- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জীবন সায়াহ্নে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাশিম

আকরাম উদ্দিন
সবার পরিচিত মুখ একজন সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাশিম (যুদ্ধাহত)। বয়স ৭৩ বছর। তিনি যখন টগবগে যুবক তখন স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। এই সময় দেশ মাতৃকার টানে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। মহান বিজয়ের মাসে তিনি শয্যাশায়ী। বৃহস্পতিবার সকালে শহরের মেজর ইকবাল রোডে অবস্থিত তাঁর বাসায় যাই। ঘরে ঢুকতেই বিছানায় শয্যাশায়ী অবস্থায় চিনে ফেলেন আমাকে এবং ডাক দেনÑসাংবাদিক। আমি সালাম জানাই। বলেন- বসুন। দীর্ঘ ৮ মাস অসুস্থ থাকার কারণে আগের চেহারার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। তিনি জানালেন, শরীরের চিকিৎসার জন্য দেশের অনেক ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছেন। তেমন ভাল ফল পাননি। সর্বশেষ ভারতে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখন পূর্বের চেয়ে কিছুটা সুস্থ। সুস্থতার জন্য সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
প্রেরণার উৎস :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাশিম (যুদ্ধাহত) বলেন,‘আগে থেকে আমার বিভিন্ন প্রকারের ট্রেনিং ছিল। সেনাবাহিনীর ট্রেনিং, আনসার ও মোজাহিদী ট্রেনিং করেছি। শহরের শহীদ মিনারের কাছে দোকানে বসে সবসময় রেডিও’র খবরা-খবর শুনতাম। তখন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। হঠাৎ শুনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। তিনি বলছেন, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর। এই ভাষণ আমার মনকে আবেগী করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার প্রেরণা এই ভাষণ থেকে পেয়েছি।
যুদ্ধে অংশগ্রহণ :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাশিম (যুদ্ধাহত) বলেন,‘১৯৭০ এর নির্বাচনের সময় আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলাম। আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করেছি। এই সময়ে সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। দেশের মানুষের মুখে স্লোগান ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। মিছিল আর বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয় শহরে। প্রথম থেকেই আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। তখন দেওয়ান ওবায়দুর রাজা, রইছ উদ্দিন, আলফাত উদ্দিন মুক্তার সাহেব মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন।
যুুদ্ধ শুরু :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাশিম (যুদ্ধাহত) বলেন,‘যুদ্ধের শুরুতেই আমার বড় ভাই মালদার আলী জামালগঞ্জে যান অস্ত্র সংগ্রহ করতে। এদিকে আমরা ক’জন পাক হানাদারদের ধরতে শহরের ওয়েজখালীতে অবস্থান নিই। ছাত্ররাও আছে আমাদের সাথে। রাতে ইয়াছিনপুর গিয়ে থাকতে হয়েছে আমাদের। ২৭ মার্চ শহরের ওয়েজখালি থেকে জুবিলী স্কুলে আসি আমরা ক’জন। জুবিলী স্কুলে লুকিয়ে থেকে দেখি সার্কিট হাউসে পাক হানাদার বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। সার্কিট হাউসে অবস্থানরত পাক হানাদারদের সাথে সংগ্রামী জনতার যে ঐতিহাসিক যুদ্ধ হয়েছিল তাতে আমিও অংশ নেই।
শহরের এসব ঘটনার পর পাক হানাদারেরা ফাইটার বিমান উড়িয়ে আমাদেরকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু আমরা তখন সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে ইব্রাহীমপুর গ্রামে চলে যাই। সেখান থেকে কিছুদিন যুদ্ধ করি। এই গ্রামের আমাদের অবস্থান মনে করে শতাধিক ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। এই ঘটনার পর আমরা ডলুরা এবং বালাট হয়ে ভারতের লাল পানি চলে যাই। লাল পানি থেকে এসে গেরিলা যুদ্ধ করি নারায়নতলা, বেরীগাঁও, কাঁঠালবাড়ি এলাকায়। এসময় প্রথম কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন এনামুল হক চৌধুরী। সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সালাহ উদ্দীন।
মেজর সালাহ উদ্দিন তখন ডি-কোম্পানীতে পাঠান আমাকে। আমি দায়িত্ব পেয়ে কাঁঠাল বাড়িতে অবস্থান করি। ময়মনসিংহের জালাল নামের এক সহযোদ্ধাও ছিলেন আমাদের সাথে। ওই এলাকায় বাঘমারায় আমাদের ডিফেন্স ছিল। একদিন বাঘমারা ও বেরীগাঁওয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী অনেকে মারা যায়। যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমাদের শহীদ হওয়া ৩ জনের লাশ ব্যাংকারে রেখে দেয় পাক হানাদার বাহিনী। আমরা ব্যাংকারে ব্রাশ ফায়ার করে অরবিন্দ, কবিন্দ্র, লস্কর নামের ৩ জনের লাশ ছিনিয়ে আনি। সেই সাথে অস্ত্রও নিয়ে আসি।
পরবর্তীতে আমার উপর তাৎক্ষণিক আক্রমণ হয় কাঁঠালবাড়িতে। এ সময় তালেবকে আটক করে ফেলে পাক বাহিনী। হানাদার বাহিনীর ১ সদস্য তখন আমাকে ঝাঁপটে ধরে। এরপরও হানাদার বাহিনীর সদস্যকে আমি রাইফেলের বাট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলতে সক্ষম হই। দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, রক্তমাখা শরীর নিয়ে পাল্টা গুলি ছুঁড়েছি। জাহাঙ্গীরনগর গ্রামে এসে ব্রাশ ফায়ার করার পর হানাদার বাহিনীর পর পর দুইটি গুলি আমার বাম কাঁধে লেগে যায়। কিন্তু অস্ত্র ছাড়িনি। গুলি শেষ হয়ে আসলে মেজর মোতাল্লিবকে গুলির কথা বলি। এরপর আবারও বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ শুরু করি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। এভাবে যুদ্ধকালীন নয় মাস কেটে যায় আমার।
কেমন বাংলাদেশ প্রত্যাশা :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল হাশিম (যুদ্ধাহত) বলেন,‘যাঁদের রক্তে মুক্ত এ দেশ তাদের জীবনমানের উন্নয়ন করতে হবে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধী লোকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশকে মায়ের মতো ভালবেসে সর্বোপরি দেশের টেকসই উন্নয়নসহ দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে হবে।’

  • [১]