’চালা টিনের ঘর এখন দু’তলা বিল্ডিং হয়েছে। এখন তার বাড়ির চতুর্দিক আর উদোম নয়। বাউন্ডারি ওয়াল ঘিরে রেখেছে। সড়কের দিকে বিল্ডিং এর পেট বরাবর স্টেইনলেস স্টিলের একটি সুদৃশ্য প্রবেশ তোরণ বসানো হয়েছে। তোরণের এক কোণে প্লাস্টিকের নামফলক। সেখানে লেখা- চেয়ারম্যান ভিলা, তারিনী মোহন চৌধুরী, চেয়ারম্যান, ডাবরকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ। চেয়ারম্যান ভিলা লিখা থাকলেও মানুষ আগের মতই সর্দার বাড়ি বলে ডাকা ছাড়েনি। এ নিয়ে আফসোসের শেষ নেই তারিনীর। কতবার বলেছে- ‘এই ব্যাটা ওখন আমি অইলামগিয়া তুমরার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ওখন আমি আর আগের সর্দার নি? তেইলে তুমরা ওখন আর সর্দার বাড়ি খও খেনে। চেয়ারম্যান ভিলা খইলে খিতা জিব্বা ফরিযাইব নি।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। সর্দার বাড়ি আর চেয়ারম্যান ভিলা হয়ে উঠল না।

এমন প্রসঙ্গে গ্রামের ঘাড়ত্যাঁড়া রুক্ষিনী প্রায়ই তার ইয়ার বন্ধুদের বলে বেড়ায়- ‘তাইন চেয়ারম্যান অইছইন খিলা ইতা আমরা সবে জানি। তান নিজের সেন্টার দখল খইরা ব্যালট খাইরা বাক্সত্ বরিলাইছইন। ওই সেন্টার দিয়াই তু তাইন ১৩ ভোটে আরাইছইন আমরার আরাধন মাস্টররে। ওখন তাইন আইছইন চেয়ারম্যানগিরি ফলাইতা। বস্তার ফারা আইছইন আশমানর তারা অইতা। আরে..চু..চু..।’ রুক্ষিনী কথাগুলো বলে চোখ টিপে, তখন সবাই হেসে উঠে।
কিন্তু এসবই একান্ত আলোচনা। প্রকাশ্যে তারিনীর চোখে চোখ রেখে গ্রামের কেউই কোনো কথা বলে না। ভয় পায়। সকলেই জানে তারিনীর হাত অনেক লম্বা। ইচ্ছা করলে যে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারে। পারে থানায় নিয়ে পিটুনি খাওয়াতে। আরও পারে যারে ইচ্ছা তারে বয়স্ককার্ড দিতে। চাই সে বয়স্ক হোক কি না হোক। তাই আড়ালে সমালোচনা করলেও সামনে সকলেই তাকে খুশামুদি করে। ইউনিয়নে কোনো কিছু ঘটলে আগে তাকে জানাতে হবে। হোক সে সামান্য চুরি কিংবা খুন। ধর্ষণ অথবা মাথা ফাটাফাটি। এমন কি জামাই বউর ঝগড়াও পড়শিদের আপোস করার উপায় নেই। চেয়ারম্যানকে জানাতে হবে। তারিনী সবসময় বলে, ‘আমি অইলাম অউ ইউনিয়নের হর্তা-কর্তা। কর্তারে ফুল বেলপাতা দক্ষিণা না দিলে পুজা অইতো খিলা। তেঔ এই তারিনী বাবুর কৌর্টরে হেলাফেলা খইর না কেউ। খবর অইযাইবো এক্কেবারে।’
সুতরাং তাকে না জানিয়ে কেউ আইনের আশ্রয় নিলে আর উপায় নেই। অন্য আরও পাঁচটা মামলা দিনের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায়। তাই আজ এই সকালে বিপিনকে হাজির করা হয়েছে তারিনী-দরবারে। বিপিনের অপরাধ গত সন্ধ্যায় বিহারীদের বাড়ি থেকে এক বাক্স জিলাপি চুরি করেছে। বমাল ধরা পড়েনি বিপিন। বিহারী একবাক্স মিষ্টি আর এক বাক্স জিলাপী সুন্দরগঞ্জ থেকে কিনে ঘরে রেখেছিলো। পরের দিন সে এই মিষ্টান্ন নিয়ে কুটুমবাড়ি যাবে। বিপিন নাকি রাতের কোনো এক সময়ে ওই দুই বাক্সের মধ্যে জিলিপিরটা চুরি করেছে।
বেনসন শলাকায় টান দিয়ে নাক মুখ থেকে ধুয়া বের করে তারিনী চেয়ারম্যান বলল- ‘বিপিনই যে চুরি করেছে এর প্রমাণ কী?’
