- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

জড়িত ৫ রাজাকার জেল হাজতে

বিশেষ প্রতিনিধি
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভাটী অঞ্চলে বা হাওরাঞ্চলের মর্মস্পর্শী ঘটনার অন্যতম ছিল পেরুয়া- শ্যমারচর গণহত্যা। ৪ ডিসেম্বর (১৭ অগ্রহায়ণ) এই গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল। দিরাই উপজেলার পেরুয়া- শ্যামারচরবাসীর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল এটি। এই দিনে পেরুয়া-শ্যামারচরের ২০ জন নিরীহ বাঙালি গণহত্যার শিকার হন এবং কমপক্ষে ২০ জন নারী নির্যাতনের শিকার হন। কয়েক’শ ঘরবাড়িতে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এটিই সবচেয়ে লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞ ছিল।
এই ধংসযজ্ঞে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এলাকার সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসাবে পরিচিত ‘পেরুয়া বড়বাড়ি’। পেরুয়া বড়বাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেওয়া হয়েছিল। এই গণহত্যা এবং পৈশাচিক নির্যাতনের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষীরা জীবিত থাকায় এই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকায় গত বছর ৫ জন নির্যাতিতা নারী বীরাঙ্গনার সম্মান পেয়েছেন। পাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় ভাতাও।
এঁরা হলেন- পেরুয়া গ্রামের শহীদ গুঞ্জর আলী’র (পাক হায়েনার দোসর রাজাকারদের হাতে নিহত) স্ত্রী কুলসুম বিবি। তিনি ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান। একই গ্রামের ব্রজেন্দ্র দাস’এর (যার বুকের পাশ থেকে রাজাকারদের ছুঁড়া গুলি যুদ্ধের ৪৩ বছর পর বের করা হয়) স্ত্রী প্রমিলা দাস, তিনি ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান, উজানগাঁওয়ের আলকাছ মিয়া’র স্ত্রী জমিলা বেগম, তিনি ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান, একই গ্রামের কাছন মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান ২০১৮ সালের ১২ নভেম্বর, একইগ্রামের মুক্তার আলীর স্ত্রী মুক্তা ভানু রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পান ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর। আরও দুজন বীরাঙ্গনাকে স্বীকৃতি দেবার বিষয়টি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
নিজের বাবা-কাকাসহ স্বজনরা এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে খুন হয়েছেন দাবি করে প্রায় ৩ বছর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন পেরুয়ার মুক্তিযোদ্ধা রজনী কান্ত দাস।
তাঁর এই অভিযোগ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়। পরে জীবিত যুদ্ধাপরাধী ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়।
এই মামলার ৫ আসামী উজান দৌলতপুরের আব্দুল খালেকের ছেলে আমেরিকা প্রবাসী জুবের আহমদ, শ্যামারচরের ইমাম জলিল, আব্দুর রশিদ, শাল্লা উপজেলার সুলতানপুরের জাকির হোসেন, একই উপজেলার শশারকান্দার সিদ্দিক মাস্টারকে গত বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আটক করে পুলিশ। এই ৫ জনই কারাগারে আছেন।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা এএসপি নূর হোসেন মঙ্গলবার বিকালে জানান, এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে। চার্জ গঠন হচ্ছে। সম্ভবত. আগামী মাসে স্বাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে আদেশের পর্যায়ে চলে যাবার কথা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পেরুয়া-শ্যামারচরের হত্যাকা-ে পাকবাহিনীকে দেখেন নি তারা। এখানকার হত্যাকা-, লুটপাট, নারী নির্যাতন এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েক’শ রাজাকার অংশ নিয়েছিল। ৪ ডিসেম্বর ভোর ৪ টায় প্রথম এরা পেরুয়া গ্রামের রাম কুমার রায়ের বাড়িতে আক্রমণ চালায়। রাজাকাররা রামকুমার রায়ের ভাই হেমচন্দ্র রায়, পুত্র চিত্তরঞ্জন রায়সহ পরিবারের ৫-৬ জনকে হত্যা করে। গ্রামের লোকজন কেউ নৌকায়, কেউ পায়ে হেঁটে সাঁতার কেটে পাশের জলধার হাওরের পুতায় আশ্রয় নেয়। হামলাকারী রাজাকাররা পরে জলধার পুতায় গিয়ে হানা দেয়। ওখান থেকে কেউ কেউ সাঁতার কেটে প্রাণে বাঁচলেও ৪ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেকেই প্রাণ হারান। এই হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ব্রজেন্দ্র দাস গুলি খেয়ে এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর শরীরে দীর্ঘদিন গুলি ছিল। ৫ বছর আগে তিনি গুলি অপসারণ করেছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই হত্যাকা- যারা চালিয়েছিল, কেউ কেউ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রভাব পাকিস্তান সময়কালের মতোই ছিল।
পেরুয়া-শ্যামারচর হত্যাযজ্ঞে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের পহেলা জুন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেনের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের তদন্তদল প্রথম দফায় ৪ দিন অবস্থান করে সরেজমিনে তদন্ত চালানো হয়। এরপর কয়েক দফা তদন্ত শেষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
পেরুয়ার বাসিন্দা কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলে আশ্রয় নিয়ে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করে। তাদের ভয়ে শ্যামারচর গণহত্যা দিবস উদ্যাপন হতো না। ২০১২ সাল থেকে আমরা কয়েকজন গণহত্যা দিবস পালন করি। কিন্তু তথ্যে কিছুটা ভুল ছিল, আমরা পালন করতাম ৬ ডিসেম্বর। এটি ভুল ছিল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাপঞ্জিতে দেখা যায় শ্যামারচর গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে ৪ ডিসেম্বর, বাংলা ১৭ অগ্রহায়ণ। এইজন্য এবার থেকে ৪ ডিসেম্বর শ্যামারচর-পেরুয়া গণহত্যা দিবস পালন করা হবে। এবার শ্যামারচর বাজারের পশ্চিম সীমান্তে সুরমা নদীর পূর্বপাড়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও আলোচনা সভা হবে।

  • [১]