দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্দ্ধগতিতে জনজীবনে যখন নাভিশ্বাস উঠার অবস্থা ঠিক তখন সরকার সারা দেশে প্রান্তিক পরিবারগুলোর কাছে ন্যায্যমূল্যে নির্ধারিত কয়েকটি নিত্যপণ্য বিক্রির জন্য কার্ড ইস্যু করা শুরু করেছেন। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা এক কঠিন কাজ। এখানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় অনেক বেশি। দাম বাড়ানোর পিছনে সিন্ডিকেটবাজিকে দায়ী করা হয়। ব্যবসার এমন অমানবিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে হিমসিম খেতে হয়। ব্যবসায়ীরা এতটাই শক্তিশালী থাকে যেখানে সরকার কিছু করতে গেলে বরং তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরিস্থিতি বেসামাল করে দিতে পারে। এরকম অবস্থায় সরকার যেটা করতে পারে তা হলো বাজারে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ বাড়িয়ে ভর্তুকিমূল্যে জনসাধারণের নিকট তা পৌঁছে দেয়া। টিসিবি’র মাধ্যমে সরকার এ কাজটা করে থাকে। টিসিবি’র মাধ্যমে পণ্য বিক্রির প্রচলিত ব্যবস্থাটি বেশ ত্রুটিপূর্ণ। একে সরবরাহ থাকে একেবারেই কম, তারপর বিক্রির সময় কোন নিয়ম কানুন পালন করার অবকাশ থাকে না। ট্রাকের সামনে যারাই দাঁড়িয়ে থাকেন তারাই কিনতে পারেন জিনিস। একই ব্যক্তি কয়েক বারও কিনে থাকেন। টিসিবি’র স্বল্প বা ন্যায্যমূল্যের সুবিধা কারা পাবে তার কোন মানদ- ছিল না। টিসিবি’র পণ্য বিক্রির এই দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার এখন ফ্যামেলি কার্ড প্রথা চালু করতে যাচ্ছে। এজন্য ইউনিয়নে ইউনিয়নে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার ১১ উপজেলায় ১ লাখ ১৪ হাজার পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে। নিত্যপণ্য হিসাবে নির্ধারিত পরিমাণ চাল, ডাল, তেল, আটা ও চিনিসহ ছয় প্রকারের দ্রব্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বছরে চারবারÑ এপ্রিল মাসে দুইবার ও জুলাই মাসে দুইবার চিহ্নিত উপকারভোগীদের মাঝে এই পণ্য বিক্রির সাময়িক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। সামনে রমজান মাস আসছে। রমজান ও দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির মাঝে এই ব্যবস্থা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে সক্ষম হবে বলে আমাদের ধারণা।
কর্মসূচীর সফলতা নির্ভর করে এর সঠিক ব্যবস্থাপনার উপর। বাংলাদেশে এই জায়গায় ভারসাম্য বজায় রাখা এক কঠিন কাজ। প্রকাশিত সংবাদেও এই ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির বিষয়টি উঠে এসেছে। উপকারভোগী চিহ্নিতকরণের কাজটি করছে ইউনিয়ন পরিষদ। এ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠে এসেছে। মেম্বাররা তালিকা দিলে তা চেয়ারম্যাণ গ্রহণ করছেন না, অনেকক্ষেত্রে ওয়ার্ড মেম্বারদের এড়িয়ে চেয়ারম্যানরা এককভাবে তালিকা তৈরি করছেন বলে সংবাদে তথ্য উঠে এসেছে। একটি জনবান্ধব কর্মসূচীর শুরুতেই এমন সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠা দুর্ভাগ্যজনক। ইউনিয়ন পরিষদগুলো সবে মাত্র নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শুরুতেই চেয়ারম্যানের সাথে মেম্বারদের সমন্বয়হীনতা তৈরি হলে পরিষদ কার্যকর হয়ে উঠতে পারবে না। উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে ওয়ার্ড মেম্বারদেরই দায়িত্ব দেয়া উচিৎ। তাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত তালিকা পরিষদের সভায় যাচাই বাছাই অন্তে চূড়ান্ত হবে। সভায় অযোগ্য কেউ তালিকাভুক্ত হলে বাদ দেয়া কিংবা যোগ্য কেউ বাদ পড়লে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এইভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা হবে। কিন্তু চেয়ারম্যানরা নিজের প্রাধান্য বজায় রাখতে কিংবা নিজস্ব লোকদের সুবিধা পাইয়ে দিতে অনেক সময় মেম্বারদের এড়িয়ে চলেন। মেম্বারদের বিরুদ্ধেও তালিকা তৈরির নামে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এমন চর্চা থেকে সরে আসতে হবে। তারা যদি নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করেন কিংবা তাদের তালিকা নিয়ে যদি এন্তার অভিযোগের পাহাড় তৈরি হয় তাহলে তাদের হাত থেকে ক্ষমতাটি ছুটে যেতে সময় লাগবে না। এই বিষয়টি তার্দে বুঝতে হবে।
একটি জনবান্ধব কর্মসূচীর সফলতার জন্য জনপ্রতিনিধিদের জনমুখী ভূমিকা কাম্য।