-‘বিপিনের ঘরো এই বাক্স পাওয়া গ্যাছে’। বলল বিহারী।
-‘কথা ঠিকনিবা বিপিন’ চেয়ারম্যানের জিজ্ঞাসা অভিযুক্ত বিপিনের উদ্দেশ্যে।
ছোট্ট করে মাথা নেড়ে বিপিন হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানাল।
-‘আচ্ছা, তাহলে চোর নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ভাল, বেশ ভাল।’ সামনের মজলিসের দিকে তাকিয়ে চেয়ারম্যান কথাগুলো বলে হাতের আধ খাওয়া বেনশন শলাকা ছুঁড়ে মারল মাটিতে। ওটি গিয়ে পড়লো মজলিসে হাঁটুমুড়ো দিয়ে বসা বিনোদের কাছে। বিনোদ বেনশন শলাকাটি হাতে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে টানতে শুরু করল। আহ্ এত স্বাদ বেনশনের, টানতে টানতে বিনোদের মনে হলো এ তো ধূম্রশলাকা নয়, এতে তো দেখি চেয়ারম্যান সাহেবের গায়ের সুগন্ধি লাগানো । টানলে বুকটা এখবারে ঝরঝরা অইয়া যায়। কি বাস আর কি সুয়াদ। সে তো ঘণ্টায় ঘণ্টায় ধূম্রশলাকা টানে। নিজের নামে নাম বলে বিনোদ বিড়ি তার বড় পছন্দের। সবসময় বিনোদ বিড়ির বান্ডেল তার ট্যাঁকে গোঁজা থাকে। চেয়ারম্যান আড়চোখে বিনোদের সিগারেট টানা দেখে মুচকি হাসল। মুখে কিছু বলল না। চেয়ারম্যান এবার বিপিনের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘তাহলে তুমি স্বীকার করে নিচ্ছ জিলিপির বাক্স তুমিই চুরি করেছ’?
বিপিন কিছু বলার আগে মজলিসে বসা রতনমনি বলে উঠল- ‘চেয়ারম্যান বাবু বিপিনের জন্ম ই গ্রামো। জন্মের ফর থেইক্যা তারে আমরা দেইখ্যা আইরাম। হে গরিব অইতো পারে। শরীর খাইট্যা খায়। কুনুদিন হে চুরি করছে ইরখম কথা হুনছি না। চেয়ারম্যান বাবু দেখইন কুনু গন্ডগুল আছে মনে অর।’ তাকে সমর্থন করে মজলিসে উপস্থিত আরেকজন। সে রবীন্দ্র। বলল- ‘আমিও ইতা হাছা মনে খররাম না। আমরা একবার তিন দিনের লাগি বাইরে গেছলাম বাড়িত বিপিনরে এখলা রাইখ্যা। আইয়া এখটুও হড়নড় ফাইছি না। ইলাখান ব্যাটা এক বাস্ক জিলাপি চুরি খরব, না না আফনারা বিষয়টা তলাইয়া দেখইন। বউত সময় চউখর দেখা সবতা হাছা অয় না।’
চেয়ারম্যান এবার মজলিশের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন- ‘এ তো আচ্ছা মুশকিল দেখছি। আসামি যেখানে নিজে স্বীকার করেছে… আচ্ছা আচ্ছা… সত্যিই সে চুরির অপরাধ স্বীকার করেছে কিনা যাচাই করা দরকার।’ চেয়ারম্যান চোখ থেকে চশমাটা খোললেন। পাঞ্জাবির নিচের অংশ হাতে নিয়ে চশমা ঘষে আবার চোখে দিয়ে তাকালেন বিপিনের দিকে। ‘বিপিন সত্যিই তুমি বিহারীর বাড়ি থেকে জিলাপি চুরি করেছ? সত্য বলবে কিন্তু। দেখ সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তি সর্বদা ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করেন।’ তার এই কথায় মজলিশের পিছনে ফিসফিসানি শুরু হলো। কেউ একজন বলছে- ‘আহারে ব্যাটা সত্যবাদী যুধিষ্টির। তুই দিনে কয়টা হাছা কতা মাতছ। হিদিন আমারে খইলে- তোমার নাম আমি দিসলাম পুনর্বাসনের লিস্টিত্ কিন্তু অফিসো গিয়া ই কথা খইতেই তারা লিস্টি বাইর খইরা চেক কইরা খইলা আমার নাম নাই। হালা হাছা মাউতারর ঘরের হাছা মাউতরা। একদলা থু থু ফেলার দৃশ্যও ফিসফিসানি স্থলে লক্ষ্য করা গেলো। তবে ওই বাঙময় দৃশ্য চেয়ারম্যান অবধি এসে পৌঁছালো না। পিছনের কথা আরও পিছনে চলে গেল।
বিপিন এবার সামনে এসে দাঁড়ালো। দৃষ্টি তার চেয়ারম্যানের চোখে। মাথা সোজা। মুখে বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের চিহ্ন নাই। দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল- ‘অয় অয় আমিই জিলাপি চুরি খরছি। অখন তোমরার বিচারো কিতা শাস্তি দিতায় দিলাউ।’
পুরো মজলিস স্তব্ধ। গ্রামের বহু সালিস তারা দেখেছে। দেখেছে পাঁচগ্রামী দশগ্রামী বিচারও। এক বিচারে সন্তুষ্ট না অইলে ছানি বিচার চাওয়া যায়। পুরো পরগনার মাতব্বররা বসে বিচার করেন। কিন্তু এমন দৃঢ়তা নিয়ে কোনো অপরাধীকে কেউ অপরাধ স্বীকার করতে দেখেনি। বিপিনের কথার মধ্যে কোনো জড়তা নাই। কোন অনুশোচনা বা ভয় নাই। সে যেন উচিৎ কাজই করেছে।
চেয়ারম্যানের পাশে বসা ওয়ার্ড মেম্বার এতক্ষণ নিশ্চুপ ছিলো। এত বড় সভায় তার কিছু বলা উচিৎ বলে এবার তার মনে হলো। মেম্বার বিপিনকে উদ্দেশ্য করে বলল- ‘কিতারলাইগ্যা চুরি খরছ? তোমার সম্বন্দে তো এর আগে ইরকম কোনতা হুনছি না। তে অইলে এই কয় টাকার জিলাপি চুরি করলায় খেনে। খউছাইন দেখি।’
বিপিন নিরুত্তর। মেম্বার আরও কয়েকবার জানতে চাইলেও একই রকম নিরুত্তর রইলো সে।
পিছন থেকে কে জানি ফুরন কাটে। ‘বিপিনের আরেক আত ভাঙা আছিল মনে অর ইদিন। নাইলে আরেক বাস্ক মিষ্টি থইয়া গেল না নে।’ হাসির হালকা একটি রুল উঠেই আবার মিলিয়ে যায়। চেয়ারম্যান গর্জে উঠলেন- ‘চুপ, হক্কলে মাতব্বর অইগেছইন। হালার কলির কাল ছাগলে চাটইন বাঘর গাল।’
চেয়ারম্যান এবার বিচারকসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে বলতে শুরু করলেন- ‘আসামি নিজে চুরির দায় স্বীকার করেছে। সে আত্মপক্ষ সমর্থনে কোন কথা বলতেও অনিচ্ছুক। বুঝাই যাচ্ছে বিহারির বাড়ি থেকে বিপিনই জিলাপি চুরি করেছে। দোষ প্রমাণ হওয়ায় তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেয়া দরকার। অপরাধের সাজা না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। অন্যরাও অপরাধী হতে প্রলুব্ধ হয়। সুতরাং এই গ্রামকে তথা সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিপিনের একটি শাস্তি হওয়া উচিৎ। আপনারা বলুন তাকে কী শাস্তি দেয়া যায়।’ কথা শেষ হওয়ার পর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটি সিগারেট মুখে দিল। অন্য পকেট থেকে গ্যাসলাইটার বের করে সিগারেট ধরিয়ে এক মুখ ধুয়া আকাশের দিকে ছেড়ে চেয়ারম্যান সকলের দিকে দৃষ্টিপাত করলো।
এবারও ফিসফিসানি মজলিসের ডানদিকের শেষ সারিতে। ওখানে হ্যাংলাপাতলা কমবয়সী এক ছেলে তার পাশের জনকে বলছিল- ‘অপরাধের সাজা দিব এরা। একবাস্ক জিলাপি চুরির সাজা। গতবার বন্যায় আমরার আওর ডুবি গেল। ওয়াবদার বালের বান্দ ফানির পয়লা ধাক্কাঅই সামলাইতে ফারলো না। হুনছি ওই বান্দে সরকার ৪০ লাখ টাকা দিছলা। ওই বান্দো যদি ২ লাখ টেকার মাটি আর দুই লাখ টেকার বাশ দাড়ি দেওয়া অইতো তে অইলে ওইটা আর ভাংল না নে। এই বান্দের ঠিকাদার তো চেয়ারম্যানের ভাতিজাই আছলা। তাইন ভাতিজার বিচার খরছইন নি? ওখন আইছইন জিলাপি চুরির বিচার খরতা।’ আগের মতই ডান কোণের এইসব ফিসফিসানি আরও ডানে চলে যায়, সামনে এগোতে পারে না। মজলিশে তেমন আলোড়নও তুলে না।
চেয়ারম্যানের কথায় মজলিশে গুঞ্জরণ শুরু হয়। মেম্বার মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবে কেমন শাস্তি হতে পারে। সামনের সারির মোহনবাঁশি তালুকদার ধুতির খুঁট তুলে হাঁটু চুলকায় আর ভাবে। তার ডানের দীনবন্ধু বর্মন কাঁধের গামছা দিয়ে মুখ মুছে। দীর্ঘ বিচারসভায় এখন তার খেয়াল হলো গরমে মুখ শরীর ঘামে ভিজে গেছে। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে দীনবন্ধু মনে মনে শাস্তির প্রকার ও পরিমাণ ভাবতে থাকে। এমনকি অনবরত কাশছিল যে হরিহর সেও চোখে লেগে থাকা পাঁচুটি মুছতে মুছতে ভাবতে থাকে বিপিনের কী শাস্তি হতে পারে। কেবল পিছনে ও ডান কোণে জটলা করে বসে থাকা লোকগুলোর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। তারা এতক্ষণ একটি বিড়ি ধরিয়ে চার পাঁচ জনে ভাগ করে ফুঁকছিলো আর মাঝে-মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিলো। এরা গ্রামের অগণ্য মানুষ। এদের কাছে কেউ মতামত জিজ্ঞেস করে না। এরাও গলা চড়িয়ে নিজেদের ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে জানে না। তবে এরা সকলেই যে বিপিনের প্রতি সহনাভূতিশীল তা এদের মুখ চোখ দেখেই বুঝা যায়। এখন এদেরই একজন বিপিনের কাছাকাছি চলে আসল। একেবারে বিপিনের সামনে এসে দাঁড়ালো। এখন আর চেয়ারম্যান বিপিনকে দেখতে পারছে না। একজনের দেখাদেখি আরও কয়েকজন এসে বিপিনকে ঘিড়ে দাঁড়ালো। এখন