বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে কাছাকাছি এলাকায় ডিলার পয়েন্ট না থাকা, ডিলারদের স্বজনপ্রীতি, হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে একসঙ্গে ৪৭০ টাকার ব্যবস্থা করতে না পারাসহ নানা কারণেই অনেক কার্ডডারীরা কিনতে পারছে না টিসিবির পণ্য। হতদরিদ্র বা নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকির খাদ্যপণ্য চলে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত সামর্থবানদের হাতে। টিসিবির পণ্য বিতরণে অনিয়মের প্রতিবাদে শুক্রবার দোয়ারাবাজারের দোহালিয়ায় বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে।
পবিত্র মাহে রমজান ও নিত্যপেণ্য মূল্যের বৃদ্ধির এই সময়ে স্বল্প আয়ের মানুষকে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেবার জন্য সারাদেশের মতই জেলার ৮৪ জন ডিলারের মাধ্যমে এক লাখ ১৪ হাজার ৯১০ জন কার্ডধারীর জন্য দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা ও দুই লিটার করে সোয়াবিন পৌঁছে দেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু এই পণ্য অনেক কার্ডধারীই কিনতে পারেন নি। ডিলার পয়েন্টে যেতে পরিবহন খরচ, ডিলারের পয়েন্টে গিয়ে মালামাল না পেয়ে ফেরৎ আসা এবং একসঙ্গে ৪৭০ টাকা মেলাতে না পারায়ও অনেকে এই পণ্য কিনতে পারনে নি।
দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়নের আমবাড়ি বাজারের আব্দুল্লা মিয়া জানালেন, দুই দিন আগে টিসিবি’র পণ্য কিনতে কার্ড হাতে নিয়ে ডিলারের কাছে গিয়ে মালামাল না পেয়ে ফেরৎ এসেছেন তারা কয়েকজন। ডিলারের লোকজন বলেছেন, মালামাল দেওয়া শেষ, তাদেরকে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি জানালেন, টিসিবির মালামাল কিনতে আগে গেলে বলা হয়, দূরের মানুষকে আগে দিতে হবে। পরে গেলে বলা হয় মালামাল শেষ। গেল তিন কিস্তিই তিনি মাল তুলতে পারেন নি দাবি করলেন।
আমবাড়ি বাজারের টিসিবি ডিলার ভানু রঞ্জন দাস বললেন, আব্দুল্লা মিয়া টিসিবি কার্ডধারী এটি সত্য, কিন্তু তিনি মালামাল নিতে এসেছেন সন্ধ্যা বেলায়। এর আগেই কার্ডধারীদের কাছে বিক্রির পর কিছু মালামাল ছিল, ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য অন্য কিছু মানুষকে আইডি কার্ড দিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করায় তাদের দেওয়া হয়েছে।
জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য দেবাশিষ তালুকদার বললেন, ইউনিয়নের এক ও দুই নম্বর ওয়ার্ড থেকে বেহেলী যেতে-আসতে ১৫০ টাকা খরচ হয়। সময় লাগে চার-পাঁচ ঘণ্টা। কম দামের ৪৭০ টাকার পণ্য কিনে যে টাকা বাঁচাবে, পথ খরচ এর চেয়ে বেশি টাকা লাগে। সকালে যেতে হয় ফিরতে হয় বিকালে। এজন্য আমাদের দুই ওয়ার্ডের কোন কার্ডধারী ওখানে পণ্য কিনতে যান না। তিনি জানালেন, ডিলাররা ইচ্ছে করলে ইউনিয়নের মাহমুদপুর থেকে মালামাল দিতে পারতেন, কিন্তু তারা সেটি করেন না।
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা হোসেন আহমদ সৌরভ বললেন, টিসিবির চার প্রকার পণ্য কিনলে বাজার দরের চেয়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কমে কেনা যায়। আমরা যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রী অনেক বড় সুযোগ করে দিয়েছেন এটি। কিন্তু অনেকের পক্ষে ৪৭০ টাকা একসঙ্গে মেলানো সম্ভব হয় না। আমি নিজেই এই টাকা মেলাতে পারি নি।
দোয়ারাবাজারের দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শামীমুল ইসলাম শামীম টিসিবির পণ্য কার্ডধারীদের মধ্যে বিতরণ না করে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অন্য কিছু মানুষের মধ্যে বিক্রি করেন। এতে শতাধিক কার্ডধারী পণ্য পান নি। এসময় ইউপি সদস্য জিয়াউল ইসলাম কার্ডধারী ছাড়া বিক্রির প্রতিবাদ করায় চেয়ারম্যানের সমর্থকরা তার উপর আক্রমণ চালায়। এ ঘটনায় শুক্রবার দোহালিয়া বাজারে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।
দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শামীমুল ইসলাম শামীম অবশ্য বলেছেন, এই অভিযোগ সত্য নয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তার বিরুদ্ধে এসব বলা হচ্ছে।
কেবল জামালগঞ্জের বেহেলি, দোয়ারাবাজারে আমবাড়ি বা দোহালিয়ায় এই সমস্যা নয়। জেলাজুড়েই এসব সমস্য রয়েছে।
মধ্যনগরের বংশিকু- (উত্তর) ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাসেল আহমদ জানালেন, তার ইউনিয়নের ডিলার পয়েন্ট বংশিকু-া বাজারে। ইউনিয়নের অনেক এলাকার জন্য এটি দূরবর্তী হয়। রমজান উপলক্ষে প্রথম কিস্তির টিসিবির পণ্য অনেক কার্ডধারী নিতে আসেন নি। ডিলার তার কাছে ফোন দেন। পরে কিছু মানুষকে ভোটার আইডি কার্ডসহ স্লিপ দিয়ে পাঠাতে বললেন, এরপর সেভাবেই পণ্য বিক্রয় হয়। এই ইউপি চেয়ারম্যান প্রত্যন্ত এলাকায় ডিলার পয়েন্ট বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মন্তব্য করলেন।
টিসিবির সিলেট বিভাগের শেরপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ইসমাইল হোসেন জানালেন, সুনামগঞ্জের এক লাখ ১৪ হাজার ৯১০ জন কার্ডধারীর জন্যই প্রথম কিস্তির এক কেজি করে চিনি, দুই কেজি ডাল, এক কেজি ছোলা ও দুই লিটার সোয়াবিন দেওয়া হয়েছে। আজ রোববার এবং আগামীকাল সোমবার আবার সুনামগঞ্জ শহরের চারজন ডিলারকে পণ্য দেওয়া হবে। এরা হচ্ছেন আকিকুর রহমান, লোকমান হোসেন, রফিকুল ইসলাম ও নৃপতি ট্রেডার্স।
জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বললেন, সরকার স্বল্প আয়ের মানুষের হাতে কম মূলে টিসিবির পণ্য পৌঁছে দেবার জন্যই এই কর্মসূচী চালু করেছে। ডিলাররা যেখানে সকল মানুষ আসতে সুবিধা সেখান থেকে বিক্রয় এবং সর্বশেষ সময় পর্যন্ত কার্ডধারী’র জন্য ডিলারকে অপেক্ষা করতে হবে।