- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

টাঙ্গুয়ার হাওরে ১০ হাজার হিজল-করচ গাছ রোপণ-রোপিত গাছের অপমৃত্যু রোধ করতে হবে

মুজিববর্ষ উপলক্ষে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে ১০ হাজার হিজল-করচ গাছ রোপণের কর্মসূচী গৃহীত হয়েছে। এই লক্ষে মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক হাওরে বৃক্ষ রোপণের উদ্বোধন করেছেন। হিজল ও করচ গাছ জল সহনশীল। এই গাছ হাওরের ঢেউয়ের হাত থেকে হাওর তীরবর্তী গ্রামগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। এই গাছ পাখির আশ্রয়স্থল হিসাবে কাজ করে। টাঙ্গুয়ার হাওরে অতিথি পাখির আধিক্য ও দুর্লভ প্রজাতির পাখিকূলের যে সমৃদ্ধি একসময় ছিল তার পিছনে এই হিজল-করচ গাছের ভূমিকা অপরিসীম। এইসব গাছের ডাল-পালা স্থানীয় মানুষের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে। সব মিলিয়ে হাওরের পরিবেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হিজল-করচ গাছের কোনো বিকল্প নেই। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরে ১০ হাজার হিজল-করচ চারা রোপণের কর্মসূচীটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
হাওরে অনাদি কাল থেকে এইসব হিজল-করচ গাছ ছিল। ছিল বলেই টাঙ্গুয়ার হাওরটি পাখি, মাছ ও প্রাণ বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ অঞ্চল হতে পেরেছিল। কিন্তু বেশি দিন নয়, মাত্রই কয়েক দশকে এই হাওর উজাড় হয়ে গেছে। হিজল-করচ গাছগুলো নির্বিচারে কেটে চুরি করা হয়েছে। মাঝখানে বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে হাওরে নতুন করে কিছু হিজল-করচ গাছ লাগানো হয়েছিল বটে তবে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জোরদার ব্যবস্থার অভাবে হাওরে সবুজ বেষ্টনী গড়তে সহায়ক হয়নি। হাওর তীরবর্তী মানুষকে হাওরের অংশীজনে পরিণত করা যায়নি। তাই ইজারাপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকেই হাওরের মৎস্য ও বৃক্ষসম্পদ লুণ্ঠনে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বলাবাহুল্য তীরবর্তী অঞ্চলের লোকজনই এই লুণ্ঠনপ্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন। টাঙ্গুয়ার হাওর মৎস্য প্রজননের উৎকৃষ্ট স্থান। কিন্তু এখন হাওরে কোনো মাছই নেই। অতিথি পাখিরাও বিদায় নিয়েছে। বিলুপ্ত প্রজাতির শকুন এখন আর দেখা যায় না হাওরে। এসবই হয়েছে ভুল নীতি অথবা সঠিকভাবে নীতি প্রয়োগের অভাবে। আসলে হাওর তীরবর্তী মানুষ যদি এই হাওরকে নিজের সম্পদ বিবেচনা না করেন তাহলে হাওরকে রক্ষা করা সত্যিই কঠিন কাজ হবে। এই প্রেক্ষাপটে হাওরে যে ১০ হাজার গাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেটি সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে উঠবে তখনই যখন রোপিত গাছগুলো বড় হয়ে উঠার সুযোগ পাবে। এই কাজ প্রশাসনের পক্ষে নিশ্চিত করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশাল হাওর এলাকা সামান্য কয়েকজন পুলিশ দিয়ে পাহারা দেয়ার চিন্তাও হবে অবিবেচনাপ্রসূত।
হাওর রক্ষায় হাওর তীরবর্তী মানুষকেই সম্পৃক্ত করতে হবে। কথা হচ্ছে কোন্ উপায়ে এটি করা যায়। প্রথম হচ্ছে হাওরকে মানুষ নিজের সম্পদ মনে করবে। এজন্য সম্পদের উপর তার সত্ত্ব প্রতিষ্ঠা ও এ থেকে কিছু সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক মালিকানার বিষয়টি আমাদের দেশে এবং পৃথিবীর বহু দেশে সার্থকভাবে পরীক্ষা করে এর সুফল পাওয়া গেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
হাওর অঞ্চলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে হলে টাঙ্গুয়ার হাওরকে অবশ্যই পূর্বের অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এতে হাওরের উৎপাদন ও বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে। হাওরের স্বাভাবিক চরিত্রে বিনষ্ট করে সেখানে ইকো-ট্যুরিজম বা এ ধরনের চিন্তা হবে সর্বনাশা। বরং হাওরের মূল সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা গেলে মানুষ এখানে দলে দলে বেড়াতে আসবেন।
সর্বশেষে বাঙালি জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীকে সামনে রেখে টাঙ্গুয়া হাওরে যে ১০ হাজার হিজল-করচ গাছ লাগানো হবে সেগুলো যাতে বড় হয়ে হাওরের প্রতিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আকাক্সক্ষা আমাদের। লাগানোর অল্প কয়দিন পরেই যদি এগুলো বিলুপ্ত, লুণ্ঠিত হয়ে পড়ে তাহলে হাওরের জন্য এর চাইতে বড় অমঙ্গল আর কিছু হতে পারে না। এতে বঙ্গবন্ধুর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নটিও হুছট খাবে।

  • [১]