বিপিনকে চক্রবুহ্যে আটকে পড়া অভিমন্যূর মতো দেখাচ্ছে। বিপিনের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কারণে এখন আর শুধু চেয়ারম্যান নয় মজলিশের অন্যরাও আর বিপিনকে দেখতে পাচ্ছে না। চক্রবূহ্যের পরিধি ছোট হয়ে আসছে। একজনের সাথে আরেকজনের গা ছুঁয়াছুঁয়ি হয়ে গেলো। একজনের নিঃশ্বাসের শব্দ আরেকজনের কানে শনশন বাতাসের মতো আঘাত করছে। তবে এই বূহ্য বিপিনকে মারার জন্য রচিত হয়নি। দেখা গেল চক্রবূহ্য একসাথে নুয়ে পড়ল। মধ্যিখানে বিপিনকেও নোয়ানো হলো। ঠিক খেলা শুরুর আগে যেমন ক্যাপ্টেন সহ-খেলোয়াড়দের শেষ টিপস দেয় তেমনই দেখাচ্ছে এই কু-লীকে। সকলেই আস্তে আস্তে বিপিনকে বলল- ‘তুই চুরির দায় অস্বীকার কর ভাই। আমরা হকলেই জানি চুরির মতো জঘন্য কাজ তুই করতে পারস না। কুনতা না কুনতা রহস্যতো আছেই। তুই ইটা খইয়া দে। আমরা আছি তর লগে।’
বিপিন দুই হাত উপরে উঠিয়ে এক ঝটকায় অগণ্য-মানব-বূহ্যকে ধাক্কা দিয়ে নিজের মাথা উপরে তুলল। ঠিক পুরানের অভিমন্যূর মতই। এবার সে স্বর চড়িয়ে বূহ্য-মানবদের উদ্দেশ্যে বলল- ‘না আমিই চুরি খরছি। আগেও খইছি ওখনও খইরাম।’ হতচকিত মানব-বূহ্য সরে দাঁড়াল। বিপিন তাদের অসম্মান করল না সত্য আঁকড়ে থাকলো ঠিক বুঝে উঠতে পারল না তারা।
এবার শাস্তির ধরণ ঠিক করার পালা। চেয়ারম্যান সকলকে উদ্দেশ্য করে আবারও তাড়া দিলেন যার যার মতামত দেয়ার জন্য।
মেম্বার বলল- ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। ধরা খাইলে তো মরি গেলে। বিপিন যখন ধরা ফরিগেছে তাইলে দিঠান রাখার মতো শাস্তি দেওয়ন লাগব। হেরে বাজারবারের দিন সদর রাস্তায় হখলের সামনে নাকখত দেওয়ার রায় দেউক্যা।’
মোহনবাঁশি তার মতামত দিলো- ‘বিপিন ব্যাটার আগে চুরির রেকড না থাকায় তারে ১ হাজার টেকা জরিমানা খইরা ইবারের মত মাফ করিদেইন।’
দীনবন্ধু বলল- ‘চোরের ফত্যিদিন আর গিরস্তের এখদিন। বিপিনরে একঘইরা খইরা রাইখ্যা দেইন।’
আরও কয়েকজন এমন আরও বহু শাস্তির বাতেলা দেখিয়ে দিল।
চেয়ারম্যান সকলের কথা শুনলেন। তিনি জনপ্রতিনিধি কিনা তাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। জনগণকে ক্ষমতায়িত করা তথা নির্ভয়ে মত প্রকাশের পরিবেশ তৈরিও তার কাজ। এজন্য চেয়ারম্যান সকলের মতামত জেনে নিলেন। কিন্তু আসল রায়টা ঘোষণা করবেন তিনিই। তিনি এই মজলিসের বিচারক কিনা। আদালতে যেমন উকিলরা সওয়াল করে, স্বাক্ষীদের জেরা করে, তথ্য-প্রমাণ পেশ করা হয়, বাদি-বিবাদি নিজেদের আর্জি পেশ করে; কিন্তু রায় ঘোষণা হয় জজ সাহেবের মুখ থেকে এখানেও তেমনি সকলের কথাই শুনা হবে কিন্তু শেষ কথাটি চেয়ারম্যানই বলবেন। এই বিধানবলেই তো সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
