বিশেষ প্রতিনিধি
তাহিরপুরের টেকেরঘাটের পরিত্যক্ত চুনাপাথর খনি প্রকল্প এলাকাসহ আশপাশের সরকারি ভূমিকে ‘স্বাধীনতা উপত্যকা’য় রূপ দেবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ’এঁর যুদ্ধকালীন স্মৃতিসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। বুধবার সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এই সংক্রান্ত পত্র পাঠিয়েছেন। একইভাবে টেকেরঘাটে প্রায় ৬ একর কৃষি জমি ২৪ জন বন্দোবস্তধারী কৃষি জমি হিসাবে বন্দোবস্ত নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে (কয়লার ডিপো) ব্যবহার করায় তাঁদের বন্দোবস্ত বাতিল করারও প্রক্রিয়া করা হচ্ছে। ঐ এলাকায় দরিদ্র-মধ্যবিত্তদের জন্য আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
শিল্পমন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে পাঠানো জেলা প্রশাসকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- তাহিরপুর উপজেলার ১১২/১৯৮ নং জেএল’এর বড়ছড়া মৌজায় ১ নম্বর খতিয়ানে ৮৮.১৮ একর সরকারি ভূমি এবং বিভিন্ন খতিয়ানে ব্যক্তি মালিকানাধীন ৩১.৯৬ একরসহ সর্বমোট ১২০.১৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে ৯ জানুয়ারি ১৯৯২ খ্রি:’এ প্রত্যাশী সংস্থা- ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ প্রস্তাব দাখিল করা হলে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এলএ/৯৯/০৫ নম্বর স্মারকে গত ৩ জানুয়ারি ২০০০ খ্রি:’এ ১২০.১৪ একর ভূমির প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল। অনুমোদন বিলম্বিত হওয়ার কারণে তাগিদপত্র দেয়া হলে ভূমি মন্ত্রণালয়, শাখা ১১ এর ২৬ মে ২০০৫ খ্রি:’এ ভূ:ম:/শা-১১/অধি: সুনামগঞ্জ-২/২০০৫-৭৬ নং স্মারক পত্রে প্রেরিত এল.এ মামলা নং-৪১৯৯৭-৯৮ মূলে ১২০.১৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি মর্মে জানান এবং নতুন প্রস্তাব প্রেরণের জন্য নিদের্শক্রমে অনুরোধ করা হয়। শেষে গত ১৯ জুলাই ২০০৫, ২৪ জুলাই ২০০৬, ৭ ডিসেম্বর ২০০৬ ও ৩ ডিসেম্বর ২০১০ খ্রি: তারিখে বিভিন্ন স্মারকে পুনরায় প্রশাসনিক অনুমোদনসহ অধিগ্রহণ প্রস্তাব দাখিল করার
জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লি. বরাবর পত্র লেখা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোন প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। প্রস্তাব না পাওয়ায় অধিগ্রহণ কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বিধিমতে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি কিংবা বহুপূর্বে সমাপ্তকৃত টেকেরঘাট খনি প্রকল্পের এই ভূমি ব্যবহারের সুযোগ নেই। উল্লেখ্য যে, এই বিপুল পরিমাণ খাস ভূমিতে ছাতক সিমেন্ট ফ্যক্টরির বহু অকেজো মালামাল থাকায় এই ভূমির সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিঠিতে জানানো হয়, তাহিরপুর উপজেলার ৯৯ নম্বর জেল’র দুধের আউটা মৌজায় প্রায় ৬.৪৪ একর, ১১০ নম্বর জেল’এর লেদারবন্দ মৌজায় ০.২০ একর, এবং ১১২/১৯৮ জেল’র বড়ছড়া মৌজায় ২৫.৫৯ একর ও ৮৪/১৯৭ জেল’এ ১.১২ একরসহ ৩৩.৩৫ একর ভূমি টেকেরঘাট চুনাপাথর উত্তোলন ও সরবরাহ প্রকল্পের জন্য বিধিমতে অধিগ্রহণ করা হয় এবং এবং এই অধিগ্রহণকৃত ভূমি ১৯৪৮ সনের হুকুম দখলকৃত আইনে অধিগ্রহণ করা হলেও ভুল বশত ১৯৮২ সনের ২ নম্বর অধ্যাদেশ মোতাবেক গেজেট প্রকাশিত হওয়ায় সংশোধিত গেজেট প্রকাশনার জন্য সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ সচিবালয় বরাবর পুনরায় প্রেরণ করা হলেও এখনও পর্যন্ত (০৬.০৯.১৭ পর্যন্ত) সংশোধিত গেজেট প্রকাশিত হয়নি। কলাগাঁও, চারাগাঁও, বড়ছড়া মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ১২৭.৮৭ একর ভূমি ও সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৬৫৫.৩৩ একরসহ ৭৮৩.২০ একর ভূমি ১৯৪৮ সনের জরুরি হুকুম দখল আইনের আওতায় অস্থায়ীভাবে রিকুইজিশন করা হয়। ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ধার্যকৃত ২৬ লাখ ৩ হাজার ৬৯৯ টাকা প্রদান না করায় ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ তারিখে এই হুকুম দখলকৃত ভূমি অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৪০২ বাংলা সন পর্যন্ত সর্বমোট ৩৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯০২ টাকা টাকা নথিখাতে জমা প্রদান করার জন্য বিসিআইসিকে পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু অদ্যাবধি টাকা জমা প্রদান করা হয়নি। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে ইতোমধ্যে আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা প্রদানের জন্য ভূমিমন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
একই প্রত্যাশী সংস্থার অনুকূলে তাহিরপুর উপজেলার ১৯৮ নম্বর জেল’এর বড়ছড়া মৌজায় ৬.৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই ভূমির গেজেট প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রত্যাশী সংস্থার নামে নামজারী করা হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে- সরেজমিনে দেখা গেছে এই ভূমি অবৈধভাবে ব্যবহার হচ্ছে। কয়লা ব্যবসায়ীরা এখানে কয়লা মজুদ করে ব্যবসা করেন। এলাকায় কথা রয়েছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী’র যোগসাজসে খাস জমি ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে।
জেলা প্রশাসকের পাঠানো চিঠিতে মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। শিল্প সচিব বরাবরে দেওয়া চিঠির অনুলিপি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন,‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত টেকেরঘাট এলাকায় শহীদ সিরাজ লেক ও ডিসি পার্কের সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ লাইব্রেরী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থানকে সংরক্ষণ করে পর্যটন এলাকা হিসাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর নামকরণ হবে ‘স্বাধীনতা উপত্যকা’।’ তিনি জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরের কাছাকাছি এলাকা হওয়ায় জীব-বৈচিত্রের সমন্বয় সাধন করে প্রকৃতির উপর কোন আঘাত না দিয়ে সকল প্রকার স্থাপনা হবে এবং এটি পর্যটকদের আকর্ষণীয় করেও তোলা হবে।’