- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

টাঙ্গুয়ায় কমেছে প্রাণ প্রকৃতি

স্টাফ রিপোর্টার
বিশ্বব্যাপী আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করতেই জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি ২২ মে দিনটি বিশ্ব জীব বৈচিত্র্য দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে। সারা বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ সেল ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২২ মে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বায়োডাইভার্সিটি (সিবিডি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর ৫ জুন ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর ধরিত্রী সম্মেলনে সিবিডি বিভিন্ন দেশের স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১৬৮ টি দেশ সিবিডি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং সিবিডি ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। বর্তমানে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশের সংখ্যা ১৯৫টি। জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ২৯ ডিসেম্বর কে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত পালন করা হয়। কিন্তু ডিসেম্বর শেষ সপ্তাহে নানা ধরনের ছুটি থাকায় ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছর ২২ মে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বাংলাদেশকে বলা হয় জলাভূমির দেশ। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম নিদর্শন হলো আমাদের জলাভূমিসমূহ। বাংলাদেশের উত্তর—পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলার জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ মিঠা পানির টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের ২য় রামসার এলাকা। ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া, জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে সারি সারি হিজল—করচ শোভিত, পাখিদের কলকাকলি মুখরিত টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম। টাঙ্গুয়ার হাওরে রয়েছে ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী রয়েছে, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি এবং ২১ প্রজাতির সাপ।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা ও ২০০০ সালে রামসার সম্মেলনে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০৩ সাল থেকে ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসার সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে। তবে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক শ্রেণির অসাধু লোক চুরি করে মাছ ও পাখি শিকার এবং বন জঙ্গল কেটে উজার করছে। প্রশাসনের হাতে মাঝে মাঝে ধরাও পড়ে জীব বৈচিত্র বিপন্নকারী এসব মানুষ।
রাতের বেলায় টর্চ জ্বালিয়ে পাখি শিকার করারও অভিযোগ আছে। জ্বালানি হিসেবে অবাধে কেটে নেওয়া হচ্ছে নলখাগড়া, চাইল্যাবন, হিজল—করচ গাছের ডালপালা। এতে উজাড় হচ্ছে ঘন সবুজ বন। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে হাওরের নিচের জলজ প্রাণি এবং উদ্ভিদ নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলে ওপার থেকে নেমে আসা বালির কারণে ভরাট হচ্ছে হাওর ও তৎসংলগ্ন নদী। এছাড়াও হাওরে পর্যটকদের ফেলে দেয়া প্লাস্টিকের থালা, পলিথিন, চিপস—চানাচুরের প্যাকেট ও সংরক্ষিত এলাকায় উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোয় পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হাওর পাশ^র্বর্তী হোটেলে খাবারের বিশেষ আইটেম হিসেবে দেখানো হয় অতিথি পাখির মাংস। এতে বিপন্ন হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীব বৈচিত্র্য।
টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বৃহত্তম গ্রুপ জলমহালগুলোর অন্যতম। বর্তমানে মোট জলমহাল সংখ্যা ৫১টি এবং মোট আয়তন ৬,৯১২.২০ একর। তবে নলখাগড়া বন, হিজল করচ বনসহ বর্ষাকালে সমগ্র হাওরটির আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২০.০০০ একর। টাংগুয়ার হাওর প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ। এই হাওর শুধু একটি জলমহাল বা মাছ প্রতিপালন, সংরক্ষণ ও আহরণেরই স্থান নয়। এটি একটি মাদার ফিশারী। হিজল করচের দৃষ্টিনন্দন সারি এই হাওরকে করেছে মোহনীয়। এছাড়াও নলখাগড়া, দুধিলতা, নীল শাপলা, পানিফল, শোলা, হেলঞ্চা, শতমূলি, শীতলপাটি, স্বর্ণলতা, বনতুলসী ইত্যাদি সহ দু’শ প্রজাতিরও বেশী গাছগাছালী রয়েছে এই প্রতিবেশ অঞ্চলে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরে এসে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখেন।
শীত মৌসুমে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ব্যাপক পাখির আগমন ও অবস্থানে মুখরিত হয় টাঙ্গুয়ার হাওর। বিলুপ্ত প্রায় প্যালাসেস ঈগল, বৃহদাকার গ্রে—কিংষ্টর্ক, শকুন এবং বিপুল সংখ্যক অতিথি পাখি ছিল টাঙ্গুয়ার হাওরের অবিস্মরণীয় দৃশ্য। স্থানীয় জাতের পাখি পানকৌড়ি, কালেম, বৈদর, ডাহুক নানা প্রকার বালিহাঁস, গাংচিল, বক, সারস প্রভৃতির সমাহারও বিস্ময়কর। টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ—পাখী এবং উদ্ভিদের পরস্পর নির্ভরশীল এক অনন্য ইকোসিস্টেম। মাছের অভয়াশ্রম হিসাবে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী।
এ বছরের প্রথম দিকে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, বন বিভাগ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের যৌথ পর্যবেক্ষণ বলছে, বিশ্বের ৭টি দেশ থেকে এসব পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশে আসে। ওই সব দেশের মাটি—পানি বরফ আচ্ছাদিত হয়ে পড়ায় তারা খাবারের আশায় এ দেশে আসে। দেশের হাওর এলাকায় সার প্রয়োগ কম হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে সেখানে আসা পরিযায়ী পাখিদের বিষ্ঠা প্রাকৃতিক সার হিসেবে ভূমিকা রাখে। ফলে হাওরে ধান ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও এসব পাখি ভূমিকা রাখছে।
যৌথ জরিপে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রাণ—প্রকৃতি কমে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এর আগের শীত মৌসুমের তুলনায় গেল শীত মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির বিচরণ কমেছে প্রায় ৩২ হাজার। এবার ২৭ হাজার ১৭০টি পাখি গণনা করা হয়। এর আগে ২০২১ সালে পাখির সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ৭৪টি। ২০২০ সালে ৫১ হাজার ৩৬৮টি, ২০১৯ সালে এক লাখ ৪৬ হাজার ৩০টি, ২০১৮ সালে ৫৯ হাজার ৫৪২টি, ২০১৭ সালে ৯১ হাজার ২৩৬টি, ২০১৬ সালে ৪২ হাজার ৫৫৮টি এবং ২০১৫ সালে ৫২ হাজার ২৯৯টি পাখি গণনা করা হয়।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রজত কান্তি সোম (অধ্যাপক, উদ্ভিদবিদ্যা) বলেন, টাঙ্গুয়ায় শুধু মাছই নয়, আগের মতো পাখ—পাখালি কিংবা অন্য জীবজন্তুও কমে গেছে। কমছে সবুজও। ঠিকমতো সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে পাখি ও মাছসহ অনেক প্রজাতি। অনেকেই জানে না পাখির মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। পাখি মারলে পরিবেশ বিপন্ন হবে। এছাড়াও টাঙ্গুয়ার হাওর বিপন্নের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনও অনেকটা দায়ী। তিনি বলেন, যারা পাখি ও মাছ শিকার করেন তারা এই দেশেরই অসহায় মানুষ। তাদের জন্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে তারা আর পাখি আর মাছ শিকার করবে না। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য সামাজিক নেতৃবৃন্দ সহ সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

  • [১]