- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জীবদ্দশায় ‘বীরপ্রতীক’ ঘোষণার দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
বয়সের ভারে ন্যুব্জ মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। শরীর ভাল নেই তাঁর। কথা বলতে পারেন না। ২ বছর আগে একবার স্ট্রোক করেছিলেন তিনি। দুই মাস আগে আবার স্ট্রোক করে শরীরের ডান দিক অবস হয়ে পড়ে তাঁর। বিছানায় থেকেই মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। পাক হায়েনাদের মারপিটের যন্ত্রণা এখনো সইতে হচ্ছে তাঁকে। কোমরে ও হাতে নিয়মিত ব্যথা। ওষুধ এখন নিত্যসঙ্গী তাঁর। অবশ্য জীবনের শেষ বয়সে এই বীরাঙ্গনার দুমুঠো অন্নের সংস্থান হয়েছে। হয়েছে মাথা গোঁজার ঠাইও। কাঁকন বিবির একমাত্র সন্তান সখিনা বেগম, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধিরা জীবদ্দশায় গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে কাঁকন বিবিকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করার দাবি জানালেন।  
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে কাঁকন বিবি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের সীমান্তবর্তী ভোগলা বাজারে থাকতেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৫ নম্বরের সেক্টরের সেলা সাবসেক্টরের অধীন লক্ষীপুর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না-বান্নায় সহায়তা করতেন। পরে একই সেক্টরের যাহিদ কোম্পানিতে এএসএফ পদে কাজ করার সুযোগ পান কাঁকন বিবি। দায়িত্ব বর্তায় গুলির বাক্স, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার বহন এবং শত্রুর কাছ থেকে খবর সংগ্রহের। কাঁকন বিবি ভিক্ষুক সেজে পাক সেনা ও তার দোসরদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবর         
 আদান-প্রদান করতেন। এভাবে কাজ করতে করতেই একদিন ধরা পড়েন পাঞ্জাবীদের হাতে। পাঞ্জাবীরা তাকে শিক্ গরম করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছ্যাকা দেয়। টানা সাতদিন চলে অত্যাচারের এই স্টিমরোলার। সাত দিনে পাক সেনাদের অনেক নির্যাতনই স্বচক্ষে দেখেছেন কাঁকন বিবি। দালাল-রাজাকাররা কিভাবে বাঙালি মা-বোনদের পাক হায়েনাদের হাতে তুলে দিতো, কিভাবে পাকসেনারা নির্যাতন করতো, সবই দেখেছেন এই বীরাঙ্গনা। সাতদিন পর কৌশলে পালিয়ে বাঁচেন কাঁকন বিবি। কিন্তু প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা থেকে আবারো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। চলে যান সাব সেক্টর কমা-ার ক্যাপ্টেন হেলালের কাছে। কাঁকন বিবি মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না-বান্নার কাজ শুরু করেন। আগস্ট পর্যন্ত এভাবেই চলে তাঁর। এরপর অপারেশন সাকসেস’এর কাজে অংশ নেন তিনি। ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়া বাজারে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দলও একই সময়ে এই সড়কের বড়কাপন এলাকায় পৌছায়। আগে থেকেই জাউয়া বাজার এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল। জাউয়াবাজার সেতু বিচ্ছিন্ন করতে মাইন বিস্ফোরণে ভূমিকা রাখেন কাঁকন বিবি। উত্তাল দিনগুলোতে ২০ টির মতো অপারেশনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। ১৫ টি অপারেশনে ছিল সক্রিয় ভূমিকা। পাকসেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিলেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। নূরজাহান ওরফে কাঁকন বিবি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় তাঁর স্বামী তাকে তালাক দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিলেন এই বীরাঙ্গনা। ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। ১৯৯৭ সালে জাতীয় দুটি দৈনিকে কাঁকন বিবির বীরত্বগাঁথার সংবাদ ছাপা হলে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে বিভিন্ন সংগঠন তাঁর সহায়তায় এগিয়ে আসে।
প্রথমে নারী প্রগতি সংঘ ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং আর্থিক সহায়তাও দেয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে লক্ষীপুরের নিরারগাঁওয়ে ৩ কেয়ার জমি দেন। দৈনিক জনকন্ঠ প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে ৪ বছর সহায়তা দিয়েছে। জনতা ব্যাংক এককালীন ঘর বানানোর জন্য ৭ লাখ টাকা দিয়েছে। দৈনিক কালের কন্ঠ এক লাখ টাকা দিয়েছে। এছাড়া বাংলালিংক ও গ্রামীণ ফোন কর্মচারী সমিতিসহ নানা সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এখন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী পেয়ে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া জমিতেই ঘর করে মেয়ে সখিনা বেগম, মেয়ের জামাই, দুই নাতনি পপি ও শান্তির বসবাস।
কাঁকন বিবি কথা এখন আর কথা বলতে পারেন না। তাঁর মেয়ে সখিনা বেগম বললেন,‘আমার মায়ের সার্টিফিকেটে কাঁকন বিবি বীরপ্রতীক লিখা রয়েছে। কিন্তু গেজেটে বীরপ্রতীক হিসাবে তাঁর নাম নেই। আমাদের দাবি আমার মা যেন জীবিত থাকা অবস্থায় জেনে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করেছেন।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বলেন, একজন সহযোদ্ধা হিসাবে আমিও দাবি করছি কাঁকন বিবি যেন তাঁর যথাযথ সম্মান পান।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন,‘জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠকন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। কাঁকন বিবিকেও সম্মানিত করেছেন, সহায়তা দিয়েছেন। কাঁকন বিবিকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করলে তিনি আরো বেশি সম্মানীত হবেন। আমি প্রত্যাশা করি সরকার সেটি করবেন।’

  • [১]