চেয়ারম্যানের মুখে তৃপ্তির হাসি। তিনি হাত তুলে বললেন- ‘আর কেউ কিছু বলতে চাও?’ তার তর্জনী যেন এবার অগণ্যজনদের দিকে। অন্তত তারা তাই মনে করল। পিছনের একজন, যে বূহ্য রচনার একজন ছিলো, সে বলল- ‘লঘু পাপে গুরু দ- অইযারগি। আপনে হুনরা নানি।’
এই কথার সাথে অনেকেই দাঁড়িয়ে গেল। ‘অয় অয় বিপিনের আজ ন্যায্য বিচার করন লাগবো। আসল রহস্যখান বার করন লাগব।’
গমগম করে উঠল মজলিস। যেন একশ একটি পাখি একসাথে ডেকে উঠেছে। যেন অর্ধশত ষাঢ় একসাথে চেঁচিয়ে উঠেছে। লাল হয়ে উঠল চেয়ারম্যানের মুখ। তিনি স্বগতোক্তি করলেন। গণতন্ত্রকে এরাই যুগে যুগে হত্যা করে এসেছে। এদের জন্যই সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। তিনি গর্জে উঠলেন- ‘চুপ ব্যাটারা। তোদের কাছে কে মতামত জানতে চেয়েছে।’ খুব বিরক্ত হয়ে অগণ্যদের কথা থেমে গেলো।
এবার চেয়ারম্যান স্মিত হাসি দিয়ে বললেন- ‘এতক্ষণ সবাই সবার কথা শুনেছেন। সবচাইতে বড় কথা অভিযুক্ত বিপিন নিজের দোষ স্বীকার করেছে। একবার নয় দুই দুই বার। এখানে আর সাক্ষী সাবুদের প্রয়োজন পড়ে না। দোষ যেখানে প্রমাণিত সেখানে দোষীকে উপযুক্ত সাজা দেওয়া সভ্য সমাজের রীতি। বিপিনেরও সাজা হওয়া দরকার। আপনাদের সকলের কথা শুনেছি। সকলের মতামত সমন্বয় করে আমি একটি রায় দেই, আপনারা কী বলেন?’’
চেয়ারম্যানের এই কথায় মজলিসের গণ্যরা হাত উঁচিয়ে সমর্থন জানালেন।
চেয়ারম্যান এবার চিন্তা করা শুরু করলেন কী সাজা দেয়া যায় বিপিনকে। এই হারামজাদার ভাল শাস্তি হওয়া দরকার। গত বন্যায় রিলিফের ৪ বস্তা চাল এনেছিলেন তিনি। পথে দেখে ফেলে বিপিন। বলে- ‘ও চেয়ারম্যান বাবু গরিবের চাউল আফনে বাড়িত নেইন কেনে। আফনার কিতা কম আছে না কিতা। ফুডগোদামে সর্দারি করার সময় ৫০ কেজির বস্তারে ৪৫ কেজি দেখাইয়া কত টেকার মালিক হইচইন। আবার ডিলাররারে দেওয়ার সময়ও ৪৫ কেজি দিয়া ৫০ কেজির হিসাব করছইন। ফরে চেয়ারম্যান অইয়া কত রাইতরে দিন আর দিনরে রাইত খইরা পয়সা কামাইছন। ওত আছে আফনার। তারফরেও রিলিফের চাউল নেইন। ইতা বালা নায়।’ বিপিন শুয়রের বাচ্চার ওই কথাগুলো এখনও মনে আছে চেয়ারম্যানের। তাই তিনি বিহারিকে বলে এই বিচারের আয়োজন করিয়েছেন। বিহারি প্রথমে রাজি ছিল না। বলেছিল- ‘ইতা আর খিতা। এক কেজি জিলাপির ব্যাফার। আর জিলাপি তো ফিরতওই আইন্যইছি। ইতার লাগি আর বিচার ক্যানে চেয়ারম্যান বাবু।’ চেয়ারম্যান একটু চোখ লাল করে গরম গরম কয়েকটা কথা বলার পরই নেতিয়ে পরে বিহারি। তাই আজকের এই বিচারের মজলিশ। বাদি বিহারী আর অভিযুক্ত বিপিন। বিচারের শেষদিকে এসে বিহারির বেশ খারাপই লাগছে। বিপিন তার খুরতোতু ভাই। বিভিন্ন সময়ে বিপিনের সহায়তাও নিয়েছে বিহারি। ওই তো মাস ছয় আগে বিহারীর মা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বিপিনই তো মাছ শিকারের পলোর মধ্যে কাঁথা বিছিয়ে তার অসুস্থ মাকে সেখানে বসিয়ে দিয়েছিলো। পলোর দুই দিকে দুইটি রশি বেঁধে সেই রশিতে বাঁশ আটকিয়ে বিপিন আর বিহারী কাঁধে নিয়ে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো। আর আজ কিনা তারই অভিযোগে বিপিনকে চুরির সাজা মাথায় নিতে হচ্ছে। চেয়ারম্যানের ভয়ে সে কিছু বলতেও পারছে না। তার বুক ভারী হয়ে উঠেছে। ভয়,কষ্ট, ঘৃণা ও ক্ষোভ যেন তার বুকের মাঝে ভারী পাথরের মত চেপে আছে। সে তাকায় বিপিনের দিকে। বিপিন আগের মতই নির্বিকার। উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশে প্রখর রোদ। শ্রাবণের রোদের তাপে তার মুখখানি লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিপিন যেন সূর্যের সকল উত্তাপ নিজের মধ্যে ধারণ করার পণ করেছে।
চেয়ারম্যান উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার থেকে। তিনি এবার রায় ঘোষণা করবেন। গম্ভীর কণ্ঠে বলা শুরু করলেন- ‘শোন সকলে, আমি অনেক চিন্তা করে ঠিক করেছি বিপিনকে…
কথা শেষ করতে পারেননি চেয়ারম্যান। মজলিসে উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসল কমলার মা। বিহারীর বিধবা বড় বৌদি। সম্পর্কে বিপিনেরও বৌদি, জেঠতুতো ভাইয়ের বউ। এই মহিলা এখন কেন এই মজলিসে কেউ ভেবে পেল না। এসেই সে চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে উঠল- ‘আফনারা ইতা তামশা বন্ধ খরইন। বিপিন কোনো জিলাপি চুরি করছইন না। জিলাপি চুরি খরছে আমার কইন্যা কমলা। কাকার ঘরে জিলাপি দেইখ্যা পেটের ভুকে মাইয়া আমার লোভ সামলাইতো ফারছে না। লুকাইয়া আইন্যা বিপিনের ঘরে রাখছিল। কমলার বাফ মরার ফর বিপিনই আমরারে তার ঘরো জায়গা দিছে। নাইলে আমরার গাছতলাত থাকল লাগলনে। কমলা জিলাপী লইয়া আওয়ার সময় বিহারিও আইছলা। তাইন তো দেখছইন কমলারে জিলাপি আনতে। তে ওখন বিপিনের উফরে দোষ দেইন খেনে। তান ঘরো ফাইলে কিতা তাইনঅই চোর না কিতা। শাস্তি কমলারে দেইন। আর আমারে দেইন পেটের ফুরিরে দুই দিন দইরা খানি দিতাম ফাররাম না। কিতা এখ অসুখ আইছে। খেউ বাসাত ঢুকতে দেইন্যা। কাম না করলে আমি কমলারে খাওয়াইমু খেমনে। আমারে শাস্তি দেইন আফনারা যেতা মনো খরইন।’
কান্নায় লুটিয়ে পড়ল কমলার মা। পাশে দুই দিনের না খাওয়া জীর্ণ শরীরের কমলা।

  • [১]