- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জেলায় শিক্ষিত বেকার বাড়ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
করোনাকালে দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় অনেকটা দিশেহারা হাওরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিক্ষিত তরুণ-তরুণিরা। উপায় না পেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়েও কম মানের চাকুরিতে যোগদান করছেন তারা। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের তথ্য যাচাই করে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। গেল ১৪ নভেম্বর হওয়া এই নিয়োগে অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, বেয়ারার, মালি, কুক (বাবুর্চি)’এর শূন্য পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫১ জনই উচ্চশিক্ষিত। এরা সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের সদস্য। সকল প্রক্রিয়া শেষে আজ সোমবার এরা নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদান করবে।
জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ঘোষগাঁও গ্রামে মাস্টার্স পড়–য়া তরুণ জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি। ২০১৫ সালে জাহাঙ্গীরের বাবা আছদ্দর আলী মারা গেছেন। এরপর থেকেই সংগ্রাম শুরু জাহাঙ্গীরের। সিলেট শহরে টিউশনি এবং পড়াশুনা একসঙ্গে চালিয়ে নিজের খরচ এবং পরিবারের খরচ চালিয়েছে সে। সিলেটের এমসি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পাস করে মাস্টার্সে একই কলেজে ভর্তি হবার আবেদন করেছে সে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সে।
বললো, আমি ক্লান্ত, করোনাকালে টিউশনি হারিয়ে বেশি বিপদে পড়েছিলাম, ছোট ভাই এমসি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। ছোট বোন জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়েছি। তাদের খরচ, আমার খরচ, পরিবারের খরচ সবকিছু চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। কোন পদে চাকুরি হচ্ছে এটি বিচার করার সময় নেই, পরীক্ষা দিয়েছি সরকারি চাকুরিতে নিয়োগ হয়েছে, আমি চেষ্টা করবো চাকুরি করেই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে।
দিরাইয়ের বোয়ালিয়া বাজারে বাড়ি সঞ্জয় চক্রবর্তী’র। বাবা দরিদ্র ব্রাহ্মণ। বাবার উপার্জনে সংসারের ঘানি টানা বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগেই। সিলেট শহরে টিউশনি করে নিজের খরচ, অনার্স পড়–য়া দুই ভাইয়ের এবং স্কুলে পড়–য়া বোনের খরচ চালায় সঞ্জয় একাই। দুই বছর আগে ইংরেজিতে মাস্টার্স শেষ করেছে সঞ্জয়। সংসারের খরচ চালানোসহ সরকারি চাকুরি পাবে কি না, এমন হতাশাতেই ছিল সে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়কের চাকুরি পেয়ে তৃপ্ত সঞ্জয় বললো, চাকুরি আমার বড় বেশি প্রয়োজন ছিল, এই চাকুরিতেই এখন খুশি আমি। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে এটিই হয়তো হত না।
ধর্মপাশার সেলবরষ ইউনিয়নের বীর উত্তর গ্রামের জুবায়ের পাশা ইমনের বাবা শফিক মিয়া দিনমজুর। বড় ভাই ফরিদ মিয়াও দিন মজুর। বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র জুবায়ের ও তার বোন অনার্সের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীকে অতিকষ্টে খরচ যোগান বাবা। অফিস সহায়কের চাকুরি পেয়ে সন্তোষ্ট এই পরিবারের সকলে। জুবায়ের বললো, চাকুরি না হলে আমাকেও বাবার সঙ্গে অন্যের কাজে যেতে হতো।
রামকৃষ্ণ চক্রবর্তীর বাড়ি জেলার মধ্যনগরের করুয়াজান গ্রামে। অসুস্থ বাবা ও দোকান কর্মচারী ভাইকে সহযোগিতা করার জন্য কয়েকবছর আগে থেকেই টিউশনি শুরু হয়েছে তার। গেল জুলাই মাসে বাবা মারা যাবার পর তার উপর চাপ আরও বেড়েছে। বললো, সিলেটের এমসি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছি। কোথাও নিয়োগ হচ্ছে শুনলেই পরীক্ষা দিচ্ছি, চাকুরি হচ্ছে না। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়কের নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েও চাকুরি হবে কি না চিন্তিত ছিলাম। নিয়োগ হওয়ায় খুশি আমি।
শ্রাবণী দাসের মেকানিক্স বাবা এখন আর কোন কাজ করতে পারেন না। শ্রাবণীর বড় বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স পাস করে গ্রামের বাড়ি সাচনাবাজারে টিউশনি করে সংসার চালায় শ্রাবণী। বললো, চাকুরিটা হওয়ায় সুবিধা হয়েছে, সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সুবিধা হবে।
দোয়ারাবাজারের বর্গাচাষী রহমত আলীর ছেলে জাকির হোসেন বিএ পাস করে বিপিএড সম্পন্ন করেছেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার বড় জাকির হোসেন টিউশনি করেই নিজের ও ভাই বোনের পড়াশুনার খরচ চালিয়েছেন। সংসারের খরচ চালাতেও বাবাকে সহযোগিতা করেছেন। গেল ১৪ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর চাকুরি হয়েছে তার। আজ সোমবার থেকে এই পদে কাজ শুরু হবে জাকিরের।
বললেন, আমি তৃপ্ত, সরকারি চাকুরি পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম অনেক দিন ধরেই। কাজকে ছোট করে দেখি না আমি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে কুক (বাবুর্চি’র)’এর নানা প্রশিক্ষণ দিয়েছেন জেলার বিশ^ম্ভরপুরের রহিমপুর গ্রামের আব্দুল মোতালিব। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিয়োগে কুক’এর চাকুরি পেয়ে খুশি মোতালিব। বললেন, এটা করবো না, ওটা করবো বলে বেকার থাকার চেয়ে যেখানেই যে কাজ পাওয়া যায়, সেটিই করা উচিৎ, তাহলে বেকারত্বের সংখ্যা কমে যাবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেল ১৪ নভেম্বর অফিস সহায়ক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী কিংবা কুক বাবুর্চি পদে কেবল নয়, মালি, বেয়ারার ও নিরাপত্তা প্রহরীর ৫১ পদেই সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত তরুণ তরুণির চাকুরি হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, নিয়োগপ্রাপ্ত সকলেই কাজে যোগদানের জন্য সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আজ সোমবার এরা কাজে যোগদান করবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)’এর জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে বললেন, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ না হওয়ায় চাকুরির বয়স অতিক্রান্ত হবার ভয় কাজ করছে উচ্চ শিক্ষিত তরুণ তরুণীদের। একারণে জীবন রক্ষার তাগিদ থেকে কেউ কেউ অপেক্ষাকৃত ছোট পদে চাকুরি নিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, চতুর্থ শ্রেণির এই নিয়োগ কার্যক্রম অনেক আগে শুরু হয়েছিল। এটি শেষ হয়েছে আমার সময়কালে। নিয়োগ পরীক্ষা নেবার ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে। প্রশ্ন করা থেকে শুরু করে, কেন্দ্রে প্রশ্ন পৌঁছানো, উত্তরপত্র দেখা, মৌখিক পরীক্ষা সব কিছুতেই সততা, জবাবদিহিতা ছিল, সর্বাধুনিক পদ্ধতিতেও কাজ হয়েছে। সকলেই নিজ যোগ্যতায় চাকুরি পেয়েছে। নিয়োগ পাওয়া প্রায় সকলেই সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সদস্য।

  • [১]