- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ছুটছে কৃষক পরিবার

শহীদ নূর আহমেদ
‘গ্রামে থাকলে না খাইয়া মরতে অইব, এলাকাত কোন কামকাজ নাই। জীবন বাঁচাইবার লাগি পরিবারের হক্কলরে লইয়া ঢাকায় যায়রাম। আঙ্গারউলি হাওরে ৫ কিয়ার জমি করছিলাম। ধানও ভালা অইছিল।  ধানের আশায় ঋণ-সিন কইরা চলছিলাম।  বান ভাইঙ্গা আমার সকল ধান পাইন্নে নিছেগি। দুইটা গরু আছিল আমার। নিজের খানি তুলতা পারছিনা, গরুর খানি কই ফাইতাম। পানির দামে গরু বেচিলাইছি। বাড়িঘর পতিত রাইক্কা ঢাকায় যায়রাম। জানি না কাম কাইজ পাইমুনি।’ এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সিরাজপুর গ্রামের ফসলহারা কৃষক কালা মিয়া। পরিবারের ৮     সদস্য নিয়ে কাজের খোঁজে তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন।
এভাবেই অকাল বন্যায় ফসল হারিয়ে  জীবন জীবিকার সন্ধিক্ষণে জেলার লাখো কৃষক পরিবার। স্বপ্নের লালিত সোনার ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা এই নি:স্ব কৃষক পরিবারগুলি।
এনজিও, কৃষি ব্যাংক ও মহাজনদের  দেনার দায়ে  হন্যে হয়ে ঘুরছেন তারা। নিজের আর পরিবারের খাবারের সাথে সাথে শংকিত গো খাদ্যের যোগান নিয়ে। পানির দামে গরু বিক্রি করে কমাচ্ছেন ঋণের বোঝা। ফসল তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় শ্রমবাজারে স্বল্প মূল্যে শ্রম দিতে ইচ্ছে থাকলেও জোটছে না অর্থের সংস্থান। জীবিকার তাগিদে তাই বাধ্য হয়েই কাজের সন্ধানে পা বাড়াচ্ছেন রাজধানী সহ অচেনা শ্রম বাজারে। গৃহপালিত পশু ও মূল্যবান জিনিসপত্র বিক্রি করে যাতায়াত খরচ ও কিছুদিনের হাতখরেচের ব্যবস্থা করছেন কৃষকরা। ফসল হারিয়ে স্থানীয়ভাবে জীবিকার কোন উপায় না পেয়ে জীবন বাঁচাতে রাজধানীর উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছেন বলে জানান এই কৃষকরা।
সোমবার সন্ধ্যায় শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকাগামী বাসের টিকেট কাউন্টারে যাত্রীদের উপছে পড়া ভীড় দেখা যায়। লঞ্চঘাট এলাকায় শহরের উদ্দেশ্যে আসতে দেখা যায় অনেক যাত্রীকে। পরিজন নিয়ে অচেনা গন্তব্যে দিকে ছুটছেন তারা।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যাত্রীদের অধিকাংশই কৃষক এবং  কাজের সন্ধানে রাজধানীতে যাচ্ছেন তারা। এদের অনেককেই দেখা যায় পরিবার পরিজন নিয়ে গাড়ির জন্যে কাউন্টারে অপেক্ষা করতে। কেউ কেউ পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলেও  অনেকেই ঢাকায় এই প্রথম যাচ্ছেন।
আলশামীম কাউন্টারে ঢাকাইয়া গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করছেন জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজার ইউনিয়নের হরিনাকান্দি গ্রামের আলাউদ্দিনের ৮ সদস্যের পরিবার।  হালির হাওরে ১৭  কেয়ার জমি চাষ করেছিলেন আলাউদ্দিন। কিন্তু বাঁধ ভেঙ্গে সকল জমি পানির নিচে চলে গেছে। চাষের ৪ টি গরু পানির দামে বিক্রি করে এই প্রথম বার পরিবারের সকলকে নিয়ে ছুটছেন ঢাকা শহরে।
আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমি সব হারাইয়া  নিঃস্ব।  দেশে থাইক্কা পরিবার বাঁচানো যাইত না। ৪ টা গরু ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করে কামের লাগি ঢাকা যায়রাম। আল্লায় জানেন, এতজন মানুষ লইয়া কই গিয়া উঠমু।
মাটিয়ান হাওরের ৭ খানি জমি চাষ করেছিলেন নূর কাউন্টারে বাসের জন্যে অপেক্ষায় থাকা তাহিরপুর উপজেলার কাওকান্দি গ্রামের  ফারুক মিয়া। অকাল বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে ফসল হারিয়ে ৯ সদস্যের পরিবার পরিজন নিয়ে প্রথমবারের মত ঢাকায় যাচ্ছেন তিনি। ৫ টি গরু বিক্রি করে দেনা দায় কিছু শোধ করে বসতভিটা আত্মীয়দের জিম্মায় রেখে যাচ্ছেন তিনি।
ফারুক মিয়া বলেন, ঋণ করে এত জমি করছিলাম। পানি আইয়া আমার সকল ধান ডুবাইয়া নিছে।  এখন কিলা বাছতাম। ঘরে কোন টাকা ফয়সা নাই।  গরু বিক্রি কইরা পাওনাদারের কিছু টাকা দিছি। এখন বাচার লাগি পরিবারের হক্কলরে লইয়া ঢাকা যায়রাম।
এভাবে জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওরে চাষ করা কৃষক রেদু মিয়া, তাহিরপুর মাটিয়ান হাওরে জমি চাষ করা কৃষক রমজান আলী, সদর উপজেলার দেখার হাওরে জমি চাষ করা কৃষক সুলেমান মিয়া, কাংলার হাওরে জমি চাষ করা বেলাল হোসেনসহ একাধিক কৃষককে দেখা যায় টিকিট কাউন্টারে গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে।

  • [১]