বিন্দু তালুকদার
সারা দেশের ১৯৯টি বেসরকারি কলেজের সাথে বাদাঘাট ডিগ্রি কলেজ, দিগেন্দ্র বর্মণ ডিগ্রি কলেজ, ছাতক ডিগ্রি কলেজ, দিরাই ডিগ্রি কলেজ, ধর্মপাশা ডিগ্রি কলেজ, দোয়ারাবাজার ডিগ্রি কলেজ, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ, জামালগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ, শাল্লা ডিগ্রি কলেজ ও পাগলা মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজসহ ১০টি বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণ হচ্ছে। বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণের খবরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও জেলাবাসী খুশিতে উচ্ছসিত।
বেসরকারি কলজে সরকারিকরণের উদ্যোগটি অত্যন্ত মহৎ বলে স্বীকার করলেও এসব কলেজকে ভবিষ্যতে জেলার উপজেলা পর্যায়ের ৩টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মত চরম পরিস্থিতিতে পড়ার আশংকা করছেন অনেকেই। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, পূর্বে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়েছিল সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা গণহারে অন্য জায়গায় বদলী হয়ে গেছেন। সরকারি না হলে তারা প্রতিষ্ঠান ছাড়তে পারতেন না। কারণ হিসাবে অভিজ্ঝ মহল থেকে জানানো হয়, জেলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের একটি বড় অংশ অন্য জেলার। তাই তারা প্রথম সুযোগেই সুবিধাজনক জায়গায় বদলি হয়ে যান।
সরকারিকরণের পর থেকেই জেলার তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, জগন্নাথপুরের সরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও জগন্নাথপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষক সংকট শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি হলেও অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দৈন্যদশায় আছে বলে জানা গেছে। তবে বেসরকারি কলেজগুলোকে সরকারিকরণের পর ৫ বছরের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক অন্যত্র বদলী হতে পারবেন না বলে নীতিমালা জারী করেছে সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব কলেজ বেসরকারি থেকে সরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলির অধিকাংগুলোতে বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীর তেমন কোন সংকট নেই। কিন্তু সরকারিকরণের পর এসব কলেজের শিক্ষকরা দ্রুত অন্যত্র চলে যাবেন বলে আশংকা করছেন অনেকেই। যার বাস্তব উদাহরণ উপরে বর্ণিত জাতীয়করণকৃত তিনটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।
এছাড়া জেলার সরকারি দু’টি কলেজেও শিক্ষক সংকট লেগে আছে বলে জানা গেছে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের মোট শিক্ষকের পদ সংখ্যা ৫৪ জন , বর্তমানে আছেন ৪৬ জন। সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ১৬ জন শিক্ষকের স্থলে আছেন ১৩ জন। জেলা সদরের দুই সরকারি কলেজেও শিক্ষক সংকট দূর হচ্ছে না।
জানা যায়, তাহিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়, জগন্নাথপুর সরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও জগন্নাথপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বেসরকারি উদ্যোগে। পরে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করা হয়। সরকারিকরণের শুরু থেকেই শিক্ষক সংকট লেগেই আছে ওই তিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এছাড়া এসব সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের উদাসীনতা রয়েছে। চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এসব সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জেলা ও বিভাগীয় সদরের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে দুই শিফটে ২৫ জন করে ৫০ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। অথচ একই ক্যাটাগরির উপজেলা পর্যায়ের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পদ সংখ্যা অর্ধেক করে মাত্র ১১ টি রাখা হয়েছে। ১১ টি পদের মধ্যে কোন কোন বিদ্যালয়ে অর্ধেক বা তার চেয়ে কম সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত আছেন।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুরের সরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকের স্থলে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ জন, জগন্নাথপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জনের স্থলে ৪ জন, তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জনের স্থলে আছেন ৫ জন। এত কমসংখ্যক শিক্ষক দিয়েই চলছে সরকারি তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকটের নানা কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়রা।
তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৮৭ সালে সরকারিকরণ করা হয়। এর পর থেকেই শিক্ষক সংকট শুরু হয়েছে। বর্তমানের এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৭০ জন, কিন্তু প্রধান শিক্ষকসহ কর্মরত আছেন ৫জন। একজন অসুস্থ তাই ৪ জনকেই পাঠদান দিতে হয়। এই বিদ্যালয়টিকে পুনরায় আবারো বেসরকারি করার জন্য স্থানীয় এলাকাবাসী আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে সেসময় শিক্ষা বিভাগে হৈ-চৈ পড়েছিল।
জগন্নাথপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি, এই বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয় ১৯৮৬ সালে ১ ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে এই বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ৩৫৪ জন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ মোট শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৪ জন।
জগন্নাথপুর সরূপচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৬ সালে। ১৯৮৭ সালে এটি সরকারিকরণ হয়। বর্তমানে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩২৮ জন। শিক্ষক আছেন মাত্র ৩ জন।
কর্তৃপক্ষের দাবি উপজেলা পর্যায়ের সরকারি এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকতে চান না শিক্ষকরা। সরকারিভাবে বদলী হয়ে এখানেও আসার পরই আবারো অন্যত্র বদলী হয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থাকেন তারা। কেউ কেউ যোগদান না করেই চেষ্টা তদবির করে বদলী ঠেকান ও অন্য কোথায় যাওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবহেলিত ও মফস্বল এলাকার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংকট দূর করা ও গ্রামের শিক্ষার মানোন্নয়নে কেন্দ্রীয় সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। বিত্তশালী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানরা জেলা, বিভাগীয় ও রাজধানী শহরে লেখাপড়া করেন। তাই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কারো নজর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না।
তাহিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হেলিম ফকির বলেন,‘সরকারি উচ্চ বিদ্যালগুলোতে প্রধান শিক্ষকসহ ২৫টি পদ রয়েছে শিক্ষকের। অথচ উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকসহ মাত্র ১১ জন শিক্ষকের পদ রয়েছে। কিন্তু ১১ জনের স্থলে ৪ জনে পাঠদান দিচ্ছি। শিক্ষক সংকট নিয়ে আমরা কি যে সমস্যায় তা বলে বুঝানো যাবে না। কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসেই শূন্যপদের তালিকা চান। আমরা পাঠাই, কিন্তু শিক্ষক পাওয়া যায় না। উপজেলা পর্যায়ে কেউ বদলী হয়ে আসতে চায় না। কোন কারণে বদলী হয়ে আসলেও বেশী দিন থাকতে চান না। এভাবে কাঙ্খিত শিক্ষার মান ধরে রাখা যাবে না। ’
তিনি আরো বলেন,‘সরকারি স্কুল-কলেজেগুলোর এটাই বড় সমস্যা। উল্টোদিকে বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে এসব সমস্যা খুবই কম। কারণ তাদের বদলীর সুযোগ নেই। তাই বেসরকারি স্কুল-কলেজে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না। ’
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন,‘বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণ হওয়া খুবই ভাল একটা উদ্যোগ। কিন্তু সরকারিকরণ হওয়ার পর যদি বেসরকারি কলেজের চেয়ে শিক্ষার মানসহ সবকিছুই সংকটে পড়ে তাহলে মহা সমস্যা। কারণ এই জেলার দুই উপজেলার তিনটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এত দৈন্য দশা বিরাজমান যা বলে প্রকাশ করা যাবে না। শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ওই তিন স্কুল। তিনটি স্কুল যেভাবে চলছে এভাবে কোন সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। দিনে দিনে শিক্ষার মান কমছে। ৩জন শিক্ষক দিয়েও চলছে স্কুল।’
দিরাই কলেজের অধ্যক্ষ অনুকুল চন্দ্র দেব বলেন,‘বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণ করা হচ্ছে । এটি মহৎ উদোগ। কলেজগুলো সরকারিকরণের সাথে সাথেই নতুন আইন করা হয়েছে। ৫ বছরের আগে কোন শিক্ষক বদলী হতে পারবেন না। ৫ বছরের মধ্যে আরো অনেকইে শিক্ষকতা পেশায় আসবেন। সুতরাং আমার মনে হয় সরকারি যেহেতু উদ্যোগ নিয়েছেন শিক্ষক সংকটসহ সবকিছুই একটা নিয়মের ভেতরে রাখবেন। কলেজগুলো শিক্ষক সংকটে ভোগবে না।’
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন,‘বেসরকারি কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ ভাল। তবে এসব কলেজের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন পর যখন বদলীর সুযোগ পাবেন তখন বদলীর হিড়িক পড়ে যাবে। সবাই জেলা ও বিভাগীয় শহরে বদলী হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। কারণ আমাদের জেলা সদরের কলেজগুলোতেই শিক্ষক সংকট নিয়মিত লেগে আছে। তাই আমাদের ধারণা উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলো সরকারি হওয়ার পর শিক্ষক সংকটে পড়তে পারে।’
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিমল কান্তি দে বলেন,‘আমাদের এলাকার ১০টি বেসরকারি কলেজকে সরকারিকরণ করায় আমরা আনন্দিত। তবে কলেজের প্রতিটি শাখার জন্য শিক্ষকের পদ সৃষ্টি এবং শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে সরকারিকরণের সফলতা আসবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উচ্চ শিক্ষার সযোগ পাবেন